সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। হঠাৎ করে একটি কথা রটে গেল যে বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে শুরু হলো ব্যাপক তোলপাড়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হলো যে ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ তারা ফেরত পাবে না। তখন তারা গণহারে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করা শুরু করল। মানুষের এ আচরণের কয়েকটি দিক আছে। প্রথমত, তারা জানে না ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা কী। তারা ঠিক ততটুকুই জানে, যতটুকু গণমাধ্যম তাদের জানাচ্ছে। এ অসম্পূর্ণ জানার ওপর ভিত্তি করে তারা গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ভবিষ্যতে জামানত ফেরত দিতে পারবে না মনে করে গ্রাহকরা যে টাকা তুলে নিচ্ছে, এতে ব্যাংক আসলেই তারল্য সংকটে পড়বে। তৃতীয়ত, ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে এর বিনিময়ে যে মুনাফা পাওয়া যেত এবং তার ফলে গ্রাহকের যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতো, সেটি জানা সত্ত্বেও তারা ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে বাড়িতে রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আবার ধরা যাক, একটি কোম্পানির কোনো একটি পণ্যের দাম ৫ হাজার টাকা। একই পণ্য অন্য একটি কোম্পানি দিচ্ছে ৪ হাজার ৯৯৯ টাকায়। ফলাফলটা কী হবে বলুন তো? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ৪ হাজার ৯৯৯ টাকা দামের পণ্যটির প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকবে বেশি। এটির কাটতি হবে বেশি। যদিও ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের পণ্যটির গুণগত মান অনেক বেশি হয়, তথাপি অধিকাংশ মানুষ ৪ হাজার ৯৯৯ টাকার পণ্যটির দিকেই ঝুঁকবে। আসলে ৫ হাজার সংখ্যাটি দেখলে সাধারণ মানুষের মন যে পরিমাণ ক্রিয়াশীল হয়, ৪ হাজার ৯৯৯ দেখলে তেমনটা হয় না। বরং ৪ হাজার ৯৯৯ টাকাকে তাদের ৪ হাজারের সীমার মধ্যেই মনে হয়। তাদের অবচেতনে ৪ হাজার ৯৯৯ টাকাকে ৫ হাজারের চেয়ে অনেক কম মনে হয়। যদিও প্রকৃত ঘটনা তার ঠিক উল্টো। আর মানুষের মনস্তত্ত্বের এ দিকটিকে কাজে লাগায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো।
‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার ... ’। মনে আছে গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনটির কথা? এ ধরনের আরো বহু উদাহরণ আছে। পণ্যের প্রচারণায় বিজ্ঞাপিত করা হচ্ছে মানুষের যাবতীয় সব আবেগ এবং অনুভূতিকে। এই যে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার জনপ্রিয়তার কথাই ধরুন না। কেন ইসলামী ব্যাংকগুলো গ্রাহক চাহিদার শীর্ষে উঠে এল? অন্য অনেক ব্যাংকও কেন এ ব্যবস্থায় নিজেদের পরিবর্তিত করতে আগ্রহী? এক্ষেত্রে মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর পরিভাষাগুলো খেয়াল করুন। মুনাফা, মুদারাবা, বারাকাহ ইত্যাদি। মূলত আরবি শব্দের প্রাধান্য। আবার তাদের প্রকল্পগুলো একইভাবে লক্ষণীয়। হজ করার জন্য তারা আলাদা সঞ্চয়পত্র খোলার ব্যবস্থা করেছে, যেখানে তারা সাধারণ সঞ্চয়পত্র থেকে অধিক হারে মুনাফা দিচ্ছে। এসব পরিভাষা এবং প্রকল্পের পেছনে একটি বিষয়ই মূলত ক্রিয়াশীল। এ দেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ।
একজন ব্যক্তি কাঁচাবাজারে পণ্য ক্রয় করছেন। সবজি বিক্রেতার সঙ্গে তার সে কী ভীষণ ঝগড়া! দরদাম নিয়ে ব্যাপক কষাকষি। এত কিছু করে তিনি কত টাকা দাম কমালেন? সর্বোচ্চ ১০ বা ২০ টাকা। এর বেশি তো নয়। অথচ সেই একই মানুষ যখন একটি অত্যাধুনিক শপিং মলে গেলেন, তখন তিনি অধিকতর পরিশীলিত। সেখানে তার ২০০, ৫০০ এমনকি ১ হাজার টাকা কমানোর সুযোগ থাকলেও তিনি ততটা উচ্চকিত হচ্ছেন না, যতটা তিনি কাঁচাবাজারে হয়েছিলেন।
উল্লিখিত উদাহরণগুলো থেকে আমরা দেখি, মানুষের আচরণ কীভাবে অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। আর এ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে যাত্রা হয় ‘আচরণগত অর্থনীতি’ তত্ত্বের। ইংরেজিতে বলা হয় ‘বিহ্যাভিওরাল ইকোনমিকস’। অর্থনীতির সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটেছে এ তত্ত্বে। মানুষ যে আচরণগুলো করে, সেগুলো তারা কেন করে এবং কীভাবে করে, তা উদ্ঘাটন করাটাই ‘আচরণগত অর্থনীতি’র কাজ। এটি ‘নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতি বা নিওক্ল্যাসিক্যাল ইকোনমিকস’ থেকে আলাদা। ‘নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতি’তে মানুষকে সতত যৌক্তিক একটি সত্তা হিসেবে ধরে নেয়া হয়। ধারণা করা হয়, যথাযথ তথ্যে সমৃদ্ধ হয়ে সে সর্বদা সঠিক সিদ্ধান্তটিই গ্রহণ করবে। বাস্তবিক পক্ষে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তেমনটি হয় না। মানুষের কী করা উচিত, আর সে কী করে এবং তার সেই আচরণগুলোর ফলাফল কী হয়, এ দুইয়ের পার্থক্য যাচাই করাটাই ‘আচরণগত অর্থনীতি’র মূল আলোচ্য বিষয়।
মানব আচরণের বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ‘আচরণগত অর্থনীতি’ যে মূল কথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেটি হলো যথেষ্ট তথ্য এবং উপকরণ থাকা সত্ত্বেও মানুষ সর্বদা যৌক্তিক ও সর্বোত্তম সিদ্ধান্তটি নেয় না, যেমনটা ‘নব্য ধ্রুপদি’ অর্থনীতিবিদরা দাবি করেন। ‘আচরণগত’ অর্থনীতিবিদরা মানুষকে আবেগপ্রবণ হিসেবে বিবেচনা করেন, যারা তাদের পরিবেশ এবং পরিস্থিতি দিয়ে প্রভাবিত। মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে বিষয়টি সাংঘর্ষিক, যেখানে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ আছে বলে বিবেচনা করা হয় এবং লক্ষ্য থেকে তারা কখনো বিচ্যুত হয় না।
আচরণগত
অর্থনীতির গবেষণা
থেকে বহু
মূলনীতি উত্পন্ন
হয়েছে, যেগুলো
মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে বুঝতে অর্থনীতিবিদদের সহায়তা করে। এসব
মূলনীতি থেকে
সরকার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো মানুষকে নির্দিষ্ট একটি
দিকে ধাবিত
করার উদ্দেশ্যে তাদের প্রকল্প দাঁড়
করায়।
ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানী আমোস টেভারস্কি ও ড্যানিয়েল কানিম্যান ‘আচরণগত অর্থনীতি’ নিয়ে প্রথম ব্যাপক অর্থে কাজ করেন। গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে তারা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশকিছু চিরাচরিত বিচ্যুতি চিহ্নিত করেন। তারা দেখেন যে প্রকৃত উপাত্তের পরিবর্তে মানুষ প্রায়ই সহজে প্রাপ্য কিছু তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তারা আরো নির্দেশ করেন, মানুষ নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির মধ্যেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তারা কোনো ঝুঁকি নেয়া পছন্দ করে না। সম্ভাব্য ক্ষতির প্রতি তাদের অনীহা আছে, লাভের সম্ভাবনা সেখানে যতটুকুই থাকুক না কেন।
আশির দশকে রিচার্ড থ্যালার ও কানিম্যান ‘আচরণগত অর্থনীতি’ নিয়ে কাজ শুরু করেন। মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করে রিচার্ড থ্যালার ২০১৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
মানুষের নির্দিষ্ট কিছু আচরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ বিচ্যুতিগুলো ঘটে।
প্রথমত, মানুষ সহজে যে তথ্য লাভ করে সেটার ওপর ভিত্তি করেই সে তার সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে সে অধিকতর যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্যটি উদ্ঘাটনের প্রয়াস চালায় না।
দ্বিতীয়ত, মানুষের জ্ঞানগত সক্ষমতা সীমাবদ্ধ। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে যথাযথ ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে সঠিক এবং সর্বোত্তম সিদ্ধান্তটি নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এমনকি পর্যাপ্ত তথ্য যদি পাওয়াও যায়, তারা সেই একই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কারণ নতুন প্রাপ্ত তথ্যগুলো তারা দ্রুত সমন্বয় করতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সেগুলোকে এড়িয়ে যায়। এর পরিবর্তে তারা তাদের গতানুগতিক ধারাতেই চলতে চায়। অথবা এমন হতে পারে, সব উপায় যাচাই করে সর্বোত্তমটি বেছে নেয়ার মতো যথেষ্ট সময় তাদের নেই।
তৃতীয়ত, অন্যকে সহায়তা করার একটি সহজাত প্রবণতা মানুষের আছে। নিজেদের ক্ষেত্রে তারা অনেকখানি ছাড় দিতে প্রস্তুত, যদি তারা মনে করে যে এর মাধ্যমে তারা অন্যকে সাহায্য করতে পারবে। দানশীলতা মানুষের এমন একটি বৈশিষ্ট্য।
চতুর্থত, মানুষের ইচ্ছাশক্তি সীমিত। তাকে যদি সর্বোত্তম পছন্দটি সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝানোও হয়, তবু সে এমন বিষয়টিকে বেছে নেয়, যা তাকে অতি দ্রুত কিছু লাভ এনে দেয়। যার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে অনেক বড় লাভের সম্ভাবনাকে সে নির্দ্বিধায় ছেড়ে দেয়।
পঞ্চমত, মানুষ ঝুঁকি নিতে চায় না। ক্ষতি স্বীকারের প্রতি তার চরম অনীহা।
মোটা দাগে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের এসব বৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল থাকে। মানবচরিত্রের বিচিত্র এ কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করেই ‘আচরণগত অর্থনীতি’র যাত্রা চলমান।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক










