করোনা মহামারীর কারণে পোশাক রফতানিসহ দেশের অর্থনৈতিক প্রতিটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত জনশক্তি রফতানিও সংকুচিত হয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, অনেক দেশ থেকে প্রবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। অনেকে ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েন। তাদের ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। সম্প্রতি দেশের মহামারী পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। মৃত্যু ও শনাক্তের পরিমাণ কমে এসেছে। ধীরে ধীরে কভিডের অভিঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের শ্রম ও অভিবাসন খাত। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতে হতাশাজনক খবর হলো সীমিত অবকাঠামো, উড়োজাহাজ ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানা জটিলতায় বিদেশগামীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। ফলে সৃষ্ট সুযোগ কতটা সদ্ব্যবহার করা যাবে, সেটি নিয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অভিবাসনের ক্ষেত্রে সব ধরনের ভোগান্তি ও বিড়ম্বনা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলেই প্রত্যাশা।
দীর্ঘদিন পর আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠছে আমাদের বৈদেশিক জনশক্তি খাত। বিভিন্ন দেশে যাওয়া শুরু করেছেন বাংলাদেশী শ্রমিক। তথ্য বলছে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়েছে সোয়া চার লাখেরও বেশি। এর মধ্যে সম্প্রতি খুলেছে আরেক বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবও এখন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রমিক নিচ্ছে শুধু বাংলাদেশ থেকেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও (ইউএই) বাংলাদেশীদের ভিসা পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। সেখানেও যাচ্ছেন অনেকেই। কিন্তু কিছু কারণে প্রবাসে গমনেচ্ছু শ্রমিকদের ভোগান্তি বাড়ছে। বাড়তি চাহিদার অজুহাত দেখিয়ে এয়ারলাইনসগুলো ভাড়া বাড়িয়েছে অস্বাভাবিক হারে। এর মধ্যে রয়েছে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির প্রলোভন এবং নিয়ন্ত্রণহীন দালাল চক্রের প্রতারণা। ফলে অতিমাত্রায় বাড়ছে বিদেশগামী কর্মীর অভিবাসন ব্যয়। অন্যদিকে বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর দুর্বলতাও বিদেশগামী কর্মীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংস্কারকাজের জন্য প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা সব ফ্লাইট বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতে ফ্লাইট শিডিউল কার্যক্রম ঠিক রাখা যাচ্ছে না। আবার করোনার পরীক্ষাও বাড়তি বিপত্তি তৈরি করেছে। করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কার্যক্রম। এতে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর। বিমানবন্দরটিতে যাত্রী চাপ বাড়লেও রাতে কার্যক্রম না চলায় ফ্লাইট বাড়াতে পারছে না এয়ারলাইনসগুলো। সব মিলিয়ে নানা দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিদেশগামী কর্মীরা।
কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি দেশের বিমানবন্দরেই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তবে সবখানেই যাত্রী পরিবহন ও এয়ার কার্গোর ক্ষেত্রে যেন তেমন কোনো ঝামেলা ও ভোগান্তি সৃষ্টি না হয় সে চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। সিঙ্গাপুর, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, এমনকি ভারতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো দক্ষতা ও সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্বিঘ্নে আকাশ যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। যতটা সম্ভব ঝামেলাহীনভাবে প্রয়োজনীয় সেবা জুগিয়ে চলছে। ফলে অভ্যন্তর ও বিদেশমুখী যাত্রীরা নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছে। ওইসব দেশের বিমানবন্দরগুলোর ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
বলা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে বিমানের টিকিটের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। বাড়ছে ভোগান্তি। এ প্রেক্ষাপটে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি অব বাংলাদেশ (অ্যাটাব) বিমান ভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ও একই অনুরোধ জানিয়েছে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে। এটা আমলে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিদেশগামীরা সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন করোনা নেগেটিভ সনদ সংগ্রহে। নানামুখী শর্তের কারণে যথাসময়ে সনদ সংগ্রহ করতে পারছেন না কর্মীরা। বিশেষত বিপুলসংখ্যক কর্মীর বিপরীতে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব ও নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পরীক্ষা করানোয় বিদেশ গমনেচ্ছুদের ভোগান্তি বাড়ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কভিড পরীক্ষা চালু করা হলেও প্রয়োজনানুসারে সেবা দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। আবার চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে কভিড পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সেখানকার যাত্রীরা ঢাকা বিমানবন্দরে ভিড় করায় ভোগান্তি আরো বাড়ছে। সম্প্রতি খবর মিলছে সেখানেও বিদেশগামী যাত্রীদের কভিড পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে তার জন্য চারটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। দ্রুত সেখানে কভিড পরীক্ষা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে চাপ কিছুটা কমবে। কাজেই এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আরো সক্রিয়তা কাম্য।
গতানুগতিক শ্রমবাজারের পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার হিসেবে কম্বোডিয়া, উজবেকিস্তান, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়াসহ আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশ এবং জাপান, সেনেগাল, বুরুন্ডি, সেশেলসে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। আরো কিছু দেশও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে বাড়ছে বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা। অথচ এক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি প্রবল। এটা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। চলমান সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলোয় কয়েক গুণ বেশি কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে জনশক্তি রফতানিতে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উড়োজাহাজ ভাড়া কমিয়ে আনা, করোনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, টিকা কার্যক্রম আরো জোরদার করাসহ বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দ্রুত নিরসনে কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা কাম্য।










