‘সবার সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মহামারী থেকে কেউ সুরক্ষিত নয়’— এটি একটি জনপ্রিয় মন্ত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ধনী দেশগুলোর নীতিমালার কারণে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন বর্ণবাদ কভিড-১৯-কে উন্নয়নশীল দেশের মহামারীতে পরিণত করেছে এখন। ফলে বিলম্ব ঘটছে মহামারীর সমাপ্তি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে।

বৈষম্য

মহামারীটি আরো সাশ্রয়ী ও কার্যকরভাবে প্রতিরোধের জন্য বাণিজ্য সম্পর্কিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্ব চুক্তির (ট্রিপস) প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করার জন্য উন্নয়নশীল দেশের প্রদত্ত প্রস্তাবে বিরোধিতা করে চলেছে বেশির ভাগ ধনী দেশগুলো।

প্রাসঙ্গিক ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, চিকিৎসা, ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম এবং প্রোফিল্যাকটিক ভ্যাকসিনগুলোর দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে এবং সাশ্রয়ী অভিগমনের প্রয়োজনে ২০২০ সালের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের প্রস্তাব এখন ডব্লিউটিওর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্যের দ্বারা সমর্থিত।

বাইডেন প্রশাসন কেবল ভ্যাকসিনের জন্যই এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বিরোধিতা উল্টে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিপূরক ব্যবস্থা ব্যতীত এবং ইউরোপীয় সরকারগুলোর ক্রমাগত বিরোধিতার কারণে মার্কিন নীতির আংশিক পরিবর্তন  এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তাই বলেছেন, টিকা নিতে ‘কলঙ্কজনক বৈষম্য’ বিরাজ করায় মহামারীটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ‘টিকাগুলো ন্যায়সংগতভাবে বিতরণের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ব্যর্থতা এ মহামারীকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলছে, যা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র এবং সবচেয়ে দুর্বল দেশ ও ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব ফেলছে।’ 

কভিড-১৯-এর নতুন, আরো সংক্রামক, এমনকি মারাত্মক রূপগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এখনো আসেনি। এরই মধ্যে টিকা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো অভাবনীয় মুনাফা অর্জনের পথে রয়েছে। টিকা বিক্রি থেকে আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বে অন্তত নয়জন নতুন বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে। শেয়ারের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট টিকা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা অতি ধনী হয়েছেন।

অব্যবহূত টিকা এখন দান

ধনী দেশগুলো তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি টিকার মজুদ গড়ে তুলছে।  ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) করোনার তিন বিলিয়ন বা জনপ্রতি ৬ দশমিক ৬ ডোজ টিকা সুরক্ষিত রেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা জনপ্রতি ৫ ডোজ টিকা মজুদ করেছে। কানাডা ৪৫০ মিলিয়ন ডোজ টিকা সংগ্রহ করেছে; যা ৩৮ মিলিয়ন মানুষের জন্য জনপ্রতি ১২ ডোজ। যুক্তরাজ্য ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি ডোজ টিকা মজুদ করেছে, যা জনপ্রতি ৮ ডোজ এবং অস্ট্রেলিয়া ১৭০ মিলিয়ন ডোজ টিকা সংগ্রহ করেছে ২৫ মিলিয়ন মানুষের জন্য, যা জনপ্রতি ৭ ডোজ।

প্রধানত প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা দেয়ার বিবেচনায় ধনী দেশগুলোর জনপ্রতি টিকা সংগ্রহ করার প্রকৃত অনুপাতগুলো আরো অশোভনীয়। ইউনিসেফের মতে, বেশির ভাগ উচ্চ আয়ের দেশ তাদের প্রয়োজনের তুলনায় কমপক্ষে ৩৫০ শতাংশ বেশি ডোজ টিকার মজুদ গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে টিকা সরবরাহের বর্তমান চুক্তিগুলোর সর্বাধিক হিসাবে তাদের জনসংখ্যার মাত্র অর্ধেক অংশকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারবে কেবল ২০২৩-এর শেষের দিকে। 

বিশ্বের শীর্ষ ধনী দেশগুলোর জোট জি৭-এর পক্ষ থেকে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ১ বিলিয়ন ডোজ টিকা বিতরণের প্রতিশ্রুতিসংক্রান্ত খবরটি প্রয়োজনীয় ১১ বিলিয়ন ডোজের তুলনায় অনেক কম। আসল সংখ্যা ৮৭০ মিলিয়ন ডোজ; কারণ ১৩০ মিলিয়ন ডোজ আগেই কোভ্যাক্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। কোভ্যাক্স ন্যায়সংগত টিকার অভিগমন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

তাছাড়া এ বছরের শেষ অবধি প্রতিশ্রুত টিকা সরবরাহ শুরু হবে না। অর্থাৎ ধনী দেশগুলোর টিকা কার্যক্রম বেশির ভাগ সম্পন্ন হওয়ার পরেই এ টিকাগুলো গরিব ও অনুন্নত দেশে পাঠানো হবে। তথ্যানুসারে বেশির ভাগ দেশ প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত টিকার ক্রয়াদেশ দিয়েছে। এক্ষেত্রে স্পষ্টতই উন্মোচিত হয়েছে জি৭-এর আসল রূপ। তাদের কোনো গুরুতর পরিকল্পনা নেই, বিশ্বকে টিকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি তো অনেক দূরের ব্যাপার।

ইউরোপীয় কপটতা

বেশির ভাগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদ সদস্যই ট্রিপস মওকুফের প্রস্তাব সমর্থন করলেও ইউরোপীয় কমিশন (ইসি), ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহীরা কঠোরভাবে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে চলেছে এবং অর্ধসত্যকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরছে। সাময়িকভাবে ট্রিপস মওকুফের প্রস্তাবটির অগ্রগতি রুখতে ইউরোপীয় নেতারা দাবি করছেন যে উৎপাদন ও রফতানির জরুরি বিবেচনায় পেটেন্ট সুরক্ষার প্রয়োজন। অথচ এ দাবির পক্ষে প্রকৃত প্রমাণ বা তথ্য দিতে তারা ব্যর্থ।  

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন মহামারীটিকে ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী দেশগুলোর আরো বেশি রফতানি আয় বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছেন, ট্রিপস মওকুফ করা হলে তা ‘স্বল্প ও মাঝারি সময়ে টিকার একটি ডোজও আসবে না। কারণ এটি কোম্পানিকে আবিস্কারের জন্য কোনো প্রণোদনা প্রদান করবে না।’

দক্ষিণের অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমানের ওষুধ এবং টিকা তৈরি করছে। এমনকি উন্নত দেশেও তারা তা রফতানি করছে। এর পরেও ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ সাময়িকভাবে ট্রিপস মওকুফের প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা কি সত্যিই এমন পরীক্ষাগারগুলোর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি, যাদের এই বৌদ্ধিক সম্পত্তি দিয়ে কীভাবে টিকা তৈরি করতে হয় তা জানা নেই। এবং আমরা আশা করতে পারি না যে তারা আগামীকালই টিকা উৎপাদন করতে পারবে?’ এ যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা।

অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশন শুধু চারটি ভ্যাকসিন—অ্যাস্ট্রাজেনেকা (শুধু ইউরোপে উৎপাদিত), ফাইজার, মডার্না এবং জনসন অ্যান্ড জনসনকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ব টিকা বর্ণবাদকে আরো উসকে দিয়েছে। এভাবে ভারতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার মাধ্যমে উৎপাদিত টিকা, যা কয়েক লাখ মানুষকে দেয়া হয়েছে, তাদেরকে এবং আরো অনেককে ইউরোপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। যদিও টিকাটির আবিস্কার করেছে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতে এটি উৎপাদন হচ্ছে অ্যাস্ট্রেজেনেকার সহযোগিতায়। 

উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন

৭ জুলাইয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৩ দশমিক ৩২ বিলিয়নের বেশি টিকা দেয়া হয়েছে, যার শতকরা ৮৫ ভাগ উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোয় এবং মাত্র শতকরা শূন্য দশমিক ৩ ভাগ গেছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয়। আফ্রিকায় টিকা দেয়ার হার (এখন পর্যন্ত শতকরা ৪ ভাগ) সব মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির। কিছু দেশে এখনো টিকা দেয়া শুরু হয়নি আর সংক্রমণের হার দ্রুত বেড়ে চলেছে।

ধনী দেশগুলোয় মৃত্যুর সংখ্যা এ বছরের জানুয়ারিতে সরকারিভাবে প্রকাশিত বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশ ছিল। টিকা দেয়ার হার অনেক বেশি হওয়ার বদৌলতে ২০২১ সালের মে মাসে এ হার বিশ্বের মোট মৃত্যুর ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মহামারীজনিত বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৮৫ শতাংশ এখন উন্নয়নশীল দেশে ঘটছে। গরিব ও উন্নয়নশীল দেশে প্রকৃত মৃত্যুর হার আরো বেশি এবং তা দ্রুত বাড়ছে। 

জাতিসংঘের মহাসচিব সতর্ক করেছেন, ‘টিকার ন্যায্যতা আমাদের সময়ের বৃহত্তম নৈতিক পরীক্ষা। এটি একটি অবশ্য করণীয় প্রয়োজনীয়তাও। সবাইকে টিকা না দেয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই হুমকির মধ্যে রয়েছে।’

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যার কমপক্ষে ৪০ শতাংশ এবং ২০২২ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বাকিদের টিকা দেয়ার জন্য ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে।

এভাবে মহামারীর অবসান হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে গ্লোবাল আউটপুট অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতিতে আরো ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করবে।

প্রয়োজন নতুন বর্ণবাদকে প্রত্যাখ্যান

ক্ষুব্ধ ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন জিজ্ঞাসা করেন, ‘সবার জন্য টিকা বা টিকা বর্ণবাদ?’ টিকার উৎপাদন বাড়িয়ে বিশ্বকে টিকা দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

করোনার টিকার পেটেন্ট স্থগিত করার মাধ্যমে মহামারী নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করতে পারলেও বিশ্বের উত্তরের দেশগুলোর স্বার্থপর নীতি কভিড-১৯-কে এখন দক্ষিণের মহামারী হিসেবে পরিণত করেছে। এতে মহামারীর অবসান এবং সবার জন্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি করছে, উত্তর-দক্ষিণের বিভাজনকে আরো গভীর করার পাশাপাশি অনিবার্যভাবে সম্পর্কিত অসন্তুষ্টিগুলোও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে আইএমএফ ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সৃষ্ট ‘বিপজ্জনক বৈষম্য’ সম্পর্কে সতর্ক করেছে। এ অবস্থায় সীমিত রাজস্ব আহরণ, ঋণের উচ্চ বোঝা এবং দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমবর্ধমান বিপর্যয় মোকাবেলায় তাদের বিকল্পগুলো জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

 

আনিস চৌধুরী: অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নিউইয়র্ক ও ব্যাংককে জাতিসংঘের সিনিয়র পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন

জোমো কেওমে সুন্দরম: মালয়েশিয়ার অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ছিলেন এবং অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালের ওয়াসিলি লিওন্টিফ পুরস্কার বিজয়ী