দেশে করোনার প্রকোপ এখনো কমেনি। সংক্রমণ বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যু। মাঝে কঠোর লকডাউন দিয়েও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। এখন আমাদের হাতে শেষ ভরসা টিকাদান জোরদার করা। সরকার দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে। টিকাদান চলছে। মানুষের মধ্যেও টিকা নেয়ার ব্যাপারে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সরকার কয়েকটি দেশ থেকে টিকা আনার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সংকট হলো টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করতে পারছে না। এ অবস্থায় দেশেই করোনার টিকা উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও দেশে সরকারিভাবে টিকা উৎপাদনের জোর সুপারিশ করেছে। এটা আমলে নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী টিকা সরবরাহে ব্যর্থ হলে মাঝে টিকাদান কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ ছিল। পরে টিকা সংগ্রহে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বাড়ানো হয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। রাষ্ট্রীয় জোর তত্পরতায় চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে টিকা পাওয়ার আশ্বাস মেলে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের সিনোভ্যাক ও রাশিয়ার স্পুটনিক টিকা দেশে জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন দেয়া হয়। একই সঙ্গে দেশে কীভাবে উৎপাদন করা যায়, সে ব্যাপারেও চীন-রাশিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলে আসছিল। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে চীনের তৈরি টিকা বাংলাদেশে উৎপাদনের জন্য চীন সরকার, বাংলাদেশ সরকার ও ইনসেপ্টা ভ্যাকসিন লিমিটেডের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী টিকার কাঁচামাল জোগাবে চীনের সিনোফার্ম। বাংলাদেশে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এ টিকা বোতলজাত ও লেবেলিং করে সরকারকে সরবরাহ করবে। নিঃসন্দেহে এটা বড় অগ্রগতি। তবে এ কর্মযজ্ঞ শুধু বেসরকারি পর্যায়ে সীমিত না রেখে সরকারিভাবেও টিকা উৎপাদনের যে সুপারিশ সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি করেছে, তাকে দ্রুত আমলে নিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। একসময় সরকারি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দুটি শাখায় দুই ধরনের টিকা তৈরি হতো। একটি শাখায় কলেরা ও টাইফয়েড, অন্য শাখায় গুটিবসন্ত ও জলাতঙ্ক রোগের টিকা। প্রতিটি শাখার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল বছরে পাঁচ-সাত কোটি ডোজ। কিন্তু অবহেলা, অদূরদর্শিতা ও অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে টিকা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। করোনার এ দুঃসময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি কাজে লাগাতে হবে সরকারি এসেনশিয়াল ড্রাগসকেও। আমাদের অবকাঠামো, কারখানা, দক্ষ জনবল সবই আছে। এসেনশিয়াল ড্রাগসের বিদ্যমান অবকাঠামোয় কিছু সংস্কার ও নতুন কিছু যন্ত্রপাতি কিনলে টিকা উৎপাদন সম্ভব বলে সংসদীয় কমিটির এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়। চ্যালেঞ্জ কেবল উচ্চমানসম্পন্ন প্রযুক্তি এবং টিকা তৈরির পর্যাপ্ত কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করা।
করোনায় বিশ্বের প্রতিটি দেশই পর্যুদস্ত। এজন্য সংক্রমণ ঠেকাতে সবাই এখন টিকাদানের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে টিকার চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। টিকা উৎপাদনকারী গুটিকয়েক দেশ অন্য দেশগুলোর চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় কিছু দেশ টিকা উৎপাদক দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিজস্বভাবে টিকা উৎপাদনের জন্য চুক্তি করছে। পারস্পরিকভাবে প্রযুক্তি বিনিময় করছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশ করোনা টিকা উৎপাদক দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে নিজেদের জনগণকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টিকাদানের আওতায় আনছে। বাংলাদেশের জন্য এ পথ অনুসরণীয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চারটি ব্র্যান্ড মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে এসেছে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডোজ টিকা। অনেক দেশ টিকা দেবে বলেও দিতে পারছে না। ভারতের সেরাম থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনা হলেও ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী টিকা এসেছে মাত্র ৭০ লাখ ডোজ। বাকি টিকা কবে আসবে তাও নিশ্চিত নয়। টিকার সংকট কিছুটা কাটলেও সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়। এর মধ্যে ছয়দিনের বিশেষ গণটিকা কার্যক্রম পরিচালনার পর তা বন্ধ হয়ে গেছে। বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত টিকা হাতে এলে আবারো কার্যক্রম শুরু করা হবে। টিকার মাধ্যমে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অন্তত ১৩ কোটি লোককে টিকা দিতে হবে। দুই ডোজ হিসাব করলে মোট ২৬ কোটি ডোজ টিকা। এতসংখ্যক ডোজ টিকা সংগ্রহ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ কষ্টসাধ্য। ইউরোপ, আমেরিকার অনেক দেশে চতুর্থ দফায় সংক্রমণ বাড়ছে। এশিয়ার দেশগুলোয় এখনো সংক্রমণের তীব্রতা রয়েছে। এ অবস্থায় সারা বিশ্বেই টিকার ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। নগদ অর্থ দিয়েও অনেক দেশ টিকা সংগ্রহ করতে পারছে না। বাংলাদেশেরও একই অবস্থা। নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েও প্রয়োজনীয় টিকা পাচ্ছে না। কাজেই টিকা সংকট কাটাতে দেশে উৎপাদনের বিকল্প নেই।
ধনী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জনগণের জন্য টিকা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে অনেক দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের দেশ টিকা পাচ্ছে না। বৈশ্বিকভাবে টিকা বণ্টন ঘিরে একটা বৈষম্যমূলক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এখন দুই ডোজের পর কিছু দেশ তৃতীয় ডোজ টিকা নেয়ার অনুমোদন দিয়েছে। তিন ডোজ নিতে হলে বাংলাদেশের টিকার প্রয়োজন হবে আরো অনেক বেশি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, করোনা শিগগিরই যাচ্ছে না। তাই নির্দিষ্ট সময় অন্তর টিকা নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ অবস্থায় নিজেদের চাহিদা মেটাতে হলে বাংলাদেশকে উৎপাদনে যেতেই হবে। টিকা উৎপাদনে তৈরি করতে হবে নিজস্ব সক্ষমতা।
সরকারি সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গোপালগঞ্জে এসেনশিয়াল ড্রাগসের কারখানার পাশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন টিকা উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর আনুষঙ্গিক কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবে কারিগরি কমিটি। এটি হলে দেশেই পুরোদমে টিকা উৎপাদন সম্ভব হবে। চীন-রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এরই মধ্যে যে চীন ইনসেপ্টার সঙ্গে সহ-উৎপাদনের চুক্তিতে সই করেছে, তা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বৈকি। দ্রুত সরকারিভাবে টিকা উৎপাদনে চীনের সঙ্গে জি-টু-জি চুক্তি করতে হবে। রাশিয়ার সঙ্গেও সমরূপ চুক্তি করা দরকার। সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্নপূর্বক দ্রুত সরকারিভাবে দেশে করোনা টিকা উৎপাদন হবে, এটিই প্রত্যাশা।










