দেশে বায়ুদূষণ পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে। সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশগুলোর তালিকায় বরাবরই শীর্ষে থাকছে বাংলাদেশ। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ঢাকার অবস্থা আরো খারাপ। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের চলতি বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী বায়ুদূষণে বর্তমানে ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। গতকালও ঢাকার বাতাসের মান ছিল ২৯৬ একিউআই, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই অস্বাস্থ্যকর অবস্থাকে নির্দেশ করে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্য এলাকাগুলোর বায়ুর মানও খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো দেশে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। তাতে সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে নির্দেশনা থাকছে বলে খবর মিলছে। এটা ইতিবাচক। এর মাধ্যমে কোথায় বায়ুর মানে উন্নয়ন ঘটছে, কোথায় আরো অবনতি হচ্ছে, সেটি সহজে জানা যাবে; যা বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বেশ সহায়ক হবে বৈকি। কাজেই সংশ্লিষ্ট বিধিমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই জরুরি।

বায়ুদূষণ সব দেশের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে সবচেয়ে কঠিনভাবে আঘাত হানছে এটি। ফলে প্রাণ হারাচ্ছে বিপুল মানুষ। এক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৯৬ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। এটা ভীষণ উদ্বেগজনক। বাস্তবে বেশকিছু কারণে দেশে বায়ুদূষণ বেড়ে চলছে। অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে শিল্পায়ন বাড়লেও সেটি অনেকটা হচ্ছে খাপছাড়া, অপরিকল্পিতভাবে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত শর্তগুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। শিল্প-কারখানা থেকে নির্গমন হওয়া বিভিন্ন ধাতু ও বস্তুকণা অপরিশোধিতভাবে মিশছে বাতাসে। ঘটছে বায়ুদূষণ। বেড়ে চলা নগরায়ণের প্রভাবে নির্মাণ হচ্ছে দালানকোঠা, ভবন ও রাস্তাঘাট। অবকাঠামো নির্মাণে ইটের জোগান দিতে বড় বড় শহরের আশপাশসহ দেশের নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। তাতে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। একইভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে তেল-কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে। আছে বেড়ে চলা যানবাহনের নেতিবাচক প্রভাব। কালো ধোঁয়া নির্গমন অব্যাহত রেখে যানবাহনগুলো ছুটছে দূর থেকে দূরান্তে; যার বেশির ভাগই তেলচালিত। তার ওপর রয়েছে ধুলার বিড়ম্বনা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নির্মাণ হওয়া নতুন নতুন ভবনে ইমারত বিধির ব্যত্যয় ঘটছে। ভবন তৈরির সময় নির্মাণ উপকরণগুলো কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে দেয়া বা পানি ছিটিয়ে কাজ করার নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথ মানা হয় না। এছাড়া ফুটপাতের উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি সবসময়ই চলছে। তাতে সৃষ্ট ধুলা সহজেই মিশছে বাতাসের সঙ্গে। তাছাড়া সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বর্জ্য প্রায়ই পরিবহন করা হয় কোনো রকম ঢাকনা ছাড়াই। অনেক সময় ডাম্পিং স্টেশনেও ময়লা রাখা হয় ওপরে আচ্ছাদন না দিয়েই। আবার সারা দেশের চালকলগুলো থেকেও নির্গমন হয় বিভিন্ন ধরনের দূষক উপাদান। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবেশ প্রতিকূল রান্নার চুলার ধোঁয়াও। সব মিলিয়ে বাতাসে উপস্থিতি বাড়ছে জীবনধ্বংসী অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার, ঘটছে দূষণ।

একটি বৈশ্বিক প্রপঞ্চ হওয়ায় বায়ুদূষণ রোধে প্রতিটি দেশই প্রণয়ন করেছে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা। তার ভিত্তিতে দূষকগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয় কঠোর ব্যবস্থা। কোন এলাকায় বায়ুর মান খারাপ হচ্ছে, কোথায় উন্নয়ন ঘটছে তা নজরদারি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে এলাকাভিত্তিক গড়ে তোলা হয়েছে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এর মাধ্যমে সরকারি হস্তক্ষেপগুলো অনেক বেশি কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখে, তাদের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রচলনও ওইসব দেশে রয়েছে। বলবৎ আছে পলিউটার্স প্রিন্সিপল। যে দূষণ করবে তাকে বাড়তি কর দিতে হবে, গুনতে হবে জরিমানা। এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশবান্ধব ইটের ভাটা স্থাপন, ভবন-নির্মাণে সিমেন্ট ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো, জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে সরে আসা, জ্বালানি তেলনির্ভর যানবাহন কমিয়ে আনা, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর মতো পরিবেশসম্মত অ্যাপ্রোচও তারা গ্রহণ করেছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা ও নীতি হস্তক্ষেপগুলো আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

অনেক দেরি হলেও অবশেষে অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বায়ুদূষণ রোধে বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আলোচ্য বিধিমালার খসড়ায় বায়ুদূষণকারীর তালিকা তৈরিসহ যানবাহন মেরামত ও নির্মাণকাজ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আরোপ করা হয়েছে নির্ধারিত মানমাত্রা, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার সুপারিশগুলো পরিপালনের বাধ্যবাধকতা। ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুসারে প্রথমবার অপরাধের জন্য অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বোপরি, সম্ভাব্য বায়ুদূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পগুলোকে সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ প্রদানে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক।

সরকারি মহলের দাবি, সংশ্লিষ্ট বিধিমালাটি বায়ুদূষণ রোধে ভূমিকা রাখবে। তবে এক্ষেত্রে খুব একটা আশান্বিত হওয়া যাচ্ছে না। কেননা অতীতের অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর নয়। দেশে প্রায়ই প্রতিটি যুগোপযোগী আইন-বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সুন্দর সুন্দর পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ যৎসামান্য। ফলে বাস্তবায়নজনিত দুর্বলতায় সুনির্দিষ্ট সংকট বা সমস্যা নিরসন হয়নি। প্রস্তাবিত বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায়ও  বেশকিছু পদক্ষেপ ও উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে নির্দেশনা প্রদানের যে কথা বলা হয়েছে, সেটি বেশ সময়োপযোগী। কিন্তু আমাদের দেশে প্রভাবশালীদের প্রতি বিধি অনেক সময় কাজ করে না। স্বভাবতই পরিবেশ অধিদপ্তরের বিদ্যমান সক্ষমতায় বিষয়টি কতটা বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়ে যায়। সুতরাং সংস্থাটির ক্ষমতা-সক্ষমতাও আরো বাড়ানো চাই।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বায়ুদূষণ এখন বড় সংকট ও দুশ্চিন্তার কারণ  হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এটি শুধু মানুষের মৃত্যুঝুঁকি কিংবা আয়ু কমাচ্ছে তা নয়, আর্থিক ক্ষতিও বাড়াচ্ছে। এক গবেষণার তথ্য বলছে, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসজনিত রোগে। এতে চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে বাড়তি অর্থ। উৎপাদনশীলতায় ফেলছে বিরূপ প্রভাব। সুতরাং বায়ুদূষণ রোধে আর শিথিলতার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় দ্রুত পাস করে বিধিমালাটির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দূষণের কারণ প্রতিরোধ করে অন্য দেশগুলোর মতো নিতে হবে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব অ্যাপ্রোচ। ত্বরান্বিত করতে হবে সবুজায়ন প্রক্রিয়া। সম্মিলিত প্রয়াস ও নানা উদ্ভাবনী উপায়ে দেশে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, এটিই প্রত্যাশা।