বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। কিন্তু সেই রেমিট্যান্স পাঠানোর পেছনে থাকা প্রবাসীরা বরাবরই উপেক্ষা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারী প্রবাসীরা। গত কয়েক বছরে নারী শ্রমিক প্রেরণের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তাদের নির্যাতন ও ফেরত আসার ঘটনা। কভিডের কারণে এ হার আরো বেড়েছে। দেশে ফিরেও তারা নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রবাসী ও বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র সে দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। প্রবাসে অবস্থানরত ও ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) দেশে ফেরা নারী শ্রমিকদের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাতে করোনাকালে দেশে ফিরে আসা নারীদের বেদনার চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণা জরিপে দেখা  গেছে, বিদেশফেরত ৮৫ শতাংশ নারী শ্রমিক হতাশায় ভুগছেন। কাজের আশায় মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিলেন, সেখানে কাজ হারিয়ে ফিরে এসেছেন, দেশেও নতুন করে কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেননি ৬০ শতাংশ শ্রমিক। এসব নারীর বেশির ভাগই তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। বিলস ছাড়াও আরো অনেকের গবেষণায় উঠে এসেছে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের দুর্দশার চিত্র। গবেষণায় উঠে আসা এ তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা প্রতি তিন নারী শ্রমিকের মধ্যে একজনের অর্থনৈতিক অবস্থার আগের চেয়ে অবনতি হয়েছে এবং তাদের প্রায় সবাই ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশে ফিরে এসে কাজ খুঁজে নিলেও যারা কাজ করছেন তারা বর্তমান কাজ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত এবং জীবন ও জীবিকা নিয়ে চিন্তিত। আরো উদ্বেগের বিষয়, এসব নারী শ্রমিকের ৬১ শতাংশের মাথায়ই গড়ে ৭৭ হাজার টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পাশে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। বস্তুত বিলসের গবেষণায় যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা নিছক বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের বিষয় হতে পারে না। এতে দেখা যাচ্ছে, নারী শ্রমিকদের অধিকাংশকেই জোর করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া প্রত্যাশিত কাজ ও মজুরি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। এসব নারীর প্রায় সবাই বৈধ পথে বিদেশে গিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তারা কর্মাদেশের মাধ্যমেই নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাহলে তাদের এভাবে জোর করে ফেরত পাঠানো বা নির্ধারিত মজুরি ও কর্ম থেকে বঞ্চিত করা হবে কেন? তাদের অধিকার ও দাবি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় হতে হবে।

বলা বাহুল্য, দেশের অনেক পরিবার প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মহামারীর কারণে বাংলাদেশী প্রবাসীদের অনেকেই এখন নানা সমস্যা ও সংকটের সম্মুখীন। অনেকে এরই মধ্যে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকে বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আবার অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের কাজকর্মে নিজেদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় তাদের অনেককেই আর্থিক সমস্যা ও সংকটে পড়তে হয়েছে। তাই ধার-দেনা করতে হচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশ প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল, তাই বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশী এবং এরই মধ্যে মহামারীর কারণে দেশে ফিরে

আসা প্রবাসীদের নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা ও তাদের সহায়তায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসা নারী প্রবাসীদের ঋণ  দেয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং এরই মধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় বেশকিছু অর্থও বরাদ্দ করেছে। কিন্তু এ অর্থ বরাদ্দ ও বিতরণে নানা জটিলতা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ ঋণ পেতে যেসব শর্ত দেয়া হচ্ছে, তা অনেক প্রকৃত বিপন্ন নারী বিদেশফেরতের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী এ রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যখন মহামারীর কারণে বিপন্ন অবস্থায় দেশে ফিরে এসেছেন, তখন তাদের সাদরে গ্রহণ, তাদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা, প্রয়োজনে পুনরায় বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করা জাতির জন্য একটি মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অনেকে বেশকিছু সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফিরেছেন, অনেকে ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন এবং এটা এখনো অব্যাহত আছে। যারা অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছেন, তারা যাতে তাদের অর্থ যথাযথভাবে বিনিয়োগ তথা কাজে লাগাতে পারেন, এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। যারা ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন এবং পাঠাচ্ছেন, তাদের অর্থ যাতে অলস হিসেবে ব্যাংকে পড়ে না থাকে, সেজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। এক্ষেত্রে প্রবাসীদের স্বজনদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিতকরণ এবং দিকনির্দেশনা ও সহায়তা দেয়া দরকার।

বিদেশফেরত নারী শ্রমিকরা তাদের পরিবার ও সমাজের কাছে অবহেলিত। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোর মধ্যে তারা নিজেদের অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিয়েছিলেন। বর্তমানে ফেরত আসা বেশির ভাগেরই পরিবার বা সমাজে মতামতের কোনো মূল্য নেই। তাদের কেউ গ্রাহ্য করে না। তাদের কেউ বিশ্বাস করে না। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কিছু বিদেশফেরত নারী শ্রমিক তাদের অবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা ভালো পরিবেশে কাজ করেন, ভালো পরিমাণে রেমিট্যান্স আয় করেছেন এবং তাদের ভালো সঞ্চয় রয়েছে। তাদের নিয়মিত আয়ের উৎস রয়েছে। তারা শারীরিক ও মানসিকভাবেও সুস্থ। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসে তাদের অধিকার ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে যাতে উপযুক্ত চিকিৎসা পান, সে ব্যবস্থাও করতে হবে।

বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর সময় পরিবারে যতটুকু সম্মান ও মর্যাদা পান, ফিরে আসার পর তা আর থাকে না। এসব নারী যাতে পরিবার ও সমাজের কাছে ‘বোঝা’ না হন, তা দেখতে হবে সরকারকেই। এক্ষেত্রে সামাজিক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। ভুলে যাওয়া চলবে না, তারা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি অমানবিক পরিস্থিতির শিকার। এ পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এও মনে রাখতে হবে, এভাবে দলে দলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রবাসী শ্রমিক মেয়াদপূর্তির আগেই ফিরে আসতে থাকলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও দেখা দেবে অস্থিরতা।

প্রত্যাবাসী নারী শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা, উপযুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেয়া, সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি উপযুক্ত বাণিজ্যিক পরামর্শ দেয়া, মনঃসামাজিক পরামর্শসহ উপযুক্ত স্বাস্থ্যসহায়তা দেয়া, পদ্ধতিগত নিবন্ধন, তথ্য সংগ্রহের ওপর জোর দেয়া এবং উপযুক্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। বিদেশফেরত প্রবাসীদের যাতে দেশে আর্থিক সংকটে পড়ে ধার-দেনা করে বিপদাপন্ন হতে না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।