ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম বিশেষ করে কর আহরণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। এটা সম্ভব হয়েছে সেসব দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার উদ্যোগের দ্রুত বাস্তবায়নের কারণে। যেমন ভারত ১৯৬১ সালে, মালয়েশিয়া ১৯৬৭ সালে ঔপনিবেশিক আমলের আয়কর আইন যুগোপযোগী করে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া কয়েক বছর পরপর তাদের আয়কর আইন রীতিমতো ঢেলে সাজায়। একই সমতলে অবস্থানরত কমনওয়েলথ সদস্য দেশ বাংলাদেশে আয়কর আইনের আধুনিকতম সংস্করণ ১৯৮৪ সালে, তাও অর্ডিন্যান্স আকারে। তা যুগোপযোগী করতে, আইন আকারে পাস ও প্রবর্তনের কসরত চলছে দেড় যুগ ধরে। বাংলাদেশ ও ভারতের কর ব্যবস্থা, সুবিধা, ফরম্যাট মূলত একই। তবে একটা বড় প্রশাসনিক পার্থক্য হলো, বাংলাদেশের রাজস্ব বোর্ড, পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কর এক মন্ত্রণালয় এবং একজন প্রশাসনিক চেয়ারম্যানের অধীনে। ভারতে তা নয়, সেখানে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ করের প্রশাসন আলাদা। ভারতে প্রত্যক্ষ কর (আয়কর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের এবং পরোক্ষ কর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকেও ভারতের কর বিভাগ বাস্তবায়নকারী হিসেবে স্বশাসিত। কেন্দ্রের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পলিসি প্রেসক্রিপশন ও থ্রেসহোল্ড দেয়ার ব্যাপারে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও একটা শক্তিশালী অবস্থান যেমন আছে, তেমনি রাজ্য পর্যায়ে আছে স্থানীয় কর আইন ও ব্যবস্থাপনার সমান্তরাল প্রণয়ন ও প্রয়োগের  সুযোগ।  

আরেকটি হলো, হিসাব সংরক্ষণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। বাংলাদেশেরও আছে কিন্তু হিসাব পদ্ধতি, কোম্পানির আইন সব মিলিয়ে দেশগুলোয় একটা টেকসই সংস্কৃতি গড়ে উঠলেও সে সড়কে বাংলাদেশের ওঠার প্রয়াস প্রলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এক হাতে হয়। তাই এখানে ডিসক্রিয়েশনারি পাওয়ার প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত বিষয়গুলো অনেক জটিল, স্বেচ্ছা ব্যাখ্যা আচারি ও নিবর্তনমূলক হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা ধোঁয়াশা হয়ে যায়। ভারতে, ভিয়েতনামে, মালয়েশিয়ায় ওই সমস্যা তেমন একটা নেই। তারা অনেকটা স্বচ্ছ সংহত একটা আধুনিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে।

ভারতে পরোক্ষ কর ব্যবস্থাপনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কারণ দেশটির দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আমদানি-রফতানির নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানই হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর সঙ্গে যেহেতু শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের বিষয় জড়িত, সেহেতু সে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয়েছে শুল্ক ও ভ্যাট দপ্তরকে। ভ্যাট আইন প্রণয়ন ও প্রবর্তনে বাংলাদেশ যথেস্ট ধীর এবং এখনো দোটানায়। ভ্যাট মধ্যস্বত্বভোগীদের দখল থেকে সরকারি তহবিলে আনার আইনকানুন, কলাকৌশলে যেন সহজেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বাংলাদেশে আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, মূল্য নির্ধারণ কিংবা ট্যারিফ ঠিক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্যারিফ কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন এনবিআর শুল্ক করহার নির্ধারণ ও আরোপের সময় সেটিকে তেমন একটা আমলে নেয় না। একইভাবে আমদানি-রফতানি শুল্ক পরিশোধ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন জারি করতে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের মধ্যে মতামতের রশি টানাটানিতে শুল্ক আহরণ মাঠে মারা যায়। এ ঝামেলা ভারতে নেই, নেই মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়, ভিয়েতনামের পরিস্থিতি আরো স্বচ্ছ ও সাবলীল। ভারতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ই আমদানি-রফতানি বিধির আলোকে শুল্ক করাদি আরোপ করে। ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়ায় শুল্কায়ন সিদ্ধান্ত দানকারী টায়ার বা লেয়ার অনেক কম। অধিকাংশ দেশে ট্যারিফ কমিশন শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে সবকিছু দেখে। বাংলাদেশের ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে এনবিআরের যোগাযোগ নেই। গণশুনানি করে ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু শুল্ক আরোপ করে এনবিআর। এ জটিলতা নিরসনে সংস্কারের কথা বলা হলেও তাতে খুব একটা অগ্রগতি নেই।

কর ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে আছে ভিয়েতনাম। দেশটির কর ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের মৌল পার্থক্য হলো ব্যক্তি ও করপোরেট কর সম্পূর্ণ ব্যক্তি বা কোম্পানির ওপরই অর্পিত। কর পরিশোধ তাদের দায়দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ব্যক্তি যা ঘোষণা দেবেন, তার ভিত্তিতেই কর আরোপ হবে। কালেভদ্রে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা দ্রুত নিরীক্ষা ও  নিরসন করা হয়। নিরসনের স্বাধীনতা সেখানে দেয়া আছে। ব্যক্তি করের ক্ষেত্রে ইউনিভার্সাল সেলফ অ্যাসেসমেন্ট বাংলাদেশে প্রবর্তনের সময় মনে করা হয়েছিল ব্যক্তি করদাতাদের যদি কর অফিসে এসে রিটার্ন পূরণ করতে হয়, তাতে অনেক সময় লাগে এবং জনে জনে এভাবে পরীক্ষা করে নেয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ইউনিভার্সাল সেলফ ডিক্লারেশন সঠিকভাবে দেয়া হচ্ছে না—এ অনুযোগ, অভিযোগ সন্দেহে অডিটের নামে করদাতাদের বারবার ডাকা হচ্ছে। এতে কর প্রদানে আগ্রহ ও দায়িত্বশীলতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। ব্যক্তিকে যে ঘোষণা করার অধিকার দেয়া হলো, শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক সংশয়, সন্দেহ, হয়রানির অভিযোগের ভাগাড়ে পড়ে অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। নোটিস পেয়ে অফিসে গিয়ে ধনসম্পদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে করদাতারা অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে প্রায়ই অভিযোগ উঠছে। আবার করদাতারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না বলে রাষ্ট্র ও রেভিনিউয়ের স্বার্থে তাদের ডাকতে হচ্ছে। সীমিত লোকবলসম্পন্ন কর বিভাগের মনোযোগ ও সময় বিদ্যমান করদাতাদের পেছনে ব্যয়িত হচ্ছে। ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য এখানে। সেখানে আয়করের ক্ষেত্রে বলে দেয়া হয়েছে সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব ব্যক্তির, কোম্পানির। কর যা দেয়া হবে, কর অফিস তা-ই নেবে। এভাবেই চলছে। কোনো কোনো সময় অভিযোগ পেলে সেটি খতিয়ে দেখা হয়। বাংলাদেশের মতো গয়রহভাবে অডিট করা হয় না সেখানে। সেখানে কর আইন বেশ সুসংজ্ঞায়িত এবং বিস্তৃত। সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে সবকিছু। ফলে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ তেমন নেই। প্রতি বছর সংস্কার ও সহজীকরণের দিকেই তাদের মনোযোগ বেশি।

বাংলাদেশে  সহজীকরণের প্রয়াস চলছে তো চলছেই, পদ্ধতি সাপোর্ট করছে না। ঘুরেফিরে দেখা যায় একটা আন্তঃঅবিশ্বাস বিরাজ করছে। পরস্পরকে এড়িয়ে যাওয়ার এবং ফাঁকি দেয়ার চেষ্টাও চলছে। এ ধরনের ঘটনা ভিয়েতনামে খুব কম। সেখানে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্যও সহজ ও পদ্ধতিমাফিক করায়ন ও আহরণের এবং বিভিন্ন কর রেয়াতের ব্যবস্থাও আছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য হলো, এখানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক কর সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা থাকলেও রাজস্ব বিভাগের কাছে গিয়ে বাস্তবে তা আরেক রকম মনে হয়। একটার সঙ্গে আরেকটার সংগতি নেই। ভিয়েতনামে এ ধরনের জটিলতা ও অসংগতি খুব একটা নেই। রাজস্ব বিভাগ যা বলছে, সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানও তা-ই বলছে। বাংলাদেশে এ রকম সমরূপতা নেই। ভিয়েতনামে বিদেশী বিনিয়োগ বেশি আসার পেছনে এই নীতিগত সংহতি একটা বড় ভূমিকা রাখছে।

মালয়েশিয়ায় যেমন মালয়েশিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (মাইডা) সার্বিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সমন্বয় করে। সেখানে কর, কাস্টম পলিসি—সব এক জায়গায় করা হয়েছে। অর্থাৎ মাইডা যা বলবে, ওটাই শেষ কথা। ভিয়েতনামের সঙ্গে মালয়েশিয়ার পার্থক্য হচ্ছে, তারা সব বিষয় সমন্বয় করে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের কাছে সব ধরনের ক্ষমতা দিয়েছে।

১৮৬০ সালে জেমস উইলসন (১৮০৫-১৮৬০) ব্রিটিশ ভারতে প্রথম আয়কর আইন প্রবর্তন করেন। ব্রিটিশরা ভারতের শাসনভার নেয়ার পর প্রথম অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিল তাকে। ১৮৫৯ সালে তিনি ভারতে আসেন, ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল তিনি প্রথম বাজেট বক্তৃতায় ‘জনসেবার’ জন্য রাজস্ব আহরণের যে ফরম্যাট-ফর্মুলা দিয়েছিলেন, এখনো বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ কমনওয়েলথ দেশগুলোয় তা অনুসরণ করা হচ্ছে। শুধু সংস্কার হয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি কর সংস্কৃতিতে ও অবকাঠামোয় ততটা উন্নত নয়, সেহেতু উন্নত বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি, রীতি পদ্ধতি ও নিয়মকানুন সরাসরি কাট-পেস্ট করে অনুসরণে সাফল্য আসতে ও টেকসই হতে বিলম্ব হচ্ছে। যে স্টেজে যে অ্যাটিচিউড বা মনোভঙ্গি (মাইন্ড সেট) বা উপলব্ধি থাকার কথা, সেটায় না থেকে যদি এটা ভাবা হয় যে উন্নত অর্থনীতির মতো আমাদের সব করদাতা শিক্ষিত, করদানে দায়িত্ব সচেতন এবং তারা আইনকানুন সব বোঝেন-জানেন, তাহলে কর দৃষ্টিভঙ্গি (মাইন্ড সেট) ভিন্ন আঙ্গিকে চলে যাবে। এমনতর অবস্থায় রাজস্ব আহরণ পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রগ্রেসিভ না হয়ে রিগ্রেসিভ হতে পারে। নতুন করদাতা আসতে যেহেতু চাইছেন না বা তাদের আনা যাচ্ছে না, সেহেতু তাদের স্থলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বেড়ে গেলে তারাও পথ খুঁজতে পারেন কীভাবে কর দেয়া থেকে ফাঁকি দিয়ে পরিত্রাণ মিলতে পারে।

বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের অবস্থান ভারত, ভিয়েতনাম মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় পিছিয়ে থাকার আর যেসব কারণ, তার মধ্যে  বিশেষভাবে উল্লেখ্য অবারিত কর অব্যাহতি আর ট্যাক্স অ্যামনেস্টি। বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শনের জন্য দেয় কর ও জরিমানা আরোপের সঙ্গে অনৈতিক পন্থায় অর্জিত আয়ের ওপর করহার হ্রাস বা জরিমানা ছাড় দেয়ার কিংবা ‘উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না করার সুযোগ দেয়াকে এক করে দেখা হয়। দেখা যায়, একজন লোকের অপ্রদর্শিত অর্থ ঘোষণার সুযোগে দুর্নীতিজাত কালো টাকার মালিককে দেয়া হচ্ছে বিশেষ করছাড়। এটি একটি বড় ধরনের কর প্রণোদনা। আবার বলা হচ্ছে, কালো টাকার উৎস নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না, অর্থাৎ দুর্নীতিবাজকে রাষ্ট্র সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বরং ইমিউনিটি দেয়া হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতে ১৯৯৭ ও ২০১৫ সালে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছিল, সেখানে করের ও জরিমানার হার হ্রাস, জিজ্ঞাসাবাদেও অব্যাহতি ছিল না, আর এ সুযোগ ছিল নির্দিষ্ট সীমিত সময়ের জন্য। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায়ও তা-ই। এসবের ব্যতিক্রম একমাত্র বাংলাদেশেই। 

বাংলাদেশের আয়কর আইনটি সংস্কার ও আধুনিক করতে অনেক খসড়া করা হয়েছে। এনবিআর এতদিনে হয়তো উপলব্ধি করেছে ‘বিদেশী পরামর্শকদের কথা শুনে বানানো আইনকানুনগুলো স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হতে পারে। নিজস্ব বিশেষজ্ঞরাই এর খসড়া তৈরি করুক।’ এটা একটা ভালো উদ্যোগ।

বাংলাদেশের নতুন ভ্যাট আইনের দুর্ভাগ্য যে অস্ট্রেলিয়ান একজন পরামর্শক তার মুসাবিদা করে দিয়েছেন। আইনটি প্রয়োগ প্রবর্তন বিলম্বিত হচ্ছে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত যেসব দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিকীকরণ করে আইনের সঙ্গে সমন্বয় করেছে, এখানে যদি সেভাবে আয়কর আইনটি তৈরি করা যায়, সংস্কার আনা যায় তাহলে বহু সমস্যার সমাধান হবে।

আমেরিকায় আয়কর আইন কঠোর হওয়ার কারণে সবাই আয়কর দিতে বাধ্য। বাংলাদেশে পেশাজীবীরাসহ শহরের বাড়ির মালিকরা পর্যন্ত বা গ্রামের ধনী কৃষক আয়কর এড়িয়ে যেতে পারছেন। বাংলাদেশে মনিটরিং সক্ষমতায় প্রচুর ঘাটতি রয়েছে।

যদি সঠিক হিসাবের মাধ্যমে কাউকে বলা যেত যে আপনি সারা বছর ২৫ টাকা আয়কর দিয়েছেন, কিন্তু আপনার আয়কর হয়েছে ২০ টাকা। আপনি ৫ টাকা ফেরত পাবেন। এই নেন আপনার বাড়তি অর্থটা। বাড়তি অর্থ ফেরত দেয়ার সংস্কৃতিটা যখন চালু হবে তখন কিন্তু কর দেয়ার ক্ষেত্রে উন্নাসিকতা, অনাগ্রহ দূর হবে। জানামতে, নতুন আইনে বাড়তি অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যদি বাড়তি অর্থ ফেরত দেয়ার প্রথা চালু হয় তাহলে কর প্রদানে স্বেচ্ছাপ্রণোদনা ফিরে আসবে। ২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র যদি আর্থপ্রশাসনিক, রাজস্ব সংগ্রহ সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারা যায় তাহলে এটি হবে বাংলাদেশে যুগান্তকারী সংস্কার বা বিপ্লব। এনআইডির সঙ্গে ই-টিন ও অন্য বিষয়গুলোর সংযোগ করানো গেলে সব পেশাজীবীও এর ভেতরে এসে যাবেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব মেলানো বা মনিটর না করা গেলে ফাঁকি দেয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

বিদেশে যেমন কেউ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, তাকে কোথাও থামতে হবে না। তিনি টোল দিয়েছেন, কিন্তু রিসিটের জন্য তাকে ঘুরতে হচ্ছে না, আবার টোলের টাকা সরকারের কোষাগারে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তায় তাকে ভুগতে হচ্ছে না কিংবা টোল স্টেশনের ইজারা নেয়া নিয়ে গণ্ডগোলও নেই। গাড়ির মালিকদের চিপস সরবরাহ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোলের অর্থটা তার ব্যাংক হিসাব থেকে কেটে নেয়া হয়। সাম্প্রতিক একটি সংস্কারের কথা, যেমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই অডিট রিপোর্টের একটি কপি জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রারের অফিসে (আর জেএসসি) জমা দেয়ার কথা। প্রতিষ্ঠানটিতে সব প্রতিবেদন পরীক্ষা করার সময় ও লোকবল তেমন নেই। ফলে ভুয়া প্রতিবেদন দাখিলের চল চালু হয়েছে। ফলে অনেকে এনবিআরে এক ধরনের প্রতিবেদন, ব্যাংকে অন্য ধরনের প্রতিবেদন দেন। এটা নিয়েই বহু ফাঁকির ঘটনা ঘটে। এজন্য গত বছর থেকে আইসিএবি, আরজেএসসি, এফআরসি, এনবিআর, ব্যাংলাদেশ ব্যাংক একই অডিট রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে, তা সব সমন্বয় করে একীভূত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে গরমিল থাকলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ধরনের সৃজনশীল সংস্কারের কাজ করতে হবে।

কর ফাঁকি দেয়া মানে নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছি—সবার মধ্যে এ বোধটা তৈরি করা জরুরি। এ সামাজিক উপলব্ধিতে সবাইকে আসতে হবে। আসার জন্য এন্যাবলিং এনভায়রনমেন্ট তৈরি করতে হবে। বছর দুই আগ থেকে কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেয়ায় চাকরিজীবীরা সবাই কিন্তু করের আওতায় এসে গেছেন। তেমনি ট্রেড বডি সমিতি, বাড়ির মালিক সমিতির ওপর সদস্যদের কর দেয়ার দেখভালের দায়িত্ব নিতে হবে। একজন কর পরিদর্শক সুনির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্টসংখ্যক বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য তলব করতে পারেন। পুলিশ বিভাগ বাড়িওয়ালা থেকে ভাড়াটে সবার তথ্য, কার বাড়িতে কারা থাকে, কয়জন থাকে, সবার তথ্য নিচ্ছে। এগুলো এখন স্থানীয় থানা নিচ্ছে। কর প্রশাসনও সহজেই এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। এভাবে তথ্য সংগ্রহ করেই এনফোর্স করতে হবে। এনফোর্স করার দুর্বলতায়ই কিন্তু মানুষ ফাঁকি দেয়ার ফুরসত পায়।

আরেকটা বিষয় হলো, করহার যৌক্তিক হওয়া উচিত। করের ভার যাতে সহনীয় থাকে, সেজন্য করহার কমাতে হবে। যাতে মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হয়। করহার সুষম করে এর আওতা বাড়ানো যায়। এখন কড়াকড়ি করা হয় তাদের ওপর, যারা কর দিচ্ছেন। যারা দিচ্ছেন না, তাদের ওপর নজরদারি নেই। কারো কারো কর দেয়াটা অনেকটা পিকিউনারি পানিশমেন্টের মতো হওয়া ঠিক নয়।

আরেকটা বিষয় আছে, সেটি হলো আনুষ্ঠানিক রাজস্ব পরিশোধের বাইরে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বেশি হওয়ার পরিবেশে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস ও করভার বেশি হয়। এর বিপরীতে সেই অনুপাতে সেবা পায় না মানুষ। আমরা শুধু ইনফরমাল ট্রেড শব্দটি শুনেছি, অর্থনীতিতে ইনফরমাল রেভিনিউ নামে একটা শব্দ বেশ মোটাতাজা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় বাড়তি খাই খরচের রিসিট দেয়া হয়। স্পিড মানি বা অন্য কোনো নাম দিয়ে বলা হয়, শুল্ক যে দিয়েছেন তা ঠিক আছে, কাজটা আরেকটু গতিশীল করার জন্য কিছু অর্থ দিতে হবে। তার জন্য বিশেষ রঙের একটা স্লিপ আলাদাভাবে দেয়া হচ্ছে। ফলে সেখানে হিসাব থাকছে সবকিছুর। এ দেশে প্রায় ক্ষেত্রেই নির্ধারিত হারের বাইরে আলাদাভাবে বাড়তি অর্থ লেনদেন হয়, তার কোনো হিসাবায়ন নেই। এ ধরনের অস্বচ্ছতা দূর করতে রাজস্ব প্রশাসনে অটোমেশন নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে কিছুটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেটিকে বেগবান করা এখন সময়ের দাবি। (চলবে)

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান