বর্তমান বিশ্বসভ্যতায় জেনোসাইড নিঃসন্দেহে এক ধরনের ভয়ংকর, ঘৃণ্য অপরাধ। এটা এক ধরনের মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ। এ অপরাধ কখনো তামাদি হয় না, যেকোনো সময় এর বিচার করার অধিকার রাখে বিশ্বসম্প্রদায়। রাফায়েল লেমকিন (১৯০০-১৯৫৯) নামের একজন পোলিশ-ইহুদি আইনজীবী Genocide শব্দটির সৃষ্টিকর্তা। ইংরেজি Genocide শব্দটি এসেছে গ্রিক ও লাতিন থেকে। গ্রিক Genos শব্দের অর্থ Race or Tribe আর লাতিন Cide শব্দের অর্থ Killing. সহজ কথায় বলা যায় জেনোসাইড হলো এমন এক ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধ, যার প্রধান লক্ষ্য থাকে কোনো জাতি, গোত্র, ধর্মীয় গোষ্ঠীকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা। এটা এক ধরনের পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ অপরাধে জাতি-গোত্র-ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বিলীন করে দেয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিকে চিরতরে পদানত বা নিশ্চিহ্ন করা। যে জেনোসাইডের কথা প্রথম বলেছিলেন একজন মার্কিন, যার নাম আর্চার কেন্ট ব্লাড। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, একজন প্রত্যক্ষদর্শী কূটনীতিক আর্চার কেন্ট ব্লাড পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পকিস্তানি নিধনযজ্ঞকে জেনোসাইড বললেও মার্কিন কর্তৃপক্ষ কিন্তু এখনো এ হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

আর্চার কেন্ট ব্লাড একজন মার্কিন কূটনীতিক। তার কর্মস্থল ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকার কনস্যুলেট বা উপদূতাবাস। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। এর আগেও একবার তার ঢাকায় পোস্টিং ছিল। তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯৬০ সালে। তখন তার পদবি ছিল ডেপুটি প্রিন্সিপাল অফিসার। তখন থেকেই এ শহর, এ দেশের মানুষের সঙ্গে জানাশোনা আর্চার কেন্ট ব্লাডের। এরপর একটা বিরতি দিয়ে আবার ঢাকায় আসেন ১৯৭০ সালে। এ সময় তিনি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পান। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, উত্তাল মার্চের অসহযোগ আন্দোলন এবং ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানের বর্বর আক্রমণ। যাকে তিনি উল্লেখ করেছেন জেনোসাইড হিসেবে।

২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকার বুকে হিংস্র হায়েনার মতো হামলে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মার্কিন ও চীনা সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে। ট্যাংক, কামান আর মেশিনগানের গর্জনে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার স্নিগ্ধ শরতের আকাশ। আগুনের উদ্ধত, সর্বগ্রাসী শিখায় আলোকিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। ইয়াহিয়া খানের খুন পিয়াসী বাহিনীর তাণ্ডব নিজ চোখে দেখেছেন আর্চার কেন্ট ব্লাড। ওই রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা প্রত্যক্ষ করে ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে মার্কিন দপ্তরে তিনি একটি তারবার্তা পাঠান, যার শিরোনাম ছিল ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ বা সুর্নিদিষ্ট গণহত্যা। এ বার্তায় তিনি লেখেন, ওই রাতে প্রাণ বাঁচাতে ঢাকার মানুষ পুরো শহরে ছোটাছুটি করেছে। আর বর্বর সেই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ছয় হাজার মানুষ। এ তারবার্তার ভাষ্য ছিল অনেকটা এ রকম—Here in Decca [Dhaka] we are mute and horrified witnesses to a reign of terror by Pak Military. Evidence continues to mount that MLA authorities lave list Awami League supporters whom they are systematically eliminating by seeking them out in their homes and shooting them down. Among those marked for extinction in addition to A.L.’ (The Blood Telegram, Gary J. Bass)

এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী সময়ে প্রথা ভেঙে পাকিস্তান বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করে বিশেষ বার্তা পাঠান আর্চার কেন্ট ব্লাড। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালে শীতল যুদ্ধের বিশ্ব রাজনীতির পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান মিত্র ছিল রিচার্ড নিক্সনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন পাকিস্তানের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিক্সন প্রশাসনের কোপানলে পড়ার শতভাগ শঙ্কার মধ্যেও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন কেন্ট ব্লাড। শুধু তা-ই নয়, এবার তিনি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন অন্যান্য দূতাবাসের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মার্কিন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তাদের। মোট ২০ জনের সই করা বার্তাটি পাঠানো হয় ওয়াশিংটন, করাচি ও লাহোরের মার্কিন দূতাবাসগুলোয়। এ বার্তার শিরোনাম ছিল ‘Dissent From US Policy Toward East Pakistan. এ পত্রের বার্তাটি ছিল বেশ কড়া। পূর্ব পাকিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমালোচনা।

নিক্সন-কিসিঞ্জারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্লাডসহ অন্য ২০ জন মার্কিন নাগরিকের এই ঔদ্ধত্য একেবারেই মেনে নেয়নি। যুদ্ধের পরের দিকে পকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সমর্থন বিষয়টিকে প্রমাণিত করে। এদিকে খড়্গ নেমে আসে আর্চার কেন্ট ব্লাডের ওপর। তিনি কূটনীতিক দায়িত্ব থেকে অপসারিত হন। পরে অবশ্য পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে পাক সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিষয়ে তিনি দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ শিরোনামে একটি সুপাঠ্য বই লিখে যান; যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দলিল। বাঙালি জাতির যুদ্ধদিনের এ বিশেষ বন্ধু মারা যান ২০০৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট কলিন্স, কলোরাডোয়। 

২০২২ সালের ২১ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত অপরাধকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও নীরব। যদিও একজন মার্কিন নাগরিক আর্চার কেন্ট ব্লাড জেনোসাইড শুরুর প্রথম দিকেই এ বর্বর হত্যাকাণ্ডকে জেনোসাইড হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কৃতজ্ঞতা বাংলাদেশের যুদ্ধদিনের বন্ধু একজন আর্চার কেন্ট ব্লাডের প্রতি। 

 

রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়