করোনার ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধিতে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নতুন শঙ্কা। গতকালের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আমরা ডেঙ্গু পরিস্থিতির সঙ্গে বসবাস করছি। স্বাভাবিকভাবেই রোগটির প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। অথচ সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সময়মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। বর্তমান যে অবস্থা, তাতে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কভিড মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বাড়লে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নতুন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এ অবস্থায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার ও চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্পরতা বৃদ্ধি জরুরি।

আমরা দেখছি রাজধানী ঢাকার নিম্নাঞ্চল ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো এডিস মশা বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। জলাবদ্ধতা রয়েছে চট্টগ্রামেও। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম চালানোর আশ্বাস দেয়া হলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার আগে তাদের তেমন তত্পরতা চোখে পড়েনি; বরং তাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরুর আগেই ঢাকায় এডিস মশার উপদ্রব বেড়েছে। এখন দুই সিটি মেয়র মশক নিধন নিয়ে যত তত্পরই হন না কেন, তা কতটা কার্যকর হবে বলা কঠিন। তাছাড়া মেয়রদের সঙ্গে কাউন্সিলরদের কাজের সমন্বয়হীনতাও দৃশ্যমান। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর বাজেট বাড়ছে, সরকারের তহবিল থেকে অর্থ খরচ হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতি বছর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার মাধ্যমে নিজেদের সফলতা ধরে রেখেছে। প্রথমত, তারা বছরব্যাপী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ২০ থেকে ২৫ জন নিযুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে এক দল প্রচারের কাজ করে, অন্য দল শহরের কোথাও পানি জমছে কিনা তা দেখভাল করে। নিয়োগ করা হয়েছে আলাদা র্যাপিড অ্যাকশন টিম, যারা সব ধরনের নিরোধক ও সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত থাকে। কোনো ভবনে পানি জমে থাকলে ১ লাখ রুপি পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করার আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ভবনের পানি পরিষ্কার করে দেয়ার খরচ বাবদ বিল বার্ষিক করের বিলের সঙ্গে ভবন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। পাশাপাশি রোগ চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে কলকাতার প্রতিটি ওয়ার্ডে। একজন করে কর্মী নিযুক্ত করা হয়েছে, যার একমাত্র কাজ হচ্ছে ওই এলাকায় হাসপাতাল, নার্সিং হোম বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষাগারে রোগীদের কী কী রক্ত পরীক্ষা হচ্ছে, কী ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রতিদিনের হিসাব রাখা। যাতে ডেঙ্গু রোগীর খোঁজ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া যায়।

অনেক দেশ আবার প্রথাগত পদ্ধতি ব্যবহার না করেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল। ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকাসহ বেশ কয়েকটি দেশের সরকার ‘ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম’ নামের কর্মসূচির মাধ্যমে ‘ভালো মশা’ দিয়ে ডেঙ্গু মশা মারার একটি উদ্যোগ শুরু করেছে। ডেঙ্গু নিধনে যে কীটনাশক ছড়ানো হয়, স্বাভাবিকভাবেই তা পরিবেশের ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রে কীটনাশক ছিটানো সত্ত্বেও মশার নিয়ন্ত্রণ হয় না। তবে বিকল্প এ পদ্ধতিতে ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এর সুফল পেয়েছে। তাছাড়া ওলবাছিয়া নামের ভালো মশা মানুষ বা অন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্যও ঝুঁকিমুক্ত। বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের উদ্ভাবনী, কার্যকরী এবং তুলনামূলক সস্তা পদ্ধতি রয়েছে, যার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অথচ আমাদের দেশে আমরা এমন কোনো কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে অগ্রসর না হয়ে নামমাত্র প্রচার-প্রচারণা নিয়েই ব্যস্ত রয়েছি। প্রতি বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ছাড় হচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলোর খামখেয়ালিপনা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদাসীনতাও কম নয়।

ডেঙ্গু মশা নিধনে মৌসুম নয়, প্রয়োজন বছরব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা। করোনা মহামারীর সময়ে আগে থেকেই এ বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি নেয়া উচিত ছিল। প্রজনন সময়ের আগেই এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ ও মশার লার্ভা ধ্বংসকারী মানসম্পন্ন ও কার্যকর ওষুধ সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবেই ছিটানো জরুরি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কীটতত্ত্ববিদদের সঙ্গে আলোচনা করে অগ্রসর হওয়াটা সরকারের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে। এর সঙ্গে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, দেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা চাই। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও ছোট ছোট সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। চিহ্নিত করতে হবে ডেঙ্গু প্রজননের বিভিন্ন হটস্পট। যেসব স্থানে মশা জন্ম নেয়, যেমন বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, নালা, পানির ট্যাপের আশপাশের জায়গা, পানির পাম্প, ফ্রিজ বা এসির পানি জমার স্থান, প্ল্লাস্টিক বক্স, ডাবের খোসা, টায়ারে জমে থাকা পানি অপসারণের পাশাপাশি মশা নিধন ওষুধ ছিটিয়ে দিতে হবে। শিশুদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাই তাদের মশারি ছাড়া ঘুমাতে দেয়া যাবে না এবং শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরাতে হবে। জ্বর হলে অবিলম্বে ডেঙ্গু ও করোনা দুটোই পরীক্ষা করানো চাই। চলমান কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে আরেকটা ডেঙ্গু মহামারী হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

হাসপাতালগুলোতে বেশির ভাগই এখন করোনা রোগী। অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এদিকেও নজর দিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট রেখে সেখানে তাদের ভর্তি করাতে হবে। নইলে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকেই করোনা আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে যাদের অবস্থা বেশি খারাপ হয় বা রক্তক্ষরণ পর্যায়ে চলে যায়, তাদের আইসিইউতে রাখার ব্যবস্থা থাকা দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে গত এক মাসে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য এসেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কাছে। যদিও এখনো সেই তথ্য পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে দিশাহারা অবস্থায় রয়েছে দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতাল। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু রোগীদের অনেকেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেতে চায় না। অনেকেই নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও করোনা রোগী দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। যদিও এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর চিকিৎসাসেবা দিতে আলাদা প্রস্তুতি রয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা ওই প্রস্তুতিকে পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন। সামনে যেমন ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, তেমনি করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কাও রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির চাপের ফলে চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং চিকিৎসার গুণগত মান পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে কারণে তাদের ওপর রোগীর চাপ যেন আরো না বাড়ে এবং যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে কিন্তু হাসপাতালে স্থান সংকুলান হচ্ছে না, তাদের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র খোলা জরুরি হয়ে উঠেছে। সেজন্য সরকারকে প্রথমেই ডেঙ্গু পরিস্থিতির গুরুতর মাত্রা এবং আগামী দিনগুলোয় তা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। সরকার যদি মনে করে যে পরিস্থিতি এখনো গুরুতর হয়নি, তাহলে খুব দ্রুতই এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে। বিশ্ব থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রায় চার বছর আগে সংস্থাটি ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন মানবদেহে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে এ ভ্যাকসিন চালু আছে। বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকে এক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতির কথা শোনা যায় না। ২০০০ সালে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার এত বছর পরও আমরা কেন কার্যকর কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করে এটি দমনে সফল হতে পারলাম না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বৈকি।