দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে বৈদেশিক মুদ্রা খরচে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিবেচনায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার কথাও তুলে ধরেছে ব্যবসায়ী নেতাদের সংগঠনটি। বিদ্যমান অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঠিক রাখতে মিতব্যয়ী পদক্ষেপ হিসেবে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি না হয়। একই সঙ্গে তদারকিও জোরদার করতে হবে, যেন আমদানির আড়ালে মুদ্রা পাচার না হয়। শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে সতর্কতা অবলম্বের পরামর্শ খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের নেতিবাচক প্রভাব যেন দেশের অর্থনীতিতে না পড়ে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাধারণত সংরক্ষণ করা হয় প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা আমদানির বিপরীতে ব্যয় মেটানোর জন্য। এক সময়ে তিন-চার মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকলেই সন্তুষ্ট থাকা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এখন সাত-আট মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে মোটামুটি স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ নীতি মেনে আসতে পারলেও গত কয়েক মাসে রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য থেকে শিল্পের কাঁচামাল—প্রতিটি পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। ফলে একই পরিমাণ আমদানি করতে বাংলাদেশকে আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে ব্যয় করতে হচ্ছে। সে তুলনায় রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়েনি। ফলে বড় আকারের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর এ কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে। 

আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে জোর দেয়ার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে চাঙ্গা করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে এলসি খোলার বিষয়েও কঠোরতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। সেগুলো দেশের প্রয়োজন ও চাহিদার নিরিখে খোলা হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বলছে, আমদানি-রফতানির আড়ালে দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। বিষয়টি অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করতে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সসীম সম্পদ ও অসীম চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার বিজ্ঞানের নাম অর্থনীতি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারকদের চ্যালেঞ্জটা এখানেই। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ আসছে কম, ফলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। ডলারের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে দুটি প্রক্রিয়ায়—এক. জোগান বাড়িয়ে আর দুই. চাহিদার হ্রাস টেনে। এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে দুটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক. অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে হবে। দুই. রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। আমদানি কমাতে গিয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং কৃষি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, শিল্পের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য আমদানিতেই বেশি ব্যয় হচ্ছে। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণভাবে আমদানীকৃত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে ঘোষিত আমদানি পণ্য আসছে কিনা, সেটি তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অনেকে অর্থ পাচারের কথাও বলছে, যা আমলে নিতে হবে। আর বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আরো প্রণোদনা প্রদান এবং রফতানিকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। মেগা প্রকল্প বা বিনিয়োগগুলো যেন সুশাসনের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে ও সাশ্রয়ীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। আর যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেগুলো থেকে যে আয় আসবে তার প্রাক্কলন এবং সেগুলোর ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলনের মধ্যে যেন সামঞ্জস্য থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, আমদানীকৃত পণ্যের মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের বৈদেশিক বিনিময় হার যেন স্থিতিশীল থাকে, আমদানি যেন সময়মতো করা হয়, একই সঙ্গে আমাদের পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকে নজর থাকে প্রভৃতি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আছে। তবে এখন অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব কর্মসূচি যেন সময়মতো, সাশ্রয়ী ও দুর্নীতিমুক্তভাবে শেষ হয়, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করার জন্য ঋণপত্র খোলার সময় ব্যবসায়ীদের আমদানি বাবদ খরচের ৭৫ শতাংশ টাকা অগ্রিম জমা দিতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে। বিলাসবহুল দ্রব্য হচ্ছে মোটর কার, ওয়াশিং মেশিন বা এয়ার কন্ডিশনারের মতো পণ্য। যেসব পণ্য অত্যাবশ্যক নয়, সেক্ষেত্রে অগ্রিম জমা দিতে হবে ৫০ শতাংশ অর্থ। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, আমদানি কমে যাবে। কিন্তু এ পদক্ষেপ আমদানি কমাতে কতটুকু ভূমিকা রাখবে সেটি নিয়ে কিছুটা সন্দেহের অবকাশ রয়ে যায়। বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে এত বেশি অগ্রিম অর্থ জমা দিয়ে বিদেশ থেকে পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ীরা ঠিকই পণ্য আমদানি করবে এবং উচ্চবিত্তরা সেসব পণ্য কিনবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাজার থেকে বিদায় নেবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ওইসব পণ্যের দাম নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করবে বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে, সুনির্দিষ্ট কিছু বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি আগামী কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রাখা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে এবং প্রকল্পটি এখনই বাস্তবায়ন জরুরি নয়, সেসব প্রকল্প ছয় মাস বা আরো পরে বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়া জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের অনুমোদন না দিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এটি কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে যেসব খাদ্যপণ্য দেশে উৎপাদন করা সম্ভব যেমন চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল ইত্যাদিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের মতো কৃষিভিত্তিক দেশে ব্যাপক পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানি কাম্য নয়।

বিদ্যমান অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে চাহিদা ও জোগান প্রক্রিয়ায় সমন্বয় নীতি গ্রহণের পাশাপাশি মানুষকে অযথা ডলার ধরে রাখা থেকে বিরত রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলো যে কেউ চাইলে ডলার দিয়ে দেয়। তারা প্রয়োজন দেখতে চায় না। এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়াতে হবে। চাল, গম, সয়াবিন তেল, জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতেই হবে। এসব অপরিহার্য আমদানি পণ্যের জন্য যে পরিমাণ ডলার প্রয়োজন, সেটা দেশের রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় থেকে পাওয়া সম্ভব। এর বাইরে যদি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধ করা যায় তাহলে সংকট স্পর্শ করবে না। এজন্যই সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক অযাচিত বিদেশ সফর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিদেশে শপিং করার জন্য, অবকাশ যাপনের জন্য, ছোটখাটো চিকিৎসার জন্য যাওয়া বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্বস্তিকর পর্যায়ে ধরে রাখাটাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে চাহিদার সঙ্গে ডলার সরবরাহের সমন্বয় করা যেতে পারে। আর ব্যাংকিং চ্যানেল ও কার্ব মার্কেটের মধ্যে ডলারের দাম ৩ থেকে ৪ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। যখনই এর চেয়ে বেশি বেড়ে যাবে তখনই সুযোগসন্ধানীরা ডলার ধরে রাখতে শুরু করে। এটা যাতে করতে না পারে সেজন্য নজরদারি দরকার। এক্ষেত্রে কেউ কারসাজি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে হবে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা বিনিময় হার, রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ—এ চারটি বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং যথা সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলোকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যাতে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। খাদ্য ঘাটতি এখন বৈশ্বিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এজন্য এখন যত উৎস থেকে খাদ্য ও জ্বালানিপণ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেসব উৎস থেকে বেশি পরিমাণে আমদানি করে মজুদ করতে হবে। আশার কথা, সরকার বৈদেশিক মুদ্রাকেন্দ্রিক সংকট এড়াতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বটে, তবে সেগুলো পর্যাপ্ত কিনা তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে আমদানিতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা বা মুদ্রাবাজারে কোনো কারসাজি চলছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। আবার এমন কঠোর পদক্ষেপও নেয়া যাবে না যাতে বাণিজ্যপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নইলে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার শঙ্কাও রয়েছে। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।