অগ্রিম ভিসা ছাড়া একটি দেশের নাগরিক কতটি দেশে প্রবেশের সুবিধা পায় মূলত সেটি পাসপোর্টের মান নির্ধারণে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া আগাম ভিসা পেতে কোনো ধরনের জটিলতায় পড়তে হয় কিনা সেটিও বিবেচনায় নেয়া হয়। এ দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। যেখানে সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ১৯২টি দেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণ করতে পারেন, সেখানে বাংলাদেশের নাগরিকরা মাত্র ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া বা অন অ্যারাইভাল ভিসায় ভ্রমণ করতে পারেন বলে দ্য হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের পাসপোর্ট ইনডেক্সের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এ সূচকের মোট ১০১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম।

পাসপোর্টের মান দুর্বল হওয়ার পেছনে মূল কারণ বাংলাদেশীদের অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়া ও অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা। কেবল গত বছর স্থল ও সমুদ্রপথে ২৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশী অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেছেন বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের এক হিসাবে উঠে এসেছে। এর বাইরেও রয়েছে ভুয়া নথিপত্র দেখিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা। আবার ভিসার মেয়াদ শেষেও নির্দিষ্ট দেশে অবস্থান করা। এসব কারণে একদিকে দেশের নাগরিকদের ওপর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, পাসপোর্টের মান কমেছে এবং ভিসা নিষেধাজ্ঞা বেড়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এমনকি আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থী হিসেবেও বাংলাদেশীদের ব্যাপারে অনাগ্রহ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর। কিন্তু তাতেও থেমে নেই বাংলাদেশীরা, বরং নতুন গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও এখন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও একই প্রবণতার বিস্তার ঘটছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০২১ থেকে ২০২৫-এ পাঁচ বছরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ৬০ হাজার ৫৪৬ বাংলাদেশী আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা চেয়ে আবেদন করেছেন। এর মধ্যে শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন মাত্র ৮৫০ জন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ বিপুলসংখ্যক আবেদনকে নিছক অভিবাসনের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট ধরনের নিপীড়ন বা নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রমাণ প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশীদের বড় একটি অংশের আফ্রিকায় আশ্রয় আবেদনের পেছনে উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপ বা অন্য উন্নত দেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অর্থাৎ বৈধ শ্রম অভিবাসনের পরিবর্তে বিকল্প ও অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাই এখানে বড় উদ্বেগের বিষয়।

মরক্কো, তিউনিসিয়ার মতো উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপের কাছাকাছি হওয়ায় এগুলোকে ইউরোপমুখী অভিবাসনের ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। ফলে আফ্রিকাকে এখন আর শুধু শ্রমবাজার হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরোটা বোঝা যাবে না। কিছু দেশের ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠছে ইউরোপে প্রবেশের বিকল্প পথ।

প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশীরা কেন বৈধ শ্রম অভিবাসনের পরিবর্তে এত ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন? বাস্তবতা হলো এর কোনো একক উত্তর নেই।

দেশের শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের ঘাটতি, বিদেশে যাওয়ার উচ্চ ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, প্রতারণা এবং বৈধ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছুরই দায় রয়েছে ক্রমেই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে বৈধভাবে যেতে পারছেন না। উপরন্তু রয়েছে বাংলাদেশী নাগরিকদের অনেক দেশের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্তাবলি।

কিন্তু অবৈধ পথ অবলম্বন শেষ পর্যন্ত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আরো অনিশ্চিত অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে প্রত্যাবাসন, আটক, আর্থিক ক্ষতি কিংবা মানব পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিষয়টিকে কেবল বিদেশে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা উচিত নয়। কোথা থেকে, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে এসব মানুষ আফ্রিকার দেশগুলোতে যাচ্ছেন তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোকে কেন্দ্র করে অভিবাসন রুট, দালাল চক্র, ভিসা প্রক্রিয়া ও মানব পাচারের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে যেসব দেশে বাংলাদেশীদের প্রবেশের পর আশ্রয় আবেদন করার প্রবণতা বেশি, সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। সবচেয়ে জরুরি হলো বৈধ শ্রম অভিবাসনের পথকে সহজ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করা। দক্ষ ও প্রশিক্ষত জনবল রফতানি করা।

আফ্রিকায় ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশীর আশ্রয় আবেদন বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। এর পরিবর্তন করতে হলে প্রয়োজন নিরাপদ, নিয়মিত ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করা।