বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমান (৯ মার্চ ১৯২৯-২০ মার্চ ২০১৩) ছিলেন আপন মহিমায় ভাস্বর। অমায়িক ব্যবহার, স্বল্পভাষী ও সদালাপী। দেশ ও জাতির সংকটময় মুহূর্তে অত্যন্ত বিচক্ষণতা, দৃঢ়তার সঙ্গে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার ও রাখার ব্যাপারে অয়োময় প্রত্যয়ের অধিকারী ছিলেন তিনি।

২০০১ সালের কথা, তিনি তখন স্থানীয় সরকার ও সমবায় বিভাগের মন্ত্রী। হোটেল পূর্বাণীতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর একটি সেমিনারে  প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। বিনিয়োগ বোর্ডে বৈদেশিক বিনিয়োগ উইংয়ের পরিচালক হিসেবে আমি ওই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করি। কীভাবে সে সময় দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে সে-সংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যানসহ বক্তব্য উপস্থাপনের পর মঞ্চে বসার সময় আমাকে সহাস্য ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন এবং সেমিনার শেষে চলে যাওয়ার সময় পরম স্নেহে আমার পিঠে হাত রেখে সপ্রশংস শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মনে রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে যেকোনো অনুষ্ঠান কিংবা বঙ্গভবনে জাতীয় দিবসগুলোয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যখনই দেখা হয়েছে, সবসময়ই ব্যক্তিগত কুশলাদি জানতে চেয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দায়িত্ব পালনের পর আমার ‘স্বয়ম্ভর বাংলাদেশের প্রত্যাশায় আমার এনবিআরের দিনগুলি’ নামে একটি বই বের হয় মওলা ব্রাদার্স থেকে। তাকে বইটি দিতে গেলাম বঙ্গভবনে। খুব খুশি হলেন এবং সেখানে উপস্থিত তার সচিব, সামরিক সচিব, প্রেস সচিব সবার সামনে আমাকে উপলক্ষ করে বললেন, ‘তিনি আমার একজন প্রিয় ব্যক্তি।’

১৯৪৬ সাল। ভারতজুড়ে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছে। বৃহত্তর সিলেট ছিল তখন আসাম প্রদেশভুক্ত। মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া মুসলিম ছাত্রলীগের (দেশভাগের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ সংগঠন বিলুপ্ত হয়) নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সিলেট মুসলিম লীগ নেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে জনমত তৈরিতে প্রচারণায় ব্যস্ত। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র জিল্লুর রহমান এ গণভোটে প্রচারণার কাজ করতে গিয়ে সান্নিধ্যে আসেন শেখ মুজিবের। তার পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী দিনগুলোর ক্লান্তিহীন কর্মী ছিলেন বাংলাদেশের বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক। তাকে দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেয়া হলেও রাজনীতির ভেতরে ও বাইরের সবার কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবক।

১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্রদের চার বছর ধরে চলমান আন্দোলনের সময় দলীয় সিদ্ধান্তে ছাত্রলীগ নেতা জিল্লুর রহমান অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্র সমাবেশে জিল্লুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। সেখানেই গ্রহণ করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারির গণপরিষদ ঘেরাও কর্মসূচি। ঢাকায় তখন গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল। নুরুল আমিনের সরকার এ কর্মসূচি বানচালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২০ ফেব্রুয়ারি ফজলুল হক ও ঢাকা হলের পুকুরপাড়ে যে ১১ জন নেতার নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেখানে জিল্লুর রহমান অন্যতম নেতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে এ ছাত্রনেতারা তৈরি করেন ইতিহাস। ভাষার দাবিতে জীবন দেয় বাঙালি।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার অপরাধে জিল্লুর রহমান সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হন এবং একই সঙ্গে তার মাস্টার ডিগ্রি কেড়ে নেয়া হয়। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুনরায় তার মাস্টার ডিগ্রি ফিরিয়ে দেয়।

১৯৫৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৫৪ সাল। ঐতিহাসিক সেই গণপরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জিল্লুর রহমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। একই সময়ে তখন তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান। ১৯৫৬ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ষাটের দশকে তিনি ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ সময়েই তিনি আইভি রহমানের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী ও জাতীয় মহিলা সংস্থার সাবেক চেয়ারপারসন আইভি রহমান গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

মো. জিল্লুর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুজিবনগর সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ছিলেন তিনি। যুক্ত ছিলেন মুজিবনগর সরকার পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরিচালনা ও জয় বাংলা পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে। সে সময় পাকিস্তান সরকার তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল করে তাকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেয় এবং তার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন। ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবে। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারির পর ওই বছরের ১৬ জুলাই রাতে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দল পরিচালনা করেন। দীর্ঘ ১১ মাস শেখ হাসিনার জেলজীবন এবং চিকিৎসার জন্য আরো প্রায় ছয় মাস দেশের বাইরে অবস্থানকালে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. জিল্লুর  রহমান দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল অবদান রাখেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগে তিনি নবম জাতীয় সংসদের সংসদ উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্ব নেন। ২০ মার্চ ২০১৩ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি বাংলাদেশের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি, যিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান