শিল্প-কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা পেতে সরকারকে এনার্জি রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সোমবার ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত পাওয়ার, এনার্জি, ইউটিলিটিজ-বিষয়ক এফবিসিসিআইয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার একটি বড় কারণ শিল্প ক্ষেত্রে গ্যাসের অভাব। বছরের পর বছর ধরে শিল্প খাতে বিরাজ করছে গ্যাস সংকট। কোনো উদ্যোক্তা যদি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে গ্যাসের অভাবে তা চালাতে না পারেন তাহলে তিনি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, এটাই স্বাভাবিক। শিল্পোদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপনের সময় গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কিনা, কোথায় স্থাপন করলে জ্বালানিপ্রাপ্তি সহজলভ্য হবে, ভবিষ্যতে দাম কেমন হবে—এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এ বাস্তবতায় কে চাইবে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে? বাস্তবে হয়েছেও তা-ই। অনেক উদ্যোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের পর বছরের পর বছর গ্যাস না পাওয়ায় তা চালু করতে পারছেন না। তাদের সুদসহ ব্যাংকঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হচ্ছেন কারখানা বন্ধ করে দিতে। এসব দেখে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে দেশে সেভাবে শিল্পায়ন ঘটছে না। তৈরি হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। এখন এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানা গ্যাসচালিত। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ায় গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। ফলে বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক শিল্প-কারখানাগুলো ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাবে কিনা, তা নিয়ে শিল্প মালিকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। সরকার বলছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি সংকট কেটে যাবে। কিন্তু সরকারের আশ্বাসে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না অনেকেই। বর্তমান অবস্থায় জ্বালানি সংকট নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে। স্বল্পমেয়াদে সরকারকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু বেশি দামের এ জ্বালানির ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর করলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না। বিশ্ববাজারে তেল, এলএনজি ও কয়লার দামের বর্তমান নিম্ন অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং শিল্পজাত দ্রব্য ও বিদ্যুতের দাম বাড়বে। ফলে ঘটবে মূল্যস্ফীতি। এ অবস্থায় দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। স্থলভাগে এ কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দেশের সমুদ্রসীমায়ও অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে, অথচ বাংলাদেশ এখনো জরিপ কাজও শুরু করতে পারেনি। দেশের উত্তরাঞ্চলে বড় আকারের কয়লার মজুদ থাকা সত্ত্বেও তা উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকায় গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এ কয়লা ব্যবহার করাও সম্ভব হচ্ছে না। আশার কথা, গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। তবে এক্ষেত্রে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। গ্যাস ও কয়লা সমস্যার সমাধান হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরো গতি আসবে সন্দেহ নেই। দেশের অর্থনীতিকে তখন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নেয়া সহজ হবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানি নির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পার হলেও আমাদের দেশে এটি করা হয়নি। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

অস্বীকারের উপায় নেই, গ্যাস সেক্টর ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আমদানিতে বেশি মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। এখনই পথ পরিবর্তন করা জরুরি, নইলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। এখন বিশেষ ঝটিকা কর্মসূচি পরিচালনা করা দরকার। দেশের শিল্প ও অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে হলে এ মুহূর্তে আমদানির বিকল্প নেই। দ্রুত পণ্যটির বাজার স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সরবরাহ সংকটে স্পট ও ফিউচার মার্কেটে এর দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত। গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সফলতার হার উচ্চ হলেও এখন তিমিরেই রয়ে গেছে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় বছরে চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের কথা বলা হলেও কোনো সরকারই তা মেনে চলেনি। বলাবাহুল্য, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে বলে সামনে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে। তাই এলএনজি কেনার ক্ষেত্রেও সরকারের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। সম্প্রতি সাগরের গভীরে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস হাইড্রেট পাওয়ার খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু প্রযুক্তিজনিত কারণে ওই গ্যাস আমাদের এখনই উপকারে আসবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। তবে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না করলে অদূরভবিষ্যতে দেশ গ্যাস সংকটে পড়তে পারে।

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার অন্যতম সবার জন্য টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। কিন্তু সমস্যা হলো এসডিজির অন্যতম শর্ত সবার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সহজলভ্য করে তোলা, সেদিক থেকে ততটা ভালো অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উপাদান—জ্বালানি সহজলভ্যতা, জ্বালানির সমর্থতা, জ্বালানির উপযোগিতা ও জ্বালানির নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। বাংলাদেশ এর কোনোটিই সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি। জার্মানির মতো উন্নত দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানোর ঘোষণা দিয়েছে। এখন ইউরোপ থেকে শুরু করে চীন পর্যন্ত বেশির ভাগ উন্নত দেশই প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও ঢেলে সাজাতে হবে। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শিল্প মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। উপরন্তু, গ্যাস সংকটে উৎপাদনে প্রভাব পড়লে অনেকের জন্য টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টি আমলে নিয়ে বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার প্রত্যাশা করছে সবাই।