মুসলমানদের বড় উৎসব ঈদুল ফিতর। গত দুই বছর কভিড-১৯ মহামারীর শঙ্কার মধ্যে কেটেছে জনজীবন। সংক্রমণ প্রতিরোধে গৃহীত বিভিন্ন বিধি-নিষেধসহ কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পালন করতে হয়েছে উৎসবটি। এবারের ঈদে বিধিনিষেধের কড়াকড়ি না থাকলেও করোনার চতুর্থ ঢেউয়ের আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। প্রতিবেশী ভারতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। প্রত্যেকে সতর্ক না থাকলে, দায়িত্বশীল আচরণ না করলে দেশে করোনা পরিস্থিতি আবারো খারাপ হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবার উৎসব উদযাপনে শামিল হওয়াটাই কাম্য।
স্বাভাবিকভাবেই এবার গত দুই বছরের তুলনায় অধিকসংখ্যক মানুষ ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবে। ঈদযাত্রার সময় বরাবরই সড়কপথে নিরাপত্তার বিষয়গুলো উপেক্ষিত রয়ে যায়। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে পাঁচ লাখের বেশি যানবাহনের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। এসব যানবাহনের কোনোটির আয়ুষ্কাল শেষ, কোনোটি ত্রুটিপূর্ণ। ঈদযাত্রায় শামিল এসব মোটরযানের একটা বড় অংশ। মাঝ রাস্তায় নষ্ট হয়ে কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বিশৃঙ্খল আর ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে দেশের সড়ক-মহাসড়ক। ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়ক যান চলাচলের উপযোগী রাখতে এবং জনদুর্ভোগ কমাতে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সড়কের পাশাপাশি বিবেচনায় রাখতে হবে নৌপথের নিরাপত্তার কথাও।
করোনাপূর্ব সময়ের মতো এবারো রেলের টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে জনভোগান্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। ঈদের আগে আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্ভিস প্রোভাইডার পরিবর্তনের কারণে ট্রেনের অনলাইন টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকা, পরে ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কাটার ক্ষেত্রে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহককে। এছাড়া টিকিট সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ভোররাত কিংবা মধ্যরাত থেকে এসে লাইনে দাঁড়ানোর বিষয়টি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঈদ মৌসুমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে পরিবহন কোম্পানি। সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি ভাড়া না নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। ফলে ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের। সুতরাং ভাড়া নৈরাজ্যের বিষয়টির একটা সুষ্ঠু সমাধান প্রয়োজন। আমরা অনেক বছর ধরে ঈদ উৎসব পালন করে আসছি। প্রতি বছর বিভিন্ন শহর থেকে ঈদে গ্রামের বাড়ি ফেরাটা একটা নিত্যচিত্র। অথচ এত বছরেও টেকসই ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারিনি। এটা হতাশাজনক।
আমরা দেখছি মুসলমানপ্রধান অন্য দেশগুলোয়ও ঈদযাত্রা অনেক স্বস্তিকর। আমাদের মতো ইন্দোনেশিয়ায় কয়েক কোটি মানুষ তাদের কর্মস্থল থেকে গ্রামের বাড়িতে যায়। তাদের যাত্রা যেন নির্বিঘ্ন হয় সেজন্য সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মাসখানেক আগে থেকেই ইন্দোনেশিয়া সরকারের বিশেষ ইউনিট কাজ করে। সড়কপথে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল নিরুৎসাহিত করার জন্য ট্রেন ও জাহাজে বিনামূল্যে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে দ্বীপরাষ্ট্রটির সরকার। দেশটির ৮ থেকে ৯ শতাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বাড়ি ফেরার যাত্রার জন্য জাহাজ, ট্রেন, বাসের টিকিট বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারে। করোনা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এ বছর কেবল বুস্টার ডোজ টিকা নেয়া নাগরিকরা ঈদের ছুটিতে ভ্রমণ করতে পারবেন সেখানে। তবে যাত্রীদের সেবা দিতে মহাসড়ক, স্টেশন ও বন্দরে প্রায় ১৪ হাজার জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানেও ঈদযাত্রা আরামদায়ক। সুন্দর সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং বাস কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীলতায় সেসব দেশ ঘরমুখী যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করেছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
ঈদ মৌসুমে সড়ক ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। যাত্রী বেশি, গাড়ি কম। ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সংবাদমাধ্যমের খবরে এবারো মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তীব্র যানজটের খবর মিলছে। ফলে একদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, তেমনি চালকেরও কষ্ট হয়। উন্নত দেশগুলোয় দূরপাল্লার যাত্রায় দুজন চালক ছাড়া গাড়ি চলার অনুমতি নেই। এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও একই চিত্র। সেখানে কোনো চালকের একটানা ৬ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানোর নিয়ম নেই। আমাদের দেশে বিশেষ করে ঈদের সময়ে টানা ১২-১৮ ঘণ্টাও কখনো চালকরা গাড়ি চালান। বিশ্রাম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ে। তাছাড়া নিষিদ্ধ হলেও ছোট ছোট অনেক যানবাহন মহাসড়কে উঠে যায়। এতেও দুর্ঘটনা ঘটে। এ ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বন্ধে পুলিশের টহল বাড়াতে হবে।
ঈদ মৌসুমের মধ্যেই এবার মে দিবস পালিত হচ্ছে। দিনটি শ্রমিকদের লড়াই-সংগ্রাম স্মরণের দিন। তাদের অধিকার আদায়ের দিন। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত অনেক পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা অপরিশোধিত বলে খবর মিলছে। ঈদ উদযাপন যেন আনন্দময় হয়, সেজন্য শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দ্রুততম সময়ে পরিশোধ করা জরুরি। অনেক কারখানায় ছুটি বাড়ানো নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে। এরও একটা সুষ্ঠু বিহিত প্রয়োজন। শুধু পোশাক নয়, বেসরকারি খাতের কর্মরত অনেক কর্মীই বেতন-ভাতা পাননি। ফলে সংসারের ব্যয় নির্বাহ ও আনন্দ উদযাপনে তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তাদের বেতন-ভাতা দ্রুত নিশ্চিত করা চাই।
করোনাকালীন বিধিনিষেধের কারণে গত দুই বছর ফ্যাশন হাউজগুলোর তেমন ব্যবসা হয়নি। এবার তাদের ব্যবসা ভালো হয়েছে। একইভাবে খাদ্যসামগ্রীর উৎপাদনকারী, মধ্যস্বত্বভোগী ও বিক্রয়কারীদের আয়ও গত বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। এটা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর। তবে দরিদ্র মানুষের অবস্থা খারাপ। একদিকে করোনার অভিঘাত এবং অন্যদিকে দামজনিত অভিঘাতে তাদের জীবন নাকাল। তাদের সাহায্য করতে বিত্তবানদের এগিয়ে আসা চাই। ইসলামে ঈদের সময় সদকাতুল ফিতর ও জাকাত প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য সমাজ-রাষ্ট্রে যেন সম্পদের পুনর্বণ্টন হয়। এটি আমলে নিয়ে সচ্ছল ব্যক্তিদেরও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে হবে, যাতে ঈদ আনন্দ সর্বজনীন হয়ে ওঠে।
ঈদের শিক্ষা হলো সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মবোধের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ এবং পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্প্রসারণ। ঈদ আমাদের সামষ্টিক জীবনে যে মিলন ও শুভবোধের চর্চার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তা সঞ্চারিত হোক নিত্যকার জীবনযাপনে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে সামাজিকতা ও মানবতাবোধকে সমুন্নত করাই ঈদের মূল তাত্পর্য। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।










