বাংলাদেশের সংবিধানের ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’-সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব জনগণের অন্ন-বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত ‘পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে চিন্তায় থাকে ২২ শতাংশ পরিবার’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি শঙ্কার উদ্রেক করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপের বরাতে বলা হয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ৩ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো অনাহারে থাকে। কভিডে ক্ষুধা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে বৈকি। কারণ অনেকের আয় কমেছে, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন অনেকে। সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এক্ষেত্রে সরকারকেই সে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে দ্রুত উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চরম দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে এসেছে অনেক পরিবার। ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। এত অর্জন সত্ত্বেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান নগরের খানাগুলোয় রয়েছে পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব। এ অবস্থায় শহরের দরিদ্রদের জন্য ব্যাপক পরিসরে সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম নেয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম মূলত আবর্তিত হয় গ্রামের জনগণকে কেন্দ্রে রেখে, শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য তেমন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। এক্ষেত্রে শহরের দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির দিকেও। অস্বীকারের উপায় নেই, কভিডে সবচেয়ে বেশি নাজুক হয়েছে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের বেশির ভাগ মানুষই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজের কারণে কর্মসংস্থান হারিয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেরই ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। এদিকে প্রধান খাদ্যপণ্য চালসহ প্রায় সব ধরনের শাকসবজি, ডাল, ডিম, ভোজ্যতেলের দামে ঊর্ধ্বগতি। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন কভিডের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সংকট মোকাবেলায় দরিদ্র মানুষ বিকল্প হিসেবে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে স্বল্পমূল্যের অপেক্ষাকৃত সস্তা খাবার দিয়েই চাহিদা পূরণে বাধ্য হচ্ছে; যা সরাসরি প্রভাবিত করছে তাদের স্বাস্থ্যকে।

ব্রাজিলের বেলো হরিজন্টে শহরের একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বেলো হরিজন্টেকে বর্তমানে বলা হয় ক্ষুধামুক্ত শহর। সরকারের পক্ষ থেকে ধাপে ধাপে কয়েকটি কর্মসূচির অধীনে শহরটির স্বল্প আয়ের ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। এমন একটি উদ্যোগের নাম ‘পপুলার রেস্টুরেন্ট’, যেখানে ভর্তুকির মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে সরবরাহ করা হয়েছে পুষ্টিকর খাবার। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন দোকান থেকে ক্রেতাকে ভর্তুকিযুক্ত ফলমূল ও শাকসবজি ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। নজর দেয়া হয়েছে খাদ্যের অপচয় রোধের দিকেও। এ লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে ফুড ব্যাংক, যার মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে প্রস্তুতকৃত খাবার সরবরাহ করা হয়। শহরের ক্রেতাদের সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদনকারীদের সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে সহজে শহরের ক্রেতাদের কাছে প্রান্তিক চাষীদের উৎপাদিত পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে। এ ধরনের আরো কর্মসূচি রয়েছে, যা কৃষকদের জীবিকা ও ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি দৃষ্টি দেয়; যা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনার পাশাপাশি বিভিন্ন অসহায় গোষ্ঠীকে সক্ষম ও শক্তিশালী করে।

নগরে বসবাসরত হতদরিদ্র মানুষের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ লক্ষণীয়। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে বস্তিবাসীকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পরিকল্পনাভিত্তিক উন্নয়ন কৌশলও প্রণয়ন করা হয়েছে। কম মূল্যে আবাসন তৈরি, খাদ্য চাহিদা পূরণে খোলাবাজারে চাল বিক্রি, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, হতদরিদ্র ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান তৈরিতে দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ—এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রকল্প চলমান। একই সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিভিন্ন এলাকার বস্তিতে প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম। তবে সেগুলো যে সঠিকভাবে কাজ করছে না, তার প্রমাণ বিবিএসের এ পরিসংখ্যান। ফলে প্রকল্পগুলো নতুন করে সাজানো প্রয়োজন। একটা সময় আমাদের দেশের দরিদ্র জনগণের কাছে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রাম ও শহর এলাকায় রেশনিং চালু ছিল। তবে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের অভাবে সে কর্মসূচি সাফল্য লাভ করেনি। পরবর্তী সময়ে বিকল্প হিসেবে ২০১৫ সালের দিকে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা হয়; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজের বিনিময়ে খাদ্য, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা। তবে গ্রামের তুলনায় শহরে এ ধরনের কর্মসূচির ব্যাপ্তি সীমিত। টিসিবির মাধ্যমে কয়েকটি পণ্য বিক্রি ছাড়া তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশ সুপরিচিত হলেও সেগুলো মূলত গ্রামীণ পর্যায়ের দরিদ্রদের জন্যই। কভিড-১৯ লকডাউন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নগর পর্যায়ে সরকার বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে খোলাবাজারে চাল বিক্রি শুরু করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে খাদ্য ক্রয়ে সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অনেকাংশেই এখনো অনুপস্থিত।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আইন ও নীতির মাধ্যমে সব মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশ আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া, প্যারাগুয়ে, পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া, উগান্ডা ও ভেনিজুয়েলা এরই মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২০১৩ সালে নেয়া খাদ্যনিরাপত্তা আইন কার্যকরের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী সব মানুষের খাদ্য অধিকার পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত করছে। নেপালের সংবিধানে সব মানুষের খাদ্য অধিকারের স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে খাদ্য অধিকার ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব আইন, ২০১৫ কার্যকর হয়েছে। আমাদের দেশেও খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে (এসডিজি)। আমাদের দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু বিদ্যমান কভিড পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি ও আয় কমার কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর লোকেরা প্রয়োজনীয় খাদ্য ক্রয়ে সমর্থ হচ্ছে না। বর্তমানে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে শহরের দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা গেলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে; যা তাদের পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব দূর করবে বলে অনুমেয়।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ২ নং লক্ষ্য হলো খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা।  দেশে পুষ্টি পরিস্থিতির অগ্রগতি তেমন সন্তোষজনক নয়। শিশু ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার খুব বেশি। তারা ভিটামিন-এ, আয়রন, আয়োডিন, জিংক ইত্যাদি ঘাটতিতে ভুগছে ব্যাপকভাবে। এছাড়া আছে রক্তস্বল্পতার সমস্যা। পুষ্টিবিষয়ক এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের শতকরা ৪৪ ভাগের মধ্যে জিংক ঘাটতি বিদ্যমান। অর্ধেকের বেশি মায়ের মধ্যে জিংক ঘাটতি আছে। তাদের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যপীড়িত এবং অনেকেই বস্তিতে বাস করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও নগর দারিদ্র্য সেভাবে কমছে না; বরং কাজ ও আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষ প্রতি বছর শহরমুখী হচ্ছে, শহরের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। শহর ছেড়ে দরিদ্র মানুষ যে গ্রামে চলে যাচ্ছে—এ রকম নজির নেই বললেই চলে। যদিও গ্রামে দারিদ্র্য কমাতে সরকারের একাধিক শক্তপোক্ত কর্মসূচি চালু হয়েছে। আসলে নগর দারিদ্র্য কমিয়ে আনা ও তাদের পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিতে জুতসই কর্মকৌশল ঠিক করতে হবে।