পাটের পরই চা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি ফসল। এ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এটি উত্তরোত্তর বাড়ছে। জিডিপিতে অবদান এখনো ২ শতাংশের নিচে হলেও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে শ্রমঘন এ শিল্প। তথ্য বলছে, চা শিল্পে বর্তমানে দেড় লাখের বেশি কর্মী নিয়োজিত, যার বেশির ভাগই নারী। দেশে চা উৎপাদন ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি করোনার সময়েও রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, চা শিল্পের দিন দিন উন্নতি হলেও বদলাচ্ছে না চা শ্রমিকদের ভাগ্য। উন্নত হচ্ছে না তাদের জীবনযাত্রার মান। বাংলাদেশের চা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে শ্রমিকের জীবনমানেরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর কাজটি সরকার ও মালিকদেরই করতে হবে।

চা শ্রমিকরা যে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার, তার বড় আলামত মেলে তাদের কম মজুরি থেকে। একজন চা শ্রমিকের দৈনিক নগদ মজুরি ১২০ টাকা (মালিক-শ্রমিকের সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী যা ২০১৯-২০ সালের জন্য কার্যকর)। দৈনিক নগদ মজুরির সঙ্গে একজন শ্রমিক আরো যা পান, তার মধ্যে অন্যতম সাত-আট কেজি চাল বা আটা (সাড়ে তিন কেজি নিজের জন্য এবং বাকিটুকু স্বামী/স্ত্রী ও ১২ বছরের কম বয়সী সন্তানদের জন্য)। ভর্তুকি মূল্যে প্রতি কেজি চাল বা আটার জন্য তাকে ২ টাকা ব্যয় করতে হয়। মজুরি বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনার কারণে চা জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্যান্য নাগরিকের চেয়ে অনেক পেছনে পড়ে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০১৮ সালের এক জরিপের ফল অনুসারে, চা বাগানের ৭৪ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অথচ ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ শতাংশ। এখনো চা বাগানে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, বছর বছর ডায়রিয়া আর পানিবাহিত রোগে সেখানে মানুষ মারা যায়। বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহূত হয় চা বাগানে, এতে নারী-শিশুরা ভুগছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে। চা বাগানগুলোয় কেন এত ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষ, এর কারণ কি খতিয়ে দেখছে চা বোর্ড? এখনো ১০ হাতের ছোট্ট খুপরি ঘরে দিন কাটে চা বাগানের লাখো পরিবারের। নেই নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান। গত ১৬৭ বছরেও নিশ্চিত হয়নি চা শ্রমিকদের স্থায়ী আবাসন ও ভূমির মালিকানা। শিক্ষা, ক্রীড়া, প্রযুক্তি বা বিনোদন কিছুই নাগালে নেই চা শ্রমিকদের। তার পরও চা শ্রমিকরা পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে রাখছেন অনবদ্য অবদান।

চা উৎপাদনকারী সমপর্যায়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা সবচেয়ে কম মজুরি পান। তাদের গড় পারিবারিক আয় বাংলাদেশের জাতীয় বা গ্রামীণ দারিদ্র্যসীমা ও পারিবারিক আয়ের চেয়ে অনেক কম। আমাদের প্রতিবেশী দুই দেশ শ্রীলংকা ও ভারতে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক নগদ মজুরি যথাক্রমে ৫ ও ২ মার্কিন ডলারের বেশি। এর ওপর যোগ হয় আবাসন, শিশুযত্ন ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য বাধ্যতামূলক ভাতা, যেমন উপস্থিতি ভাতা ও বোনাস, ‘ওভার কিলো পেমেন্ট’ (দিনের কোটা পূরণের পর কাঁচা পাতা তোলার জন্য প্রদত্ত মজুরি)। ২০১৫ সালে শ্রীলংকার এক কেজি চা যখন ২ দশমিক ৯৯ ডলারে বিক্রি হয়, বিশ্ববাজারে তখন চায়ের দাম কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৫৯ ডলার এবং চট্টগ্রামে নিলামে তখন চায়ের দাম কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৪১ ডলার। শ্রীলংকার চা বিশ্ববাজারে সর্বাধিক দাম পাচ্ছে বটে, তার পরও বাংলাদেশের চায়ের গড় নিলাম মূল্য এত কম নয় যে এখানকার চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি এত কম হবে। শ্রীলংকায় চা উৎপাদন ব্যয়ের ৬৩ শতাংশ খরচ হয় শ্রমিকের জন্য এবং ৪ শতাংশ যায় কর্মচারী ও ব্যবস্থাপনার খরচ মেটাতে। বাংলাদেশে চা শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের সময় দেখা উচিত তাদের মজুরি উৎপাদন খরচের কত শতাংশ।

শ্রম আইন ও ২০১৫ সালের বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী শ্রমিকদের আরো কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয়ার কথা থাকলেও সেগুলো থেকে তারা বঞ্চিত। যেমন কর্মস্থলে টয়লেট ও প্রক্ষালন সুবিধা। যেখানে চা শ্রমিকরা চা পাতা তোলার কাজ করেন এবং যেখানে চা পাতা তোলা শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি নারী, সেখানে না আছে টয়লেট, না আছে প্রক্ষালন কক্ষ। তাছাড়া খাবার পানির সরবরাহও সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না, এমন অভিযোগও আছে। চা শ্রমিকের আবাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—এসবই যেন দুর্ভাগ্যের আয়না। তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বাগান মালিকের। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর পঞ্চম তফসিলে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে। শুধু তাই নয়, ঘর মেরামতের দায়িত্বও বাগান মালিকের। শ্রম বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা [৭ (১) খ] অনুসারে, প্রতি বছর লেবার লাইনে বসবাসকারী শতকরা অন্তত ১০ ভাগ শ্রমিকের জন্য ‘মির্তিঙ্গা টাইপ’ (পাকা দেয়ালের) গৃহ নির্মাণ করতে হবে। গৃহের মেরামত, ব্যবহার ও দেখাশোনার জন্য মালিক-শ্রমিক উভয়ের দায়িত্ব শ্রম বিধিমালায় দেয়া আছে। চা শ্রমিকরা বাগান মালিকের দেয়া গৃহের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন। প্রথমত, বাগান মালিকরা যদি প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে ঘর মির্তিঙ্গা টাইপ করে দিতেন, তবে চা বাগানের লেবার লাইন বা শ্রমিক কলোনিতে এখন আর কোনো কাঁচা ঘর থাকত না। চা বাগানগুলোয় বাগান ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি আছে। কিন্তু এসব হাসপাতালে যে চিকিৎসা পাওয়া যায়, তাতে শ্রমিকরা সন্তুষ্ট নন। ক্যান্সার, যক্ষ্মাসহ বড় কোনো রোগে পড়লে বাগানের হাসপাতাল ও ডিসপেনসারিতে ভালো চিকিৎসা মেলে না। শ্রম আইন ও বিধিমালায় যেসব প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের পাওয়ার কথা, তার অনেক কিছুই তারা পান না। চা বাগান মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যে শিক্ষার ব্যাপারে সবসময় উদাসীন থেকেছে, তার সপক্ষে জোরালো সব লক্ষণ আমরা দেখতে পাই। চা বাগানগুলোয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খুবই কম।

চা উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে নবম স্থান অর্জন করেছে। এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের কারিগর বঞ্চিত চা শ্রমিকরা। করোনা মহামারীর ভেতরেও যারা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন করলেন, দেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক পরিসরে দেশের জন্য মর্যাদা বয়ে আনলেন, রাষ্ট্র কি পারে না তাদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে। ন্যায্য মজুরিসহ চা বাগানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় বাগান মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে রাষ্ট্রকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। চা বাগানের মানুষ রাষ্ট্রের নাগরিক, কোনো কোম্পানি বা মালিকপক্ষের চুক্তিবদ্ধ দাস নয়। দেশের সব নাগরিকের সমমর্যাদা সমুন্নত রাখার ঘোষণা দিয়েছে আমাদের সংবিধান; চা শ্রমিকরা নিশ্চয়ই এর বাইরে নন।

বাংলাদেশের চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার-পরিজন শুধু দরিদ্র ও পশ্চাত্পদই নয়; বিভিন্ন ভাষা, জাতি-পরিচয়, ধর্ম, সংস্কৃতি ও একটি বিশেষ পেশা অবলম্বন করে বেঁচে থাকা মানুষ এরা। তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও পেছনে পড়ে আছে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে সমান সুযোগ-সুবিধাই যথেষ্ট নয়, দরকার আরো বেশি কিছু। কাজেই চা শ্রমিকদের প্রতি সুবিচার করতে হলে প্রথমেই শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা তাকে যেসব অধিকার দেয়, সেসব নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র যা বরাদ্দ রেখেছে, তা আরো বাড়াতে হবে। ভূমির মালিকানাবঞ্চিত চা বাগানে ‘বাঁধা’ পড়া এসব মানুষের জন্য আরো অনেক কিছু করার আছে তাদের নিয়োগদাতা, রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। এসব মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং বৈচিত্র্যময় জাতি-পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যা যা করা সম্ভব, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সে ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, মজুরি এবং শ্রম আইন ও বিধিমালা অনুসারে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা তা দিতে হবে। এজন্য নিয়োগদাতা ও রাষ্ট্রের যেমন বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি চা শ্রমিকদের মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হওয়ার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরও জোর সমর্থন প্রয়োজন। চা উৎপাদন বৃদ্ধির এ সাফল্য টেকসই করতে হলে শ্রমিকদের জীবনমানও উন্নয়ন করতে হবে। নইলে একসময় চা উৎপাদন কমে যেতে বাধ্য।