নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবহারও বেড়ে উঠছে। প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ বছরে নগরে প্লাস্টিকের ব্যবহার তিন গুণ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোয়। প্লাস্টিক বর্জ্য ক্রমে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ প্লাস্টিক অপচনশীল অবস্থায় দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায়। শহরে জলাবদ্ধতা থেকে শুরু করে নদীদূষণেও প্লাস্টিক বড় ভূমিকা রাখছে। এমন প্রেক্ষাপটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় টেকসই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। থ্রি আর (রিডিউস, রি-ইউস ও রিসাইকেল) পলিসি কার্যকর করে প্লাস্টিক বর্জ্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ। এক্ষেত্রে পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা যায় এবং উদ্ধার করা উপকরণগুলো দ্বিতীয়বারের মতো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অসুবিধার কারণে পদ্ধতিটি পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকার প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু ফল আশাব্যঞ্জক নয়। প্লাস্টিক রিসাইকেল ব্যবস্থা এক প্রকার অর্থনীতি এবং এ অর্থনীতির মূলে রয়েছে কার্যকর সংগ্রহ ব্যবস্থা। পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশ, যেমন জার্মানি কার্যকরভাবেই এ ব্যবস্থা চালু করে প্লাস্টিক বর্জ্যকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রিসাইকেল ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছে। পাশাপাশি বোতল জমা দেয়ার ব্যবস্থা, রিসাইকেল মেশিন ও প্লান্ট সহজলভ্য করতে হবে। একবার এ প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা ও রিসাইকেলের অর্থনীতি চালু করতে পারলে বেসরকারি খাতও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। আবার ভারতের মেঘালয়ের মতো রিসাইকেল করা প্লাস্টিক দিয়ে রাস্তার পিচ ঢালাই বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়, করোনা মহামারীতে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ সর্বত্র এটি বাড়ার তথ্য মিলছে। ওই দেশে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও এসব বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খোদ প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবস্থাপনায় তাদের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে, যাতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি প্রশমন করা যায়। উল্লিখিত দেশগুলোয় আগে থেকে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা নীতি বিদ্যমান। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত। তার পরও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্লাস্টিক উপকরণের সঠিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে, দায়িত্বশীল আচরণ করছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি।

প্লাস্টিক বায়োগ্রেডেবল নয়, পরিবেশে মিশে যায় এবং ভেঙে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হয়। সেজন্য মোটামুটি সব দেশই প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। গড়ে তুলেছে এর চক্রাকার অর্থনীতি। অর্থাৎ পণ্য তৈরি, ব্যবহার, বর্জ্য সংগ্রহ এবং পুনরায় এর ব্যবহার। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছে। কিছু দেশ প্লাস্টিক পণ্য সংগ্রহ ডিপো এবং ফেলার স্থান নির্দিষ্ট রাখার জন্য ভোক্তাদের অর্থ প্রদানেরও ব্যবস্থা করেছে। যাতে ব্যবহার শেষে পণ্যগুলো যথাস্থানে ফেরত দিতে ভোক্তারা উৎসাহিত হন। যেহেতু আমাদের দেশের মানুষ অসচেতন সেহেতু এ ধরনের কিছু উৎসাহমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সর্বোপরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাড়াতে হবে সক্ষমতা। জাপানে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার শেষে নষ্ট হয়ে যাওয়া প্লাস্টিকসামগ্রী রিসাইকেল করা হয়। অনেক দেশে জৈব উপাদান ব্যবহার করে পচনশীল প্লাস্টিক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমাদেরও এ ধরনের উদ্যোগে শামিল হতে হবে।

পলিথিন ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই আইন রয়েছে। আইনটি যুগোপযোগী করে প্রয়োগ করতে পারলে পলিথিনের উপদ্রব যেমন কমবে, তেমনি দেশীয় পাটজাত শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে। কিছুদিন আগে পাট দিয়ে পচনশীল পলিথিন আবিষ্কারের মতো যুগান্তকারী ঘটনার কথা আমরা জানতে পেরেছি এবং সরকারের প্রণোদনায় এখনই যথাসম্ভব দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হবে। বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকের মহামারী রোধে বাংলাদেশের এ আবিষ্কার একটি মাইলফলক হতে পারে, সেজন্য ত্বরিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে আমাদের সরকার ২০১০ সালে জুট প্যাকেজিং আইন পাস করেছে। এরই মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যের ট্রান্সবাউন্ডারি মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণে একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ‘সিঙ্গেল ইউজ’ প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা, আইন মানার তাগিদ সৃষ্টি না হলে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কোনো কার্যক্রমই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। সরকারের এ শুভ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, তার মধ্যে জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করে সংরক্ষণ অন্যতম। প্রাথমিক স্তর থেকে বর্জ্য আলাদা করা নিয়ে একটি নীতিমালা করা হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিরোধ করতে সরকারের সঙ্গে প্রত্যেক স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি। সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে প্লাস্টিক বর্জ্য সম্পদে রূপান্তর করার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বাস্তবতা হলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের অবকাঠামো ও জনবলগত ঘাটতি আছে। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। তার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে চলা ওয়ানটাইম প্লাস্টিক উপকরণের ব্যবহার তাদের কাজ আরো কঠিন করে তুলছে। এ প্রেক্ষাপটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো ও জনবল তো বাড়াতে হবেই, এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্লাস্টিকের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে নীতিগত কিছু হস্তক্ষেপের বিষয়েও ভাবনাচিন্তা জরুরি। প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হলেও এখন পর্যন্ত দেশে কোনো প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করা হয়নি। এটি এখন সময়ের দাবি।

বিশ্বের কিছু দেশ প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী কিছু অ্যাপ্রোচ নিচ্ছে। এমনকি ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এসব অ্যাপ্রোচের মধ্যে একটি হলো এক্সটেনডেড প্রডিউসার্স রেসপন্সিবিলিটি (ইপিআর)। ইপিআর এমন এক নীতি, যা ভোক্তা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বা প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার করা কোম্পানিগুলোর মধ্যেও দায়িত্ব ভাগাভাগি করে। এ দায়িত্ব পালন হতে পারে দৈহিক বা আর্থিক দুভাবে। অর্থাৎ উৎপাদককে অর্থ দিতেও হতে পারে কিংবা বর্জ্য সংগ্রহ-ব্যবস্থাপনায় তারা সম্পৃক্তও হতে পারে। ভারতে ইপিআরভিত্তিক একটি গাইডলাইন প্রণীত হয়েছে। ওই গাইডলাইন অনুযায়ী উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (সিপিসিবি) থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জমা দিতে হয়। এসব কাজে সমন্বয় এবং সব অংশীজনের সঙ্গে ইপিআর প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য একটি নিবেদিত ওয়েবসাইট/পোর্টালও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমাদের দেশেও ইপিআর মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশে ইপিআর প্রবর্তনে ২০১৮ সালে একটি এসআরওর খসড়া করেছিল। কিন্তু এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। এটা জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন এবং কার্যকর করা প্রয়োজন। সরকার, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ ও অন্য অংশীজনদের সম্মিলিত প্রয়াসে প্লাস্টিক বর্জ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে, এটিই প্রত্যাশা।