‘‌দ্য প্রোটেস্ট্যান্ট এথিক অ্যান্ড দ্য স্পিরিট অব ক্যাপিটালিজম’ বইয়ে ম্যাক্স ভেবার ধর্মীয় আদর্শ আর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যকার সম্পর্ক হাজির করেছেন। পাশাপাশি আরো দুটি দিক সামনে এসেছে। কাজের ফলাফল জরুরি থাকার বিপরীতে খোদ কাজেরই জরুরি হয়ে ওঠার ঐতিহ্য। দ্বিতীয়ত, কাজকে নতুন আলোয় সংজ্ঞায়ন করা। যদিও সমালোচকরা আক্রমণ করতে চান। কিন্তু ভেবার যে অনেকাংশেই এখনো প্রাসঙ্গিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

কীভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস পুঁজিবাদের উত্থানে ভূমিকা রাখে তার দলিল হাজির করেছেন ভেবার। পশ্চিমা দেশগুলোয় প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে ক্যালভিনিজম, পাইটিজম, মেথডিজম ও ব্যাপটিজমের মধ্য দিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা পুঁজিবাদকে ত্বরান্বিত করে। ক্যালভিনিস্টরা নিয়তিবাদে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ স্বর্গে কারা যাবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত। এর বাইরে মানবজাতির বাকি অংশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ফলে ব্যক্তি বেহেশতে যাবে নাকি দোজখে—এটা দুনিয়াতেই প্রকাশিত হবে। এ বিশ্বাসের কারণে ক্যালভিন মতবাদে বিশ্বাসীরা সব সময় একটা আতঙ্কে থাকত। দুনিয়ায় তারা এমন কোনো চিহ্ন খুঁজতে শুরু করে, যার মাধ্যমে বোঝা যায় তারা নির্বাচিত। তারই একটা উদাহরণ হয়ে দাঁড়াত দুনিয়াবি জীবনের উত্থান। যেহেতু দুনিয়াবি জীবনের উত্থানের বড় চাবি শ্রম। ফলে বিরামহীন পরিশ্রম করতে থাকে তারা। শ্রম থেকে প্রাপ্ত মুনাফাকে বিনিয়োগ করতে থাকে ফের। এই যে বিরামহীন পরিশ্রম ও পুনরায় বিনিয়োগের চেইন—এটাই পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদের আদর্শিক পাটাতন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদে ‌বেরুফ বলে এমন কাজকে বোঝানো হয়, যা একই সঙ্গে ব্যক্তির দায় ও খোদার আদেশ। বেরুফ প্রতিপালনের মাধ্যমে বিশ্বাসীরা দুটি কাজ এক সঙ্গে করে। প্রথমত, সে খোদার আদেশ দুনিয়ার জমিনে মান্য করে। দ্বিতীয়ত, সে যে পরকালের জন্য নির্বাচিত, সেটা দুনিয়ার জমিনে প্রমাণ করে। ফলে বেরুফ উপেক্ষার মাধ্যমে কেবল নিজের দায়িত্বকে অবহেলা করাই হয় না, উপেক্ষা করা হয় খোদায়ি নির্দেশনা। এটা পরকালে গোল্লায় যাওয়ারই একটা লক্ষণ মাত্র।

মানুষের একটা সহজাত প্রবণতা রয়েছে কাজ না করার। আরো স্পষ্ট করে বললে প্রয়োজনের বেশি কাজ না করার। প্রয়োজনের বেশি পরিশ্রম করার মানে সম্পদের আধিক্য তৈরি করা। আর সম্পদের মজুদকে ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে আগে মনে করা হতো গুরুতর অপরাধ। ক্যাথলিক মতবাদে দাবি করা হয়েছে, ধনী ব্যক্তির বেহেশতে যাওয়ার চাইতে সূঁচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করানো সহজ। কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ সমীকরণ উল্টে দিল। আগে যেখানে খুব অল্প পরিশ্রম করত। এখন থেকে মতবাদটির অনুসারীরা শ্রমকে ইবাদত এবং সম্পদকে খোদার রহমত হিসেবে দেখা শুরু করে দিল। বিশ্বাসীরা কাজ করতে উৎসাহী হলো আরো বেশি করে। এটা সত্য যে পুঁজিবাদের টিকে থাকার জন্য প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের উত্থানই একমাত্র অনুঘটক ছিল না। বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রের উত্থান মানুষের সক্ষমতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে সক্ষমতায় বিশ্বাসীরা তাদের মতো করে অবদান রেখেছে শিল্প বিপ্লবের কয়েক শতক আগে থেকেই। পুঁজিবাদের মূল কথা হয়েছে মানুষ তার কাজের জন্যই অস্তিত্বশীল। বেভার এটা দাবি করেননি যে পুঁজিবাদের জন্ম দিয়েছে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ। বরং তার দাবি ছিল, ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে নিহিত থাকা অর্থনৈতিক চেতনা কর্মের গতিপথকে প্রভাবিত করেছে। ত্বরান্বিত করেছেন পুঁজিবাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠাকে। সংস্কারপন্থীরা এমন একটি বিশ্ববীক্ষা তৈরি করেছেন, যেটা সনাতন ধ্যানধারণার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে হাল আমলের মানুষ প্রবেশ করেছে নতুন দুনিয়ায়। নতুন আবিষ্কার সহজ করে দিয়েছে যাপিত জীবন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তহীন স্ক্রলেই পার হয়ে যাচ্ছে দিনের বড় অংশ। কখনো নেহাত অবসর থেকে আর কখনো আসক্তি থেকে। কায়িক শ্রমের জন্য রোবট ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের জন্য জেনারেটিভ এআই হয়ে উঠছে প্রধান অনুঘটক। ফলে কাজের চিরাচরিত সংজ্ঞাতেও পরিবর্তন এসেছে ঢের। মানুষের জন্য করণীয় কাজকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার জরুরত তৈরি হয়েছে। যেহেতু কায়িক ও তুলনামূলক পৌনঃপুনিকতাধর্মী কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব। ফলে কেউ কেউ মনে করতে চান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান বিস্তর একটা শ্রেণীকে কর্মসংস্থানহীন বানিয়ে ফেলবে। দাবিটি পুরোপুরি সত্য নয়। বরং মানুষের সক্ষমতাকে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষের জন্য কর্মক্ষেত্র আরো সৃজনধর্মী ও চিন্তাশীলতায় পরিণত হচ্ছে। খুব সম্ভবত বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর এত বড় পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থায় লাগেনি। অথচ সে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পরও মানুষের সামনে বাড়তি সময় ও সক্ষমতাকে অন্য কাজে ব্যয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মানুষ তার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই এগিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তির আশীর্বাদে পাওয়া বাড়তি সক্ষমতাকে মানুষ কাজে লাগাতে ইচ্ছুক কিনা। ইচ্ছুক হলে ঠিক কেমন কাজে লাগাবে। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, মানুষ এখন কেন পরিশ্রম করবে? জীবনকে সহজ করার তাগিদে? নাকি কাজ নিজেই একটি উদযাপনযোগ্য জীবন? কাজকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটা প্রবণতা দরকার। রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনে যেভাবে কাজ নিজেই জরুরি হয়ে উঠেছিল, তেমন কোনো চেতনা বর্তমান মনস্তত্ত্বে আছে কিনা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পুঁজিবাদের জন্য নতুন বাঁক। আর এ বাঁক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা পান ভেবার। 

ভেবারের সমালোচনা করা সম্ভব নানাভাবেই। ধর্মীয় আদর্শে মাত্রাতিরিক্ত চোখ রাখার প্রবণতা হয়তো সামন্তবাদ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বিবর্তনকে ফিকে করে দেখার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে বসে ভেবারের দেখা দুনিয়ায় সম্পদের নৈতিক পাটাতন নিয়ে যে বয়ান হাজির করেছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। বিশ্বজুড়ে নয়া অর্থ ব্যবস্থায় মানুষের কাজ করার বৌদ্ধিক ও নৈতিক পাটাতন তালাশের প্রসঙ্গ ফের সামনে আসে। সামনে আসে কাজকে নতুন করে সংজ্ঞা করার প্রশ্ন। 

উদাহরণ হিসেবে বাঙালি জাতির কথাই আনা যাক। কর্মবিমুখ হিসেবে বাঙালি জীবনের সঙ্গে একটা অপবাদ জড়িয়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার এ ভূমে এসে যে প্রতিটি ধর্মের অতীন্দ্রিয় ধারা জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার চালচিত্রও হয়তো এটাই প্রমাণ করে। চর্চা হিসেবে আধ্যাত্মিকতার লালন আর কর্মবিমুখ অতীন্দ্রিয় জীবনযাপনের প্রবণতা মোটেই এক নয়। সম্পদের প্রতি এ অনীহা ক্যাথলিক ইউরোপের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাতেও শিল্প ও সংস্কৃতিতে সম্পদ হয়ে উঠেছে অন্যতম খলচরিত্র। মীর মশাররফ হোসেন যখন বিষাদসিন্ধুতে বিলাপ করেন, ‘‌হায় রে পাতকী অর্থ! তুই জগতের সকল অনর্থের মূল!’—এটা কেবল তার বিলাপ হয়েই শেষ হয় না। এটা এখানকার ঐতিহ্যগত বিলাপের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু অর্থহীনতাই অর্থের প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরি করার প্রধান কারণ, যার জন্য জন্ম নেয় স্বাধীন চিন্তার চর্চায় নানা প্রতিবন্ধকতা। ফলে পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থ ব্যবস্থা সে অর্থে বিকাশলাভ করতে পারেনি। এদিকে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, আমাদের অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন কায়িক। রেমিট্যান্স ও গার্মেন্টস শিল্প দুটিই মূলত আসে কায়িক শ্রমের ওপর ভিত্তি করে। উন্নত দেশগুলোর জন্য আয়ের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে থাকে সৃজনশীলতা। আর এ কথা স্পষ্ট যে আগামী দিনগুলোয় কায়িক শ্রমের ওপর ভর দিয়ে বাজার দখল করে রাখা যাবে না। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্যই কাজ করছে। আর সেটা হলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির কিংবা পোশাক শিল্প দুই-ই প্রভাবিত হবে। 

প্রোটেস্ট্যান্ট ধারণার উত্থানে যেভাবে আলোকায়ন-পরবর্তী ইউরোপকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। সামনে এনেছে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের জয়গাথা। নতুন দুনিয়ায় মানুষের কাজ করাই চূড়ান্ত সত্যে প্রমাণিত হলো। বাংলায় অর্থনৈতিক জাগরণ আনতে সে চেতনা সেভাবে কাজ করেনি। পুঁজিবাদের ভালোমন্দ পরে বিচার্য। কিন্তু বিশ্ব যখন নয়া অর্থ ব্যবস্থার প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে; সে সময় আমাদের জন্য কেবল কাজের পেছনের নৈতিক চেতনা নির্ধারণই জরুরি নয়, কোনটাকে কাজ ধরা হবে, সেটা নির্ধারণ করাও জরুরি। 

আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা