সম্প্রতি বয়োজ্যষ্ঠ দুই ব্যক্তিকে কানে ধরানোর ছবি বেশ আলোচনায় এসেছে। ব্যাপক সমালোচনার পর সেই  সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রত্যাহারও করেছে সরকার। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দুখজনক। সরকারের প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তা হিসেবে বিষয়টি আরও সুন্দরভাবে ‘ব্যবস্থা’ করতে পারতেন। তারপরও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘একপেশে সমালোচনার’ বিষয়ে আমার কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। তা কেন- সেটা তুলে ধরাই আজকের এই লেখা।

আমরা সবাই জানি যে, সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করেছে। উন্নত দেশগুলো এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যকরী প্রতিষেধক উদ্ভাবন করতে পারেনি বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। ফলস্বরূপ এই সর্বনাশা ভাইরাসের ছোবলে একের পর এক অসংখ্য জীবননাশ ঘটছে। অদ্যবধি এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সঙ্গরোধ অর্থাৎ বাসায় নিজকে বা পরিবারকে আবদ্ধ করে রাখা এবং জরুরি কাজে বাসা থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করা। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এই দেশে জনসচেতনতা সৃষ্টি না হলে জনবিচ্ছিন্নতার পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রায় অসম্ভব। সমস্যাটার সমাধানে উন্নত দেশগুলোই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা দিশেহারা তখন এই প্রাণঘাতী জীবণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ ও প্রতিকার প্রস্তুতি, সমন্বয়, ও ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমাদের হতাশা ও সমালোচনা থাকাটাই স্বাভাবিক। তারপরও, আমি মনে করি আমাদের এই জাতীয় মহাদুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের সমাজের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে, প্রয়োজনে একের পাশে অন্যকে দাঁড়াতে হবে (অবশ্যই দূরত্ব বজায় রেখে), সমালোচনা ভুলে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য ও সহযোগিতা করতে হবে। তাহলেই আমরা এ অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ অচিরেই কাটিয়ে উঠতে পারব। 

আমরা সাধারণ মানুষেরা সঙ্গরোধ নির্দেশনা মেনে চলছি বা চলতে পারছি। তবে বেসামরিক ও সামরিক সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা যেমন: পুলিশ, ডাক্তার, প্রশাসনের লোকজন, আর্মি ইত্যাদি পেশার লোকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ভয়ঙ্কর নাজুক পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছেন। তারা কর্তব্য পালন শেষে পরিবারের লোকজনের মাঝে ফিরে আসেন যেখানে পরিবারের লোকজনও জীবন ঝুঁকিতে থাকেন। এমনকি করোনা ভাইরাস সংক্রামণের আতঙ্ক সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পিপিই ছাড়াই অনেকে কর্তব্য পালন করছেন যা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তাদের পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে আমরা সুরক্ষিত থাকছি। প্রয়োজনীয় পিপিই ছাড়াই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওইদিন  ওই সরকারি কর্মকর্তা সরেজমিনে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে এবং মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই দায়িত্ব পালন কোনভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। জীবন ঝুঁকিকালীন কর্তব্যপালনে হয়তো কিছু দুঃখজনক অমানবিক ঘটনা ঘটতে পারে কিন্তু সেটা অবশ্যই আমাদের ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

একজনের সংস্পর্শে যখন শত শত লোক সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে এরূপ অতীব জরুরি ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সশরীরে উপস্থিত থেকে স্বল্প সময়ে এলাকায় পবিশাল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষাজনিত মানবিক তদারকি করার মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া দুষ্কর। বাস্তবতার নিরিখে তদারকি করে কার্যকরী ফল পেতে হলে কিছু তড়িৎ কঠোর ব্যবস্থা আশ্রয় নিতেই হয় যা স্বাভাবিকভাবে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই দেখলাম একজন সাংবাদিক একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে জনস্বার্থে মাস্ক পড়ার জন্য বারবার মানবিক অনুরোধ করছেন। কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তা আমলেই নিচ্ছেন না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে লোকজনকে ঘরে আবদ্ধ রাখার জন্য অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারকে কারফিউ বা ১৪৪ ধারা জারি করার পক্ষেও মত দিয়েছেন। সরকারকে ধন্যবাদ যে তারা এই উপদেশটি আমলে নিয়ে সমালোচনার দোয়ার উন্মুক্ত করেননি।

আমরা সুশীল সমাজের লোকজন ঘরে বসে সুরক্ষিত থেকে অন্যের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য নিয়ে সমালোচনা করতেই পারি কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন তাদের কর্মকে মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনায় বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় না করানোই শ্রেয়। এ সমস্ত লোকজন যদি আমাদের অযথা সমালোচনা ও দুর্নামের ভয় নিজেদেরকে গুটিয়ে নেন। অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে কর্তব্য পালন বা তদারকি থেকে বিরত থাকেন তখন এর পরিণাম হবে আরও ভয়াবহ। কাজেই, আসুন আমরা আজকের এই করোনা ভাইরাস সংক্রামণের চরম দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে বাস্তবতা মেনে নিয়ে সকলে মিলে একসাথে কাজ করি আর তাতেই আমরা সুরক্ষিত থাকবো এবং আমাদের সকলের মঙ্গল হবে। ঈশ্বর, আমাদের সকলের সহায় হবেন।

লেখক: নীলাঞ্জন কুমার সাহা,
সহযোগী অধ্যাপক ও ডিন, ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্টাডিজ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়