ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। কিন্তু পদ্মা-মেঘনায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। গত বছরের তুলনায় এবার মৌসুমে জেলেরা নদীতে ইলিশ পেয়েছেন এক-চতুর্থাংশেরও কম। এতে জেলে ও ইলিশের ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। বাজারে ইলিশের দামও চড়া। গত বছর ইলিশ আহরণে রেকর্ড গড়ার পরের বছর এমন অবস্থায় হকচকিত সবাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প-কারখানার বর্জ্যে নদীদূষণ, নদীতে অসংখ্য চর জেগে ওঠা ও মোহনায় অতিরিক্ত জাল ব্যবহারের কারণে ইলিশের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ইলিশ নিরাপদে বিচরণের জন্য নদীর পরিবর্তে গভীর সমুদ্রকে বেছে নিচ্ছে। খবরটি আশঙ্কাজনক বৈকি। তবে গত বছরও এ সময়ে নদীতে আশানুরূপ ইলিশ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে অনেক ইলিশ মেলে। এক্ষেত্রে ইলিশের জীবনচক্র, চলাচল, প্রজনন প্রভৃতি গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইলিশ রক্ষায় নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি ও একে দখল-দূষণমুক্ত রাখতে হবে। ইলিশের প্রবেশপথ ও চলাচল নির্বিঘ্ন করাও জরুরি।
গত ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে শুধু যে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে তা-ই নয়, প্রচুর বড় বড় ইলিশও ধরা পড়ছে। ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোতে জাটকা ধরা বন্ধ এবং নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ধরা বন্ধের কারণে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে চলেছে। দামও কমে এসেছে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। সেইসঙ্গে বেশি ওজনের ইলিশও এখন পাওয়া যাচ্ছে। ১৫ বছর আগে দেশের ২৪টি উপজেলার নদীতে যেখানে ইলিশের বিচরণ ছিল, এখন দেশের অন্তত ১২৫টি উপজেলার নদীতে ইলিশ বিচরণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এর সবই সম্ভব হয়েছে সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপের কারণে। কিন্তু হঠাৎ করেই ভরা মৌসুম হিসেবে পরিচিত জুলাই-আগস্ট সময়ে নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এবারে ধারণা করা হয়েছিল করোনার পরিপ্রেক্ষিতে ইলিশ বেশি মিলবে। কিন্তু ফলাফল উল্টো।
গবেষকরা বলছেন, সাগরের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ইলিশ নদীতে আসতে দেরি হচ্ছে। ইলশেগুঁড়ি (ঝিরঝিরে) বৃষ্টিও কম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইলিশের পেটে ডিম আসার সময় পিছিয়ে গেছে। বর্ষণ কম হওয়ায় নদীর পানিও বাড়েনি। ইলিশের জীবনচক্রেও পরিবর্তন এসেছে। এ কারণে নদীতে আসছে দেরিতে। সাগর মোহনায় নদীতে জেগে ওঠা চর ইলিশের পথ আটকে দিচ্ছে। নদীভাঙন ও বন্যার কারণে প্রতি বছর অসংখ্য চর সৃষ্টি হয়ে নদী ভরাট হচ্ছে। এতে ইলিশের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন নদী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দূষিত। এসব কারণে নদীতে ইলিশ থাকা বা বিচরণের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। পরিবেশের উন্নতি ঘটাতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নদীর নাব্যতা রক্ষা, শিল্পদূষণ রোধে কঠোর আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণাও বাড়াতে হবে। দেখা প্রয়োজন ইলিশের চলাচল ও আবাসস্থলের কোনো পরিবর্তন ঘটছে কিনা। মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক উভয় কারণে নদীতে পলি জমে ভরাট হওয়ায় মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এছাড়া ইলিশের প্রজননকালে নদীতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালি তোলা অব্যাহত থাকায় ইলিশের ডিম ও রেণু পোনার ক্ষতি হচ্ছে। গবেষণায় উঠে আসা বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সাগরের মোহনাগুলোয় নিরবচ্ছিন্নভাবে জাল পেতে রাখায় প্রবেশমুখেই ইলিশ জালে আটকা পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জালের পরিমাণ আরো বেড়েছে বলে খবর মিলছে। বেশি মাছের আশায় জেলেরা এখন মোহনাগুলোতে অতিরিক্ত জাল ব্যবহার করছে। এতে ইলিশের চলাচল মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে নদীর সংযোগ মোহনা হচ্ছে ছয়টি। এর মধ্যে মেঘনার দুটি, আন্ধারমানিক-পায়রা নদের দুটি, তেঁতুলিয়া ও ধলেশ্বর নদের একটি করে মোহনা। এসব মোহনা কমপক্ষে ৫০ ফুট গভীর থাকার কথা। কিন্তু অনেক মোহনার গভীরতা ১০ ফুটে নেমে এসেছে। যে কারণে ইলিশ সাগর ছেড়ে নদীতে প্রবেশ কমে গেছে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে যেভাবে নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, তাতে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। দূষণের ফলে ইলিশ নদীতে খাদ্য সংকটে পড়ছে। এসব প্রতিকূল পরিবেশে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। ব-দ্বীপ পরিকল্পনার মাধ্যমেই এটি হতে পারে।
বার্ষিক ইলিশ সুরক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ইলিশের অভয়াশ্রম তৈরি, মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জীবিকা সহায়তা দিয়ে ইলিশ উৎপাদন বহুলাংশে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। ইলিশ সংরক্ষণে অর্জিত এ সাফল্য আরো বিস্তৃত করা সম্ভব, যদি ইলিশের অবৈধ আহরণ ও নদী দখল-দূষণ আরো কমিয়ে আনা যায়। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের মতো সীমিত প্রশাসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশে তা আরো কঠিন। লাতিন আমেরিকার দেশ চিলি আমাদের মতো অনুরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। আমাদের ইলিশের মতো হেক মাছ লাতিন আমেরিকায় জনপ্রিয়। বিশ্ব চাহিদা ও দেশী বাজারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং চলাচল ও আবাসস্থল দূষিত হওয়ায় মাছটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। হেক মাছের বংশরক্ষার লক্ষ্যে চিলি সরকার সেপ্টেম্বরের প্রজনন চক্রের সময় মাছ আহরণ ও ভোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও হেক মাছের বংশবিস্তার আশানুরূপ বাড়েনি। এর জন্য নদীদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ইলিশের ক্ষেত্রে এমনটি যেন না ঘটে, তার জন্য এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক, যেখানে নদী রক্ষা থেকে শুরু করে ইলিশের প্রজনন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। নদী ও সমুদ্রের মোহনায় নাব্যতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মাছ সাগরে থাকলেই ধরা পড়ে না। অনেক সময় ইলিশ মাছ গভীর পানি থেকে উঠে আসে না। এজন্য প্রয়োজন অনুকূল আবহাওয়া। যেমন পর্যাপ্ত বৃষ্টি, পানির চাপ, খাদ্য ইত্যাদি। আজ ইলিশের উৎপাদন নিয়ে আমরা গর্বিত। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চ্যালেঞ্জ হলো ইলিশ উৎপাদন ধরে রাখা। ইলিশ জলবায়ু, খাদ্য, প্রজননসহ বিভিন্ন কারণে জায়গা বদলাতে পারে। এর মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি বেড়ে গেছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছের আচরণ কীভাবে বদলাবে, তা কেউ জানে না। তবে সমুদ্রের মাছ যে ধীরে ধীরে কম তাপমাত্রার দিকে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খাদ্যগ্রহণ ও ডিম ছাড়ার জন্য নদী ও সাগরের মধ্যে ইলিশ মাছের চলাচলের একটা সম্পর্ক আছে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এ সম্পর্ক কী হবে, এখনো এ বিষয়ে কিছু জানা যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ইলিশসংক্রান্ত গবেষণা আরো বাড়াতে হবে। ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষস্থানে বাংলাদেশ। এ অর্জন ধরে রাখতে হলে মত্স্য গবেষণার পাশাপাশি এর আবাসস্থল সংরক্ষণে আরো গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নানা ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে স্থানীয় প্রশাসন। এর সুফলও মিলেছে ইলিশ আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে নদীর দখল-দূষণ বন্ধ ও নাব্যতা বজায় রাখায় জোর দিতে হবে। পাশাপাশি ইলিশের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে প্রবেশপথ সুরক্ষা রাখাও প্রয়োজন।










