বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মহামারী আকারে ধেয়ে আসা সংক্রামক রোগ করোনা এবং অসংক্রামক রোগ ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০২০-২৫ তে ডায়াবেটিস রোগের বিস্তার রোধে উপযুক্ত কৌশল নির্ধারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য দেশ সমুহে ১৪ নভেম্বর সাড়ম্বরে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস উদযাপনে এবারের ২০২০ সালে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নার্সদের ভূমিকা বা অবদান। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা হয়েছে নার্সরাই ডায়াবেটিস চিকিৎসায় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের প্রচার প্রচারণায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে যাদের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে আর এ চিকিৎসায় নিবেদিত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সকলেরই শিক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের বিস্তারকে থামানো, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। তা জোরদারকরণ এবং এর প্রভাব প্রতিক্রিয়াকে সীমিতকরণ। এবারের প্রচার প্রচারণা মূল 3E (Education, Engage and Empower) বা তিনটি প্রতিপাদ্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ সকলকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে শিক্ষার প্রসার, অধিক সংখ্যক রোগী- অরোগী- চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও সেবায় সম্পৃক্তকরণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের নিজেদের কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে ক্ষমতায়ন।
এ কথা অনস্বীকার্য যে আজীবনের রোগ ডায়াবেটিস চূড়ান্তভাবে নিরাময় যোগ্য নয়, একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে নানান উপসর্গের জটিলতা পরিহার পূর্বক দীর্ঘায়ু লাভ করা যায়। আর সেই নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় হল তিনটি- জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিমের (১৯১১-১৯৮৯) মূলমন্ত্র - থ্রি ডি - ডিসিপ্লিন, ডায়েট অ্যান্ড ড্রাগ। আর এই তিন উপায় বা উপকরণে যিনি প্রধান নিয়ামক সেবা দান করে থাকেন তিনি নার্স। তিনি অবশ্যই একজন পেশাজীবি এবং হেলথ টেকনোলজিস্ট । নার্সই রোগীর প্রশিক্ষক , তাকে পরিচর্যা পরিবীক্ষণ পর্যালোচনা এবং ( চিকিৎসকের কাছে) রিপোর্টিং এর অন্যতম বিশ^স্ত ব্যক্তিত্ব। ক্রিমিয়ান ওয়ারের সময় যুদ্ধাহত রোগিদের সেবা শুশ্রুষা করে ’লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ খ্যাতি নিয়ে মানবীয় গুণাবলী বিকাশের আদর্শ স্থাপন করেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেল ( ১৮২০-১৯১০)। নার্সিং পেশাকে যথাযোগ্য সম্মান ও গৌরবে বিভুষিত করতে এবং বিশেষ কওে ডায়াবেটিস রোগীদেও পরিচর্যা প্রদানে তাদের ভুমিকার তাৎপর্য জগৎময় উদ্ভাসিত করতেই আইডিএফ এর এবারের এই স্বীকুতি। আই ডিএফ তুলে ধরেছে নার্স পর্যাপ্ত সেবা দিয়ে ডায়াবেটিস রোগীকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণে, জীবনযাপনে সকল পর্যায়ে শৃঙ্খলা বিধানে এবং সময়মত উপযুক্ত মাত্রায় ঔষধ সেবনে সহায়তা করতে পারেন। চিকিৎসক রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন , পরামর্শ দিয়ে থাকেন কিন্ত তার ব্যবস্থাপত্র ও পরামর্শ মত রোগীকে নার্স এর সহায়তা অনিবার্য হয়ে উঠে। একান্ত সহচরের মত একজন নার্স রোগীকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শৃখংলা অনুসারী হতে উদ্বুদ্ধ করেন , ঔষধ ও খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন, হস্তক্ষেপ করতে পারেন। নার্স না থাকলে ডায়াবেটিস এর মত জটিল রোগ নিয়ন্ত্রণ করা রোগীর পক্ষে সহজসাধ্য নয়।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের মূল বাণী তিনধারায় প্রবাহিত :
• সকলের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য শিক্ষা
• বর্তমান পরিবেশে জীবনযাপনে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিসমূহ চিহ্ণিতকরণ, এবং
• ডায়াবেটিস রোগীদের সামাজিক ও পারিবারিকভাবে মানসিক চাপ ও বৈষম্যের শিকার সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে উপযুক্ত চিন্তাভাবনা, গবেষণা, সংলাপ, প্রকাশনাসহ বাস্তব সম্মত কার্যক্রম গ্রহণ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী একটা সচেতনার আন্দোলন শুরু করা।
ডায়াবেটিসের বিস্তারের সাথে বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রসংগটি সম্পৃক্ত করা হয়েছে এ জন্যে যে ডায়াবেটিসের বিস্তারে ও প্রতিরোধে পরিবেশের রয়েছে বিশেষ প্রভাব। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সংস্থার সাথে ডায়াবেটিস ও অসংক্রামক ব্যধি নিচয়ের বিস্তাররোধ বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের সাথে সুইজারল্যান্ডের ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বলীর সাম্প্রতিক সম্মেলনে ডায়াবেটিস ও জলবায়ুর পরিবর্তনের আনুভূমিক সম্পর্ক সম্পর্কে যৌথ সমীক্ষা চালানোর ব্যাপারে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ডায়াবেটিসের বিস্তার বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপে এ উপসংহার ও উপলব্ধি বেরিয়ে এসেছে যে, পরিবেশ ডায়াবেটিস বিস্তারে নিয়ামক ভূমিকায়। গ্যাস নি:সরণ সহ খাদ্য বাসস্থান ও যোগযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় যে অসম পরিবেশ সৃজিত হয়ে জলবায়ুর পরিবর্তনকে উসকে দেয় ডায়াবেটিস এর বিস্তারে তাদের রয়েছে আনুভূমিক সম্পর্ক। সংলাপে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের আন্তসম্পর্ক বিষয়টি প্রাধ্যন্য পায়। বলা হয় একবিংশ শতাব্দীতে ঘাতকব্যধি ডায়াবেটিস ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা মানবজাতির জন্য প্রধানতম ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেবে। সংলাপ সভায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বিস্তারকে বিশ্বব্যাপী সচেতন দৃষ্টি সীমায় আনতে আহবান জানানো হয়।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে স্বাস্থ্যই উন্নয়নের চাবিকাঠি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিবেচনাই টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত । আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন দৃষ্টি কোন থেকে পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে স্বাস্থ্যই সকল সুখ বা উন্নয়নের হাতিয়ার। সুতরাং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন বিধান এবং তার ওপর ভিত্তি করে দাড়ানো উন্নয়নই হবে টেকসই উন্নয়ন। ডায়াবেটিস যেহেতু মহামারী আকার ধারণ করে জনশক্তির বিশেষ করে উৎপাদিকা শক্তির অপচয় এবং একই সাথে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বর্ধিত ব্যয় নির্বাহে যে আর্থিক ব্যযবৃদ্ধি ঘটায় সেহেতু ডায়াবেটিসকেই সনাক্ত করতে হয় বিশ্ব অর্থনীতি এবং এর উন্নয়নের জন্য অন্যতম বাধা হিসেবে।
ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। বেশী মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম এর ভাষায় 3D ( Diet, Discipline and Drug) অর্থাৎ খাদ্য নিয়ন্ত্রণ,শৃঙ্খলা এবং ওষুধ এ রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়। খাদ্যের গুনগত মানের দিকে নজর রেখে পরিমাণ মতো খাদ্য নিয়মিতভাবে গ্রহণ, জীবনের সবক্ষেত্রে নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলা মেনে অর্থাৎ কাজেকর্মে, আহারে, বিহারে, চলাফেরায়, এমন কি বিশ্রামে ও নিদ্রায়, শৃঙ্খলা মেনে চলা দরকার। নিয়ম শৃঙ্খলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। ডায়াবেটিস রোগীকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। রোগ সম্বন্ধে ব্যাপক শিক্ষা ও আত্মসচেতনতা ছাড়া ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়না। তবে ডায়াবেটিস বিষয়ে শিক্ষা কেবল রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একই সাথে আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধব এবং ডাক্তার ও নার্সদেরও শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। রোগী যদি চিকিৎসকের সাথে সহযোগিতা করে তার উপদেশ ও নির্দেশ ভালভাবে মেনে চলেন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যথাযথভাবে গ্রহণ করেন তবে সুখী, কর্মঠ ও দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারেন।
বিশ শতকের শেষার্ধে সংক্রামক ব্যধি নিচয়ের নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ্বে সবাই উঠে পড়ে লাগলেও এবং গুটি বসন্ত কলেরা যক্ষা ম্যালেরিয়ার মত মহামারী নির্মূলে সফল হতে সক্ষম হলেও মানুষের সুন্দর সাবলীল জীবনযাপনের পথে নীরবে তার সর্ব কর্মক্ষমতা হরণকারী অ-সংক্রামক ব্যাধি ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনাসহ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগ্রহণের আবশ্যকতা যথা মনোযোগ ও চেতনার চৌহদ্দিতে আসতে সময় নিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা সমূহের প্রতি বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সকল সরকার ও জনগণের তরফে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির আহবানে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে এবং যৌক্তিকতার প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বর কে প্রতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৭ সালে ৬১/২২৫ নং প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই থেকে জাতিসংঘের সকল সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দুশর অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা কোম্পানি পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মাঝে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস নানান প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে। ২০০৭ সালেই জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবের সাথে সাথে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের ব্লু সার্কেল লোগোটিও নির্বাচিত হয়। নীল বৃত্ত জীবন ও স্বাস্থ্যের ধনাত্মক প্রতীক, নীলাকাশ সকল জাতিনিচয়কে সংঘবদ্ধ করেছে এবং একারণে জাতিসংঘের পতাকার রংও নীল। নীল বৃত্ত বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিক মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ ও জয়ে ঐকবদ্ধ প্রয়াসের প্রতীক। এ রোগের ভয়াবহ বিস্তার ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গণ দৃষ্টি আকষর্ণার্থে প্রতিবছর একেকটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় এবং বছরব্যাপি সে প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র সচেতনতা সৃষ্টি উদ্দীপক নানান কর্মসূচি পালিত হয়ে থাকে।
লেখক: সরকারের সাবেক সচিব
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান










