পুঁজিতন্ত্রের পতনের ইশারা দিয়েছিলেন কার্ল মার্ক্স। তারপর গত দেড়শ বছর পুঁজিতন্ত্রের পতন নিয়ে চিন্তার জগতে জল ঘোলা কম হয়নি। অনেকের মেসিয়ানিক প্রত্যাশা ছিল পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার রাতারাতি র‍্যাডিক্যাল পরিবর্তন হবে। বলশেভিক বিপ্লব সে প্রত্যাশার পারদকে অনেক উঁচুতে তুলেছিল। আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতো চিন্তাবিদ পুঁজিতান্ত্রিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে মানবজাতির জন্য চিরস্থায়ী ও সর্বোত্তম আর্থরাজনৈতিক বন্দোবস্ত ঘোষণা দিয়ে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু মানব নিয়তির পরিহাস যে মার্ক্স কিংবা ফুকুয়ামা কেউই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা না। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চোখে-মুখে বার্ধক্য দেখা গেলেও পুঁজির প্রতাপ অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে। তবে আমাদের খালি চোখে দৃশ্যমান সনাতন দুনিয়ার সমান্তরালে ইন্টারনেট বা অন্তর্জালভিত্তিক ডিজিটাল দুনিয়ার আগমনের পরে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের স্থলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে প্রযুক্তিচালিত নতুন এক আর্থরাজনৈতিক বন্দোবস্ত। প্রযুক্তির আশ্রয়ে বিকাশমান এ আর্থরাজনৈতিক বন্দোবস্তকে অনেকে বলছেন সাইবার সামন্ততন্ত্র কিংবা ডিজিটাল জমিদারি ব্যবস্থা।

দশম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইউরোপ ছিল সামন্ততন্ত্রের স্বর্ণযুগ, যেখানে স্থানীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং জমিকে ইউনিট আকারে বণ্টনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় সামাজিক স্তর। জমির মালিক রায়তকে সামরিক ও আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতেন। বিনিময়ে সামন্তরা জমির মালিককে দিতেন অর্থ, সেবা ও সামরিক সহযোগিতা। পুঁজিতন্ত্র এ সামন্ততন্ত্রের বিবর্তিত রূপ। সামন্ততন্ত্রে সমাজ ব্যবস্থার মূল ইউনিট ছিল জমি। পুঁজিতন্ত্রের আগমনে মূল ইউনিটের জায়গা দখল করেছে পুঁজি। সনাতন সামন্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে উঠেছে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার ইমারত। সামন্ত সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত উৎপাদন থেকেই পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়। পৃথিবী বুর্জোয়া বিপ্লবের সাক্ষী হয়েছে সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে। পশ্চিমা দুনিয়া ছিল বিপ্লবের ঘাঁটি। আর বিপ্লবের সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সামন্ততন্ত্রের অবসান ও পুঁজিতন্ত্রের উত্তরণ ঘটে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পণ্যের উৎপাদন হতো কুটির ও ক্ষুদ্রায়তন শিল্পের মাধ্যমে, যার ধ্বংস সূচিত হয় শিল্প বিপ্লবের অগ্রযাত্রায়। এর মধ্য দিয়ে আগেকার দরিদ্র কৃষক, ছোটখাটো হস্তশিল্পীরা পুরনো ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। শামিল হয় বৃহদায়তন শিল্প-কারখানায়। পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহের জন্য। পরিণত হয় মজুরি শ্রমিকে। আর সেই মজুরি শ্রমিকদের উৎপাদনে নির্ভর করে মুষ্টিমেয় মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হয়। তারাই হয়েছে যাবতীয় উৎপাদন শক্তির মালিক, পুঁজিপতি।

দীর্ঘ সময়ে পুঁজিতন্ত্র নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সমালোচনা ও পর্যালোচনার জেরে এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমানে পুঁজিতান্ত্রিক পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ২০০৮ সালের ঘটনায় সবার আগে দৃশ্যমান হয়েছে পরিবর্তনটি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তখন দেখা দিয়েছে বিশ্বজুড়েই। আর ততদিনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল পৃথিবী। মানুষ ও মানুষের অর্থনীতি ক্রমে শিফট হতে থাকে ডিজিটাল দুনিয়ায়। ফেসবুক ও অ্যামাজনের মতো নাম চলে আসে সামনে। কোম্পানি বা ফার্ম আকারেই ব্যবসা পরিচালিত হতো আগে। কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়া যেন ব্যক্তিমালিকানাধীন নতুন ধরনের জমিদারি। ‘‌জমিদারি’ শব্দটা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল দুনিয়ায় জীবনযাপনের অর্থ তাদের কারো না কারো নজরদারির মধ্যে জীবনযাপন। যেমন ফেসবুক একটা ডিজিটাল জমি। আর ফেসবুককেন্দ্রিক ডিজিটাল জমিদারি ব্যবস্থার জমিদার জাকারবার্গ গং। ফেসবুকের মালিক জমিদার ব্যবহারকারীর জন্য কিছু জায়গা দিয়েছে। সে সেখানে লিখবে, বলবে, যোগাযোগ করবে কাছের মানুষের সঙ্গে। বিনিময়ে ব্যবহারকারী ফেসবুকের মালিক ডিজিটাল জমিদারকে দেবে আইনি আনুগত্য ও মনোযোগ। ব্যবহারকারীর মনোযোগই মূলত নতুন ডিজিটাল জমিদারদের মূলধন। মনোযোগের কারণেই বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থাগুলোর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই প্রধান প্রচারণার জায়গা। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো লাখো-কোটি ব্যবহারকারী তৈরি করে। তারপর সেই মনোযোগকে বিক্রি করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে। যারা মনোযোগ আকর্ষণের দুনিয়ায় টিকতে পারবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্কাইপ, অ্যামাজন, আলিবাবা বা টেলিগ্রাম—সবই ডিজিটাল দুনিয়ার একেকটা জমিদার মহাল। হাল দুনিয়ায় এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর, যে ডিজিটাল দুনিয়ার কোনো না কোনো এক জমিদারের ভূসীমায় বা প্রভাববলয়ে বসবাস করছে না। ফলে অর্থনৈতিক বাজারের প্রধান অংশই চলে গেছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। পণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে টাকা-পয়সার লেনদেন। উপরন্তু বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের জনমত তৈরির পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারস্থ হচ্ছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য হাতিয়ে নেয়ার কাজে ব্যবহার করছে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই বিষয়টি মেলে।

টেকনো-ফিউডালিজম চিন্তাটিকে সামনে এনেছিলেন সাবেক গ্রিক অর্থমন্ত্রী ও রাষ্ট্রচিন্তক ইয়ানিস ভারুফাকিস। তার মতো আরো অনেকে সাইবার-ফিউডালিজমেরও আলোচনা করছেন। ফেসবুকভিত্তিক সাইবার স্পেসের জমিদার জাকারবার্গ কিংবা টুইটারভিত্তিক সাইবার স্পেসের জমিদার ইলোন মাস্ক। তারাই নব্য সাইবার সামন্ত্রতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থার মালিকপক্ষ। কেউ কেউ হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। সমীকরণ এক্ষেত্রে বেশ কঠিন। আরব বসন্তের পর কোনো দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণতন্ত্র সুরক্ষায় সন্তোষজনক ভূমিকা রাখেনি। সনাতন ধারার পুঁজিতন্ত্র নানা বিবর্তন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। অন্যান্য খাতে বড় বড় কোম্পানির তুলনায় ডিজিটাল প্লাটফর্মের বাজার মূলধন বেশি। উনিশ শতকে সামন্ততান্ত্রিক কিছু বৈশিষ্ট্য টিকে থাকলেও পুঁজিতন্ত্রের রাজত্ব শুরু হয়ে গেছে। ঠিক একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বর্তমানে। পুঁজিতন্ত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে থাকলেও পৃথিবী প্রবেশ করেছে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায়। যেখানে দুনিয়ার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তগুলোও প্রযুক্তি ছাড়া হচ্ছে না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক মতামত তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল পাটাতনেই তৈরি হয়েছে অপরাধ জগৎ ও পুলিশি ব্যবস্থা। কিন্তু এ পুলিশি ব্যবস্থার নায়কের ভূমিকা কোনো রাষ্ট্র পালন করে না। পালন করে ওই ডিজিটাল মাধ্যম। অর্থাৎ টুইটার নিজেই তার বিস্তৃত ক্ষমতার পরিসীমায় মানুষের জন্য অপরাধের সংজ্ঞা দাঁড় করিয়ে তাকে শাস্তি দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে। জীবনকে সহজ করার জন্যই মানুষ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা আবিষ্কার করেছে। মানুষের জীবন কীভাবে সহজ করা যায়, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বিপরীত কথাও সত্য। ডিজিটাল দুনিয়ায় কীভাবে চলাফেরা করতে হবে, সেটার জন্যও মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষকে শিখতে হচ্ছে কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বা মোকাবেলা করতে হয়। এই যে নতুন সংস্কৃতির ধারা, এটাও সাইবার সামন্ততন্ত্রের উপহার।

মহামারী-পরবর্তী দুনিয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক সাইবার সামন্তদের হাতে। মানুষের জীবনযাত্রা, তথ্যের অধিকারসহ অনেক বিষয়কেই নিয়ন্ত্রণ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো আর তার মালিকরা। আর তাই বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বৃহৎ টেক কোম্পানিগুলোকে তাদের দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ডিজিটাল দুনিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা আরো বেশি স্পষ্ট। বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনকুবেরের তালিকা ও অর্থনীতির বাইরে তাদের প্রভাব বিচার করে দেখলেও এটা সামনে আসে। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক অর্থনীতি চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করেই পুনর্গঠিত হচ্ছে দুনিয়া। এটা কিন্তু মুক্ত অর্থনীতি নয়। ঠিক মধ্যযুগের সামন্ততন্ত্রে বণ্টিত ভূমি ব্যবস্থার মতো। পেছনে রয়েছে ব্যক্তিমালিকানা। ইতিহাসের এ কালান্তর পর্বে দাঁড়িয়ে স্বদেশ ও স্বজাতি নিয়ে অনেক কিছুই ভাবার আছে।

আহমেদ দীন রুমি: লেখক ও সাংবাদিক