বিষণ্ন এক সময়। চলছে করোনাকাল। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। পড়ালেখার চাপ কম। সংক্রমণের ভয়ে দলবেঁধে যে খেলবে, তার জো নেই। তাছাড়া শহরে খেলার মাঠ বা খোলা পরিসরও ক্রমেই সংকুচিত। ঘরবন্দী। সামনে আছে কেবল নিঃসীম ভার্চুয়াল জগত। হাতে হাতে সেলফোন কিংবা অন্য কোনো ডিভাইস। সারাক্ষণ কাটছে অনলাইন নেভিগেশনে। কেউ কেউ ভালো অনেক কিছু শিখছে। পরিবর্তিত দুনিয়ার জন্য নিজের দক্ষতা ঝালিয়ে নিচ্ছে। তবে অনেকেই বিপদগামীও হচ্ছে। এই হলো বর্তমানে শিশু-কিশোরদের অবস্থা। 

বেশ কয়েক বছরে প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের সুবাদে দেশের মনো-সামাজিক দৃশ্যপটে ঘটছে পরিবর্তন। মূল্যবোধ ও সম্পর্ক ব্যবস্থায় চলছে ভাঙচুর। পারিবারিক বন্ধনগুলোও আগের চেয়ে শিথিল হচ্ছে। ফলে কিশোর-তরুণদের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। করোনাকাল তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই দিশেহারা। এক জরিপের ফল বলছে, ৬১ শতাংশ কিশোর জনগোষ্ঠী বর্তমানে বিষণ্নতায় ভুগছে। এ অবস্থায় অনেকেই সময় কাটাতে বেছে নিচ্ছে অনলাইন ও স্মার্টভিত্তিক ভিডিও গেমস। এসব গেমসের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে পাবজি কিংবা ফ্রি ফায়ার, ফোর্টিনাইটের মতো সহিংস ব্যাটল গ্রাউন্ড গেমস। এসব গেমস খেলে কিশোরদের মন-মানসিকতায় বাঁকবদল ঘটছে। ক্রমে সহিংস হয়ে উঠছে, বেশি অপরাধপ্রবণ হচ্ছে তারা। শঙ্কারূপে হাজির হওয়া গ্যাং সংস্কৃতি এবং পরস্পরের সঙ্গে কিশোরদের সহিংসতায় জড়ানোর পেছনেও অনলাইন গেমিংয়ের একটা বড় বিরূপ প্রভাব দেখছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা। 

সবখানে চিত্রটা মোটামুটি একই রকম। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি-ধমকি। বড়দের অসম্মান করে কথা বলা। দেশী-বিদেশী অস্ত্রের মহড়া। শত্রুকে ঘায়েল করে ফেসবুকে ভিডিও আপলোড। প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ। পান থেকে চুন খসলেই সংঘাত-সংঘর্ষ। দিনক্ষণ দিয়ে হত্যার ইশারা দিয়ে স্ট্যাটাস। অবশেষে খুনাখুনি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্য শহরগুলো থেকে এ ধরনের সহিংস ঘটনার খবর আসছে প্রতিনিয়ত। আর এর সঙ্গে জড়িত হচ্ছে ১৩ থেকে ২০ বছরের শিশু-কিশোররা, যাদের ওপর নির্ভর করে আগামীর দেশ। এটা বেশ উদ্বেগজনক। বয়সটা দুনির্বার। এ বয়সে ভালোর প্রতি যেমন আগ্রহ থাকে, মন্দের প্রতিও থাকে বিপুল আগ্রহ। কাজেই গঠনমূলকভাবে শিশু-কিশোরদের জীবন গড়ার দায়টা প্রথমত অভিভাবকের। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়টাও কম নয়। যৌক্তিক কারণেই ঘটেছে ইন্টারনেটের প্রসার। সহজ প্রবেশগম্যতা তৈরি হয়েছে ভার্চুয়াল জগতের। নানাভাবে এ জগতে সার্ফিং করছে কিশোর-তরুণরা। নিশ্চয়ই ভালো অনেক কিছু শিখছে। তবে ভার্চুয়াল দুনিয়ার মন্দের চোরাবালিতেও আটকা পড়ছে অনেকে। ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন অশ্লীল কনটেন্টনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন ঝুঁকছে, তেমনি আসক্ত হয়ে পড়ছে সহিংস অনলাইন গেমিংয়ে। এর বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি বিভিন্ন ধরনের সংঘাতমূলক ঘটনার ভেতর দিয়ে। দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত দেশে ‘ভিডিও গেমিং গাইডলাইন’ জাতীয় কোনো নীতিমালা করা হয়নি। এ ধরনের নীতিমালা তৈরির বোধহয় এখন সময় এসেছে। 

করোনাকালে ডিজিটালাইজেশন, প্রযুক্তির শক্তি ও অনলাইন পরিকাঠামোর সুফল প্রতি পদে পদে দৃশ্যমান। কিন্তু এর যে কিছু মন্দের দিক আছে তাও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের অতিমাত্রায় ভিডিও গেমিংয়ে আসক্ত হওয়া পড়াটা তার একটি অভিপ্রকাশ বৈকি। কোনো দেশেই ভিডিও গেমিং নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু শিশু-কিশোরদের এর আসক্তি থেকে সুরক্ষা এবং এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে সব দেশেই সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। তার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ভিডিও গেমিং। বেশি দূরে যেতে হবে না। প্রতিবেশী ভারতেই ভিডিও গেমস নীতিমালা রয়েছে। ওই নীতিমালায় গেমের ক্যারেক্টারের কী পোশাক কতটুকু থাকতে হবে, কতটুকু রক্তারক্তি দেখানো যাবে, কোন বয়সীরা কোন গেমস খেলতে পারবে, এসব বিষয় সুষ্পষ্টভাবে বেঁধে দেয়া হয়েছে। এমনকি সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকায় দেশটিতে একই গেমস ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে খেলার অনুমতি দেয়া হয়। বয়সভেদে দিনে গেম খেলার সময়সীমাও সেখানে নির্দিষ্ট। তার মানে নীতিমালার মাধ্যমে ভিডিও গেমিংয়ের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। যাতে তরুণদের মন-মননে খুব একটা বিরূপ প্রভাব না পড়ে। মনোসামাজিক বৈকল্য সৃষ্টি না হয়। নিয়ন্ত্রণহীন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আমাদের শিশু-কিশোরদের মনোজগত দ্রুত যেভাবে বদলাচ্ছে, ভিডিও গেমিংয়ের নেতিবাচকতার অভিপ্রকাশ সমাজ-রাষ্ট্রে যেভাবে সহিংস চেহারায় রূপ নিচ্ছে, তাতে এদিকটায় জরুরিভিত্তিতে নীতি-মনোযোগ দাবি দেয়া প্রয়োজন। 

শুধু মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নয়, ভিডিও গেমস শিল্পের বিকাশের জন্যও একটা নীতিমালা থাকা জরুরি। বিশ্বজুড়েই ইন্টারনেটভিত্তিক ভিডিও গেমসের রমরমা বাণিজ্য। চাইলেও সময়ের উপযোগিতা অস্বীকার করা যাবে না। বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে দেশে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান ও গেমস ডেভেলপার তৈরি হচ্ছে। আইসিটি মন্ত্রণালয় এজন্য একটা প্রকল্পও হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে কিশোর-তরুণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এ খাতে আমাদের সম্ভাবনা আশাজাগানিয়া। সুতরাং শিশু-কিশোরদের রক্ষা করে কীভাবে এ খাতে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেটিই আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। 

আপাতভাবে কয়েকটি গেমস ও অ্যাপসে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এসব গেমস-অ্যাপস ক্ষতিকর কিনা, তা যাচাইয়ে কমিশন গঠনে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশনা মেনে যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করে কমিশনের প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ আবশ্যক। তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য হলো, সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে একটি জাতীয় ভিডিও গেমিং নীতিমালা প্রণয়নই এক্ষেত্রে বড় সমাধান। নীতিমালা হলে গেমার ও ডেভেলপার উভয়ের জন্যই লাভ। ডেভেলপার জানবে সে কোন ধরনের গেম ডেভেলপ করবে, আবার কোন গেম কে কতক্ষণ খেলতে পারবে কিংবা গেম খেলে সর্বোচ্চ কত অর্থ খরচ করা যাবে এ সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকবে। এখন বিভিন্ন উপকরণ (যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, চরিত্র প্রভৃতি) বিক্রি করে গেমারদের কাছ থেকে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ আয় করছে নির্মাতা। ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিতে গেমসের বহুজাতিক নির্মাতারা তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় বিকাশ কিংবা নগদের মাধ্যমে বিক্রিলব্ধ অর্থ সংগ্রহ করছে বলে খবর মিলছে। ফলে বিপুল ভ্যাট-ট্যাক্স হারাচ্ছে সরকার। নীতিমালা থাকলে অনিয়ম অবসানের পাশাপাশি এ খাতে একটি সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। কাজেই ভারতসহ অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও কর্মকৌশল আমাদের জন্য অনুসরণীয় ।

কয়েকটি গেমস নিষিদ্ধ করে খুব একটা লাভ নেই। কারণ ইন্টারনেটে এমন অনেক গেমস আছে। সেক্ষেত্রে গেমসের প্রতি শিশু-কিশোরদের আসক্তি কীভাবে কমানো যায়, সেটি চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে অভিভাবকদের। সন্তানদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানোর পাশাপাশি সন্তানদের প্রতি আরো যত্নবান হতে হবে তাদের। নিশ্চিত করতে হবে কম্পিউটার-ল্যাপট্যাপ বা স্মার্টফোনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। শহরাঞ্চলে  খেলা-ধূলার সুযোগ কমছে। এজন্য খোলা পরিসর বা খেলার মাঠ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নগর কর্তৃপক্ষের, যাতে শিশু-কিশোররা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে একটা দৃঢ় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের ভূমিকা কম নয়। সর্বোপরি ইতিবাচক জীবন গঠন নিশ্চিতে একটি সহায়ক পরিবেশ বিনির্মাণ করতে হবে  বৈকি।

সময় পরিক্রমায় আজকের শিশু-কিশোরই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজ-রাষ্ট্রের কর্ণধার। শারীরিক-মানসিকভাবে সুস্থ না থাকলে তারা পরবর্তীতে দেশকে কাক্সিক্ষত জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে না, নেতৃত্ব দিতে পারবে না। তাই তাদের জীবন প্রক্রিয়ার গতিবিধি মাথায় রেখে একটি সহায়ক মনো-সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আর এ পরিবেশ বিনির্মাণের দায় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার। 

লেখক: সাংবাদিক