রাজধানীতে খেলার মাঠ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তথ্য বলছে, চলতি শতকের শুরুতেও নগর কর্তৃপক্ষের অধীন মাঠ ছিল ৬৮টি। বর্তমানে মাঠ আছে মাত্র ২০টি। দুই দশকে নিশ্চিহ্ন হয়েছে অন্তত ৪৮টি মাঠ। সামগ্রিকভাবে শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিন্তু মাঠের অভাবে ঢাকার শিশু-কিশোরদের বড় হতে হচ্ছে খেলাধুলা ছাড়াই। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে ন্যূনতম একটি করে খেলার মাঠ থাকার কথা। আর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকার প্রতিটি সেক্টরে একটি খেলার মাঠ রাখার কথা বলা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে কোনো ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। এটা উদ্বেগজনক। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে সিটি করপোরেশন ও রাজউকের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ জরুরি।

গত কয়েক দশকে ঢাকার কলেবর বেড়েছে কয়েক গুণ। অব্যাহত নগরমুখী স্রোতে জনসংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি খোলা পরিসর বা খেলার মাঠ। বরং সময়ান্তরে খেলার মাঠ হারিয়েছে একের পর এক। কোনোটি বেদখল হয়ে পরিণত হয়েছে বাজারে। আবার কোনো কোনোটিতে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়সহ নানা ধরনের স্থাপনা। কোনোটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আবাসিক ভবনের জন্য। আবার কোনো কোনো মাঠে উন্মুক্ত জায়গা থাকলেও খেলার পরিবেশ নেই। এসব জায়গায় মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মেলে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে খেলার মাঠের সংকট ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসবাসের জন্য আদর্শ একটি শহরের প্রতিটি বাসিন্দার জন্য কমপক্ষে নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা দরকার। এ মানদণ্ডের নিরিখে প্রতিটি দেশই নগরে উন্মুক্ত পরিসর বা খেলার মাঠ রাখতে সচেষ্ট। আমরা দেখছি বার্সেলোনা, ব্রাজিলের সাও পাওলো, এথেন্স, নেদারল্যান্ডসের লিসে, ব্যাংকক, টোকিও, নিউইয়র্ক, লন্ডন, হংকং, ভ্যাঙ্কুভার প্রভৃতি শহরের নগর কর্তৃপক্ষ খেলার মাঠ সংরক্ষণ করেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িয়েছে খোলা জায়গা বা মাঠের সংখ্যা। সেখানে নিশ্চিত করেছে শিশুদের খেলার উপযোগী ও সুস্থ বিনোদনমূলক পরিবেশ। এমনকি প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা, দিল্লিসহ প্রায় সব শহরে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পরিসর নিশ্চিত করা হয়েছে। শিশুসহ সবার খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করার মতো প্রয়োজনীয় মাঠের ব্যবস্থা করেছে তারা। সুপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ও প্রাসঙ্গিক নীতি, সক্রিয় নাগরিক সমাজ, নগর কর্তৃপক্ষের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপে এটা সম্ভব হয়েছে, যা আমাদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষাপ্রদ।

দেড় কোটি মানুষের শহর ঢাকা। বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ঢাকায় প্রায় ৪৮-৫০ হাজার মানুষের বাস। অপরিকল্পিত নগরায়ণে ক্রমেই বাড়ছে এ নগরীর আয়তন। তবে উন্মুক্ত পরিসরের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের উল্টোমুখী প্রবণতা এখানে। বৈশ্বিক সংস্থাটির মানদণ্ডে প্রতিটি মানুষের জন্য যেখানে নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকার কথা, ঢাকায় তা আছে মাত্র এক বর্গমিটার। জনসংখ্যার হিসাবে যে শহরে থাকার কথা দেড় হাজার খেলার মাঠ, কাগজে-কলমে সে শহরের দুই সিটি করপোরেশনের কাছে আছে ২০টির মতো খেলার মাঠ! অর্থাৎ সব শ্রেণী-পেশা, লিঙ্গ ও বয়সের মানুষ যে খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করবে, এমন জায়গার রয়েছে তীব্র সংকট। এ শহরে অপরিকল্পিত ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে একাধিক ওয়ার্ড, যেখানে নেই প্রয়োজনীয় মাঠ। এখনো যেসব মাঠ টিকে রয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেই প্রবেশের অনুমতি নেই জনসাধারণের। বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কলোনির তত্ত্বাবধানে থাকায় সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পায় হাতেগোনা কিছু নাগরিক। শিশু-কিশোরদের প্রবেশের সুযোগ নেই। বলা চলে বিদ্যমান মাঠগুলোও উপকারে আসছে না সর্বসাধারণের। এ অবস্থার আশু পরিবর্তন জরুরি।

রাজধানীতে একসময় প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক খেলার মাঠ থাকলেও এখন অবস্থা একেবারেই হতাশাজনক। খোলা জায়গা বা খেলার মাঠের সংকটে নতুন প্রজন্ম একটা বদ্ধ পরিবেশে বড় হচ্ছে। এটা তাদের মনোসামাজিক বিকাশের জন্য মোটেই শুভ নয়। কাজেই সর্বাগ্রে বেদখল হওয়া মাঠগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে হাইকোর্ট রাজধানীর ৬৮টি খেলার মাঠ ও পার্কের জন্য সংরক্ষিত জায়গা ১৫ দিনের মধ্যে দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেন। এ আদেশ যথাযথভাবে পালনে গত দুই দশকে কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে দুই সিটি করপোরেশনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু পুরনো মাঠ পুনরুদ্ধার নয়, জনসংখ্যানুপাতে নতুন নতুন মাঠ তৈরির ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষের উদ্যোগী ভূমিকা কাম্য।

আমরা দেখছি অনেক এলাকায় খোলা জায়গা আছে। সেখানে শিশুরা খেলছেও। কিন্তু এর অনেকগুলোই মাঠ হিসেবে চিহ্নিত নয়। কোনো জায়গা যদি মাঠ হিসেবে চিহ্নিত না হয় তাহলে সেটি যেকোনো মুহূর্তেই ভিন্ন কাজে ব্যবহার হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তেমনটা হচ্ছেও। সুতরাং এ পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রতিটি মাঠকেই সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনভুক্ত করতে হবে, মাঠ হিসেবে যথাযথভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে না পারে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বড় মাঠ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এলাকার মধ্যে ছোট ছোট খোলা জায়গা থাকতে হবে, যেখানে সব বয়সের মানুষ খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সেই জায়গাগুলোও নেই। এমনকি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হাউজিং প্রকল্পেও এ ধরনের পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখা হচ্ছে না। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) শিশুদের চাহিদার বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়। প্রয়োজনীয় খেলার মাঠের কথা বলা হয়। অথচ আবাসন প্রকল্প বা অন্য অবকাঠামোর ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দৃশ্যমান নয়। ফলে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পরিসর। এটা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।

সম্প্রতি তেঁতুলতলা মাঠে কলাবাগান থানার জন্য অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিবাদে একটা আন্দোলন হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে। ইট-পাথরের এ নগরে খেলার মাঠের সংকটে নানাভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোররা। কাজেই রাজধানীর খোলা জায়গা রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেয়া দরকার। খেলার মাঠ ও পার্ক অপদখলের বিরুদ্ধেও নেয়া প্রয়োজন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। কোনো সরকারি খোলা জায়গায় যেন বস্তি গড়ে না ওঠে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। শিশু-কিশোরদের অধিকার রক্ষাই শুধু নয়, রাজধানীতে স্বস্তিকর পরিবেশ বজায় রাখতেই পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান থাকা দরকার। সিটি করপোরেশনের প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ। আর সব মাঠকে দখলদারমুক্ত করে বিনোদনের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকারেরই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্র সময়োপযোগী ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।