আজ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে আমরা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়েছি; সঙ্গে তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকেও। আজ গভীর শোকের দিন, বেদনার দিন। প্রতি বছরই এই দিনে আমরা বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে স্মরণ করি, এবারের প্রেক্ষাপট তা থেকে একটু ভিন্ন। এ বছর জাতীয় শোক দিবস এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্র এরই মধ্যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পূর্ণ করেছে। ৫০ বছরের এই যাত্রায় আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা অর্জন রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। তবে করোনার অভিঘাত আমাদের এসব অর্জনের বেশ কয়েকটিকে ফের হুমকিতে ফেলছে। সঙ্গে তৈরি করছে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও। এমন এক প্রেক্ষাপটে আজ নতুন মাত্রিকতায় আমাদের সামনে উপস্থিত জাতীয় শোক দিবস। এই দিনে বঙ্গবন্ধুসহ শাহাদতবরণকারী সবাইকে আমরা শোকাহত চিত্তে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, সমতাভিত্তিক সুখী ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য তার চেষ্টার কমতি ছিল না। করেছেন কঠোর পরিশ্রম। সবে স্বাধীন হয়েছে দেশ। চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তূপ, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার ছাপ। রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য। নেই কোনো দক্ষ প্রশাসন। এরই মধ্যে পাকিস্তানের কারাগার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে স্বদেশে ফিরে এসেছেন তিনি। শুরু করেছিলেন দেশ গঠনের নতুন সংগ্রাম। মাত্র সাড়ে তিন বছরে পাহাড়সম বাধা ডিঙিয়ে দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন নতুন উচ্চতায়। এমনই এক সন্ধিক্ষণে কুচক্রী একটি মহল রাতের অন্ধকারে কাপুরুষোচিত কায়দায় নৃশংসভাবে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। ফলে তিনি শেষ করে যেতে পারেননি তার অসমাপ্ত কাজগুলো; দেখে যেতে পারেননি তার আজন্মলালিত স্বপ্নের বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। এটিই সবচেয়ে দুঃখজনক।
কিছুটা স্বস্তির বিষয় যে অনেক দেরিতে হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। দণ্ডিত খুনিদের মধ্যে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে পাঁচজনের। বাকি ছয়জনকে এখনো আইনের আওতায় আনা যায়নি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে পলাতক সব দণ্ডিত আসামির দণ্ড কার্যকর করার জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন। কয়েকজন আসামি দেশের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারি প্রচেষ্টার অগ্রগতি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা আরো বাড়ানো দরকার।
স্পষ্টতই বঙ্গবন্ধুর খুনিরা বাংলাদেশের যাত্রা রুখে দিতে চেয়েছিল। চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ ও সম্প্রীতির সুমহান আদর্শ মুছে ফেলতে। মাঝে কিছুটা তাতে সমর্থ হলেও কালের পরিক্রমায় ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের হাত ধরে ক্রমেই ফিরেছে মুক্তিযুদ্ধের ধারা। একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অনেকাংশে সম্পন্ন হয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দৃশ্যমান অর্জন সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে জাতিসংঘের। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে প্রত্যয় বারবার ব্যক্ত করতেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ তারই সার্থক রূপায়ণ। আরো কিছু বড় অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘটছে উন্নতি। এগুলো অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তিমত্তার পরিচায়ক। আমরা দেখছি খোদ বঙ্গবন্ধুও ক্রমে আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে ফিরে এসেছেন স্বমহিমায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশেষ করতে পারেনি খুনিরা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি জাতিকে শক্তি জুগিয়ে চলেছেন। আমাদের অনুপ্রাণিত করছেন অহর্নিশ।
বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়নিষ্ঠ ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এক্ষেত্রে এখনো কিছু খামতি রয়ে গেছে। এই ৫০ বছরে অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে দেশ। লক্ষণীয় মাত্রায় দারিদ্র্য কমেছে। জোরদার হয়েছে উন্নয়ন। তবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অ্যাপ্রোচের ঘাটতিতে সুফল যাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে সম্পদের বড় অংশ। ফলে সম্পদে-আয়ে বাড়ছে বৈষম্য। ধনীরা ধনী হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরো পিছিয়ে পড়ছে। এটা বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন রাজনৈতিক মুক্তির পর আসবে বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। এক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছি, বাকি কাজটাও শেষ করতে হবে। এর মধ্যে করোনার কারণে দারিদ্র্য আবার বেড়েছে। শ্রমবাজারে আশাব্যঞ্জক খবর নেই। অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। কর্মসংস্থানের বিপুল সংকট বিরাজমান। কাজেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধুর কর্মকৃতিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে হবে।
জাতীয় শোক দিবসে আমাদের শপথ হোক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমরা আন্তরিকভাবে তত্পর হব। স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী সব ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে মোকাবেলা করে দেশকে এগিয়ে নেব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংহতির প্রতীক বঙ্গবন্ধু এখনো তার জীবন, কর্ম ও বাণী দিয়ে জাতিকে শক্তি জুগিয়ে চলেছেন। আমরা নিশ্চিত, অনাগত দিনগুলোয়ও বঙ্গবন্ধু হয়ে থাকবেন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অনিঃশেষ আলোকবর্তিকা। থাকবেন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার আধার হয়ে।










