শ্রম অধিকার রক্ষা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন (সিসিসি), ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস এবং ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়ামের বিশ্লেষণমূলক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাকের ফরাসি খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ড ক্যারিফোর, অশান ও আলদি নর্থে পণ্য সরবরাহকারী ১৯৪টি কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত ত্রুটি রয়েছে। সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশের পোশাক শিল্পের জন্য এটি সতর্কতামূলক বার্তা বৈকি। প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো যখন ইউরোপভিত্তিক জোট অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ (অ্যাকর্ড) বাংলাদেশ ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশ অ্যাকর্ডের চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যথায় ব্র্যান্ডগুলো ফরাসি ও জার্মানির আইনি বাধ্যবাধকতায় দায়বদ্ধ হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে। সন্দেহ নেই, এতে ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলো বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করবে। এক্ষেত্রে দেশীয় কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ উন্নত না হলে সুপারিশ মানতে ক্রেতা ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা বন্ধ বা কমিয়ে দিলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। আমরা চাইব বিজিএমইএ, কলকারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। পিছিয়ে থাকা এসব কারখানা দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা।

দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি আয়ের উৎস তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ একসময় বিশৃঙ্খল, অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ পোশাক কারখানার ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না, ভবনধস ও অন্যান্য দুর্ঘটনা মোকাবেলার ব্যবস্থাও ছিল বেশ দুর্বল। অনেক পোশাক কারখানায় বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ও ধসের ঘটনা ঘটেছে, অনেক শ্রমিক নিহত হয়েছেন, গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারের বেশি শ্রমিক আহত হন। ভবনধসের পর বাংলাদেশের পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পর পরই পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে দুটি জোট গঠিত হয়। যেসব কারখানা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং উত্তর আমেরিকা ও কানাডার ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করে, তাদের দায়িত্ব নেয় দুই জোট। বাদবাকি কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নের কাজটি সরকারি উদ্যোগে করার সিদ্ধান্ত হয়। এত বছর সংস্কারকাজ চলার পরও অনেক কারখানাই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দেড় হাজার কারখানার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭০০ কারখানা তদারক করছে আইএলওর নেতৃত্বে ও ডিআইএফইর তত্ত্বাবধানে গঠিত সংশোধন সমন্বয় সেল (আরসিসি)। এখন পর্যন্ত কারখানাগুলোর সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে ৪৮ শতাংশ। চলতি বছর ৭০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা বন্ধ করে দিতে ডিআইএফইকে চিঠি দিয়েছে আরসিসি। তবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক নির্দেশ দেন যে তৈরি পোশাক কারখানার সংস্কারকাজ শতভাগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ থাকবে। নির্দেশনা ভঙ্গ করে কোনো কারখানার লাইসেন্স নবায়ন করলে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু খবর মিলছে, অনেক চেষ্টা করেও প্রায় ৭০০ পোশাক কারখানার ত্রুটি সংস্কারের কাজ শেষ হয়নি। অথচ নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েই এসব কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। অথচ গত বছরের জানুয়ারিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল সংস্কারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ থাকবে। কিন্তু সংস্কারকাজ শেষ না করা কারখানাগুলোর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। সংস্কারকাজ শেষ না করলে লাইসেন্স নবায়ন না করার এখতিয়ার ডিআইএফইর আছে। তবে সেটির মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। লাইসেন্স নবায়ন না করার পর কারখানাটি বন্ধ করা গেল কিনা, সেই পদক্ষেপও নিতে হবে। যেসব কারখানা সংস্কারকাজ সম্পন্ন করতে আগ্রহী, তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অনেক কারখানা আর্থিক সংকটের কারণে সংস্কারকাজ অর্ধেক করার পর বন্ধ রেখেছে। তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারখানাগুলোর অধিকাংশ ঠিকায় বা সাবকন্ট্রাকটিংয়ের মাধ্যমে পোশাক উৎপাদন করে। সরাসরি কাজ করলেও তারা মূলত নন-কমপ্লায়েন্ট ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী। ফলে লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রাখলেও আদতে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। কারখানাগুলো ঠিকই তাদের উৎপাদনকাজ চালিয়ে যাবে। তার চেয়ে লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে সংস্কারকাজ শেষ করার শর্ত আরোপ করা যেতে পারে। এ ধরনের কারখানায় যেন ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দিতে না পারেন, সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।

কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও কারখানার কাঠামোগত নিরাপত্তা ইস্যুটি আমাদের পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীলতার সঙ্গে যুক্ত। এক্ষেত্রে উন্নতি না ঘটলে আমরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ব। আমরা দেখছি প্রতিযোগী দেশগুলো সার্বিক নিরাপত্তার দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। দ্য ভিয়েতনাম টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অ্যাসোসিয়েশন এবং নেদারল্যান্ডসের আইডিএস যৌথভাবে দেশটির পোশাক খাতে জীবন ও দালান নিরাপত্তা উদ্যোগ (এলবিএস) চালু রেখেছে। ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রম মানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। একই ধরনের উদ্যোগ ভারত ও কম্বোডিয়ায়ও নেয়া হয়েছে। দুঃখজনকভাবে উল্লিখিত দেশগুলোয় এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের পরে শুরু করা হলেও তাদের অগ্রগতি বেশ প্রশংসনীয়। ফলে অনেক ক্রেতাই আমাদের প্রতিযোগীদের কাছে চলে যাচ্ছে। করোনার এ সময়ে ভিয়েতনাম রফতানিতে আমাদের টপকে যাওয়ার যে খবর মিলছে, তার একটি কারণ নিশ্চয়ই কর্মপরিবেশের উন্নয়ন। কাজেই তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।   

অ্যাকর্ডের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২৭৩টি পোশাক কারখানায় প্রাথমিক পরিদর্শনে যেসব ত্রুটি ধরা পড়েছিল, সেগুলোর শতভাগ সংশোধন সম্পন্ন হয়েছে। আর ১ হাজার ১৭৩টি পোশাক কারখানার ত্রুটি সংশোধনের লক্ষ্যে সম্পাদিত সংস্কারকাজের ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি। তবে প্রতিবেদনে এটিও বলা হয়েছে যে রানা প্লাজা ধসের সাত বছর পরও ৪৫ শতাংশ পোশাক কারখানা অগ্নিদুর্ঘটনা শনাক্ত করার ও সতর্কসংকেত বাজানোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপন করেনি; জরুরি নির্গমন পথে উজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান নির্দেশিকা স্থাপন করেনি ৬ শতাংশ কারখানা এবং ২ শতাংশ পোশাক কারখানায় তালাবদ্ধ ফটক আছে। এ কারখানাগুলোর কোনো একটিতে অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এবং তার ফলে শ্রমিকদের মৃত্যু হলে এ কয়েক বছরের অর্জন নষ্ট হতে পারে। তাই এগুলোকে যথাসম্ভব দ্রুত ওইসব ত্রুটি দূর করার জন্য তাগিদ দিতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স (নিরাপদ কর্মপরিবেশ) ইস্যুতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ সক্ষমতা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল বিশ্বব্যাংক। সৌভাগ্যবশত সে সক্ষমতা এখনো আমরা হারাইনি। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ইস্যু ঝুলিয়ে রাখলে সক্ষমতা হারানোর আশঙ্কাটি যে বাস্তবে রূপ নিতে পারে, সেটা অবশ্যই মনে রাখা দরকার। তৈরি পোশাক রফতানিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে সরকার, মালিকপক্ষ ও বায়ারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশের মোট প্রায় ৪০ হাজার তৈরি পোশাক কারখানার সিংহভাগই অ্যাকর্ডের সদস্য নয়; মাত্র হাজার দেড়েক বড় কারখানা, যাদের কাছ থেকে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো তৈরি পোশাক কিনে থাকে,  সেগুলোই এ চুক্তির অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। উপরন্তু, অ্যাকর্ডের কার্যমেয়াদও শেষ হয়ে আসছে। শিগগিরই এর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে রেডিমেড গার্মেন্টস সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল নামের এক নবগঠিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। সুতরাং যে বিপুলসংখ্যক পোশাক কারখানায় এখনো কর্মপরিবেশে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে দূর করা হয়নি, তাদের নতুন করে তাগিদ দিতে হবে। বিজিএমইএ ও সরকারকে এ কাজ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে। অ্যাকর্ডের অধীন হোক বা না হোক, প্রতিটি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।