জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশসহ অপেক্ষাকৃত স্বল্পোন্নত দেশগুলো রয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দরিদ্র নারী ও শিশুদের ওপরই বেশি পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগ-ব্যাধিতে যত লোক আক্রান্ত হচ্ছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশই শিশু। এদিক দিয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অত্যন্ত সংকটাপন্ন। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার যে চারটি দেশে শিশুরা সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষা বাধাগ্রস্ত করছে। রয়েছে কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবও। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রতি বছরেরই সাধারণ ঘটনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় এভাবে বাড়ার প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। আর জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিবেদনই এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয় শিশুদের অধিকার খর্ব করে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। দুর্যোগ মৌসুমে উপকূলবাসী নানা ঝুঁকি নিয়ে তটস্থ থাকলেও তাদের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয় পরিবারের শিশুদের নিয়ে। বড়দের তুলনায় শিশুদের জলবায়ুসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। দুর্যোগে পরিবারের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতায় ভোগার শঙ্কা বেড়ে যায়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিক শিশুজন্মের হার কমছে। কোনো না কোনো অস্বাভাবিকতা নিয়ে তারা পৃথিবীতে আসছে। শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ারও খবর মিলছে। অপুষ্ট ও খর্বকায় শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ তহবিল গঠন করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের এ প্রয়াস ইতিবাচক। পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নানা আলোচনা ও বৈঠকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উদ্যোগ-পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুদের মধ্যে পানি ও বাতাসবাহিত রোগ-ব্যাধি, অপুষ্টি, দুর্যোগকালীন মৃত্যু ও আঘাতের হার বাড়ছে। বন্যার কারণে শিশুদের স্কুল বন্ধ থাকছে। পরিবারগুলো জীবিকা হারিয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে এবং সেখানে সহিংসতা, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফের এ প্রতিবেদনে আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থা প্রতিফলিত হয়েছে এবং এতে স্পষ্ট হয়েছে আমাদের সমস্যা কতটা ব্যাপক ও প্রকট। তবে এসব সমস্যা নিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। জাতীয় উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় যতটা সম্ভব ঝুঁকি মোকাবেলার প্রয়াস চালাতে হবে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি কর্মব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্ভাব্য নাজুক পরিস্থিতি সামালাতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে শ্রীলংকা, ভুটান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে দুর্যোগকালীন জরুরি ‘সাড়া ও ত্রাণ’ কার্যক্রম এবং দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনের আরো সমন্বিত ও টেকসই কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগের সময় ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে দেশগুলো। সরকারের পক্ষ থেকে শিশুকেন্দ্রিক পরিকল্পনার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য আলাদা কমিটি গঠন করে তা নিয়মিতভাবে তদারক করা হয়। জলবায়ুর প্রভাবের শিকার হওয়া শিশুকে আশ্রয় দিয়ে হাতে-কলমে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের জন্য সক্ষম করে গড়ে তোলা হচ্ছে। আমাদের দেশে যেখানে-সেখানে শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ বিভিন্ন কারণে ক্ষতি হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের। দূষিত হয়ে পড়ছে পানি ও বায়ু। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, উন্নয়নশীল দেশের শিশুরা বায়ু ও পানিদূষণের কারণে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। দূষিত পানির কারণে পানিবাহিত সংক্রামক ও পরজীবী রোগ বাড়ছে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুতি, অভিবাসন ও সহিংসতার সূত্রপাত হচ্ছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিমা হান্না ও পওলিনা অলিভিয়া ‘উন্নয়নশীল দেশের শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব’ নামে একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার এবং তা প্রয়োগের পাশাপাশি আবহাওয়া উপযোগী ফসল উদ্ভাবন, সবার জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিতের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করা যায়। প্রভাব মোকাবেলার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের শিশুকেন্দ্রিক পরিকল্পনার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না—এমন অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় উপকরণের উৎস নিশ্চিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নীতিনির্ধারণ ও উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে শিশুদের গুরুত্ব দেয়া এবং তাদের প্রয়োজন মেটানোর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবর্তনশীল জলবায়ু এবং ক্রমেই খারাপের দিকে যাওয়া পরিবেশের প্রভাব থেকে শিশুদের ভবিষ্যেক রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
পরিবেশবাদী হিসেবে পরিচিত সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে বড়দের প্রতি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘তোমরা বড়রা আমার শৈশব ও আমার স্বপ্ন চুরি করে নিয়ে আমার জন্য একটি শূন্য পৃথিবী রেখে যাচ্ছ।’ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার পরিবারগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের কেউ ভাসমান জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে, কারো-বা আশ্রয় জুটেছে শহরের বস্তিতে। যেখানে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সহজেই এ শিশুরা মাদকাসক্ত বা অন্যান্য বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এ শিশুদের যদি আমরা যথাযথ শিক্ষা ও সুরক্ষা দিতে না পারি, তবে তারা ভবিষ্যতে দেশের জন্য বোঝায় পরিণত হবে; যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায়।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আগামীতে বড় ধরনের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, লবণাক্ততার বিস্তার এমনকি অনাবৃষ্টি, খরা, অতিবৃষ্টি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিরাট অংশ সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার মতো আশঙ্কার খবর রয়েছে। এমনটি ঘটলে দেশে মহাবিপর্যয়কর অবস্থা দেখা দেবে। এছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ সামনের সারিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বিষয়টি মোটেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশের শিশু ও নারীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে সরকারকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং অ্যাকশন প্ল্যানে বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ওই পরিকল্পনায় দরিদ্রতম ও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নারী ও শিশুদের চাহিদার ভিত্তিতে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত ও সেখানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।










