(গতকালের
পর)
সাধারণ
করদাতার অভিযোগ
জানানোর জন্য,
এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে
কর ন্যায্যতা
প্রতিষ্ঠায় অনেক
কিছু করার
জন্য যে
প্রতিষ্ঠান গড়া
হয়েছিল, থাকা
উচিত ছিল,
সেটি হলো
ট্যাক্স ওমবুডজম্যান
অফিস। ১৬৬টি
দেশে আছেও।
২০০৫ সালে
এ অফিস
যে উদ্দেশ্য
সামনে নিয়ে
গঠিত হয়েছিল,
তা অর্জনের
সুযোগ না
দিয়ে ২০১১
সালে এসে
পুরো অফিসটাই
বিলোপ করা
হয়। ২০০৫
সালে কর
ন্যায়পাল অফিস
গঠনের সময়
বলা হয়েছিল,
এখানে মানুষ
করসংক্রান্ত হয়রানি
ও বিরোধের
বিচার পাবে।
মাত্র ছয়
বছরের মাথায়
২০১১ সালে
বলা হলো,
‘করদাতার
সঙ্গে ভালো
আচরণ করলে,
সেবা দিলে,
ন্যায়বিচার করলে,
কর দেয়ার
পদ্ধতি সহজ
করলে এ
অফিস লাগবে
কেন।’ আরো
বলা হলো,
‘কর
আইন, শুল্ক
ও ভ্যাট
আইনের মধ্যে
কর ন্যায়পালের
প্রভিশন নেই,
তাই সেটিকে
বিলোপ করতে
হবে।’ ন্যায়পাল
অফিস কর
আইনের সঙ্গে
সংযুক্ত না
হলে আইন
সংশোধন করে
সংযুক্ত করে
নিতে হবে।
করদাতাদের আস্থায়
আনতেই তো
আইন করে
কর ন্যায়পাল
অফিস প্রতিষ্ঠিত
হয়েছিল।
মোদ্দাকথা হলো,
কর ইনসাফ
প্রতিষ্ঠা না
করলে করজাল
বৃদ্ধি তথা
কর আহরণে
উন্নতি আসবে
না। কর-জিডিপি
অনুপাতে বাংলাদেশ
যে তলানিতে,
তার কারণটা
নানাভাবে এ
সমাজে কর
এড়িয়ে যাওয়ার
সুযোগ দেয়া
হয়েছে। মানে
কাউকে ট্যাক্স
দিতে বাধ্য
করা হচ্ছে
না বলে
এমনটি হচ্ছে।
দুর্নীতিজাত অর্থ
অর্থনীতির মূলধারায়
আনার উদ্যোগ
ইতিবাচক হবে
না বিশেষ
হ্রাসকৃত হারে
কর দিয়ে
এবং উপার্জিত
অর্থের উৎস
নিয়ে প্রশ্ন
না ওঠালে।
দুর্নীতি দূর
তথা সম্পদ
বণ্টনের বৈষম্য
দূর করা
কঠিন হবে।
এতে বরং
বৈষম্য উসকে
দেয়া হবে,
যদি টাকা
কীভাবে উপার্জিত
হচ্ছে তা
নিয়ে কোনো
ব্যাখ্যা বা
প্রশ্নের মাধ্যমে
বাধা না
দেয়া হয়
তাহলে তা
হবে স্বচ্ছতা
ও জবাবদিহিতাকে
নিরুৎসাহিত করার
শামিল। দেখা
যাচ্ছে ২০১০
সালের পর
থেকে দেশ
ও সমাজে
সম্পদের একটা
বিরাট বৈষম্য
সৃষ্টি হয়েছে।
জিডিপির সংখ্যাভিত্তিক
পরিমাণ বেড়েছে
এবং সেভাবে
পারক্যাপিটা জিডিপিও
বেড়েছে বলে
দেখানো হচ্ছে
কিন্তু বাস্তবতায়
‘গরুর
হিসাব শুধু
কাজীর খাতায়,
গোয়ালে তেমন গরু
নেই’ পরিস্থিতি।
২০১৭ সালের
রিপোর্ট অনুযায়ী
এশিয়ার মধ্যে
বাংলাদেশে খুব
দ্রুত ধনীর
সংখ্যা বাড়ছে।
কর সংস্কৃতির
বিকাশ প্রত্যাশা
করে ২০০৮
সালেই প্রথম
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ
পদক্ষেপ নেয়া
হয়—(১)
১৫ সেপ্টেম্বরকে
জাতীয় আয়কর
দিবস ঘোষণা,
(২) কর
মেলার আয়োজন
এবং (৩)
সেরা করদাতার
সম্মাননা প্রবর্তন।
অর্থবছর শেষ
হওয়ার তিন
মাসের মধ্যে
ব্যক্তি আয়কর
পরিশোধের বিধান
ছিল বলে
১ সেপ্টেম্বর
জাতীয় আয়কর
দিবস ঘোষণার
সব আনুষ্ঠানিকতা
সম্পন্ন করার
কালে জানা
গেল তদানীন্তন
মাননীয় প্রধান
উপদেষ্টা ১৫
সেপ্টেম্বরের আগে
উদ্বোধন করতে
পারবেন না।
তাই ১৫
সেপ্টেম্বর জাতীয়
আয়কর দিবস
হলো। পরবর্তীকালে
৩০ নভেম্বর
জাতীয় আয়কর
ঘোষণা করে
কর আহরণের
সময়ানুবর্তিতা ও
কার্যকারিতাকে দুর্বল
ও দীর্ঘসূত্রতার
দখলে দেয়া
হয়েছে।
২০০৮ সালে
আয়কর মেলা
আয়োজনটি ছিল
নিঃসন্দেহে জাতীয়
রাজস্ব বোর্ডের
একটি ইতিবাচক
পদক্ষেপ। করদাতাকে
আগ্রহী করে
তোলা, কর
এড়িয়ে যাওয়ার
প্রবণতা প্রশমন,
আইনগত ও
পদ্ধতিগত জটিলতা
সহজীকরণে কর
মেলা আয়োজনের
মাধ্যমে যদি
করদাতাদের সহজে
জানানোর ব্যবস্থা
করা হয়
তাহলে মানুষের
মধ্যে কর
প্রদানের সচেতনতা
যেমন বৃদ্ধি
পায়, তেমনি
তারা কর
দেয়ার ক্ষেত্রে
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে
পারে। এতে
করদাতা ও
কর আহরণকারীর
মধ্যকার দূরত্বও
কমে আসবে।
২০০৮ সালে
যে মৌলিক
বিষয়গুলোর দিকে
লক্ষ রেখে
কর মেলা
আয়োজনের উদ্যোগ
নেয়া হয়,
তা ছিল
দূরবর্তী অঞ্চলের
করদাতা, যারা
কর অফিসে
আসতে পারেন
না বা
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন
না, তাদের
কথা বিবেচনা
করে; দূরবর্তী
অঞ্চলে অর্থাৎ
উপজেলা পর্যায়ে
যে করদাতা
রয়েছেন, তাদের
জন্য একটি
নির্দিষ্ট তারিখ
ঠিক করার
মাধ্যমে কর
অফিসের কর্মকর্তারা
সেখানে উপস্থিত
হয়ে কর
সম্পর্কে তাদের
বিভিন্ন তথ্য
জানাবেন। উদ্দেশ্য,
তারা যেন
উৎসবমুখর পরিবেশে
স্বাচ্ছন্দ্যে কর
দিতে পারেন।
লক্ষণীয় করমেলা
করা হয়
বিভিন্ন ব্যক্তিশ্রেণীর
করদাতার (যারা
মোট করদাতার
মাত্র ৩০
শতাংশ) জন্য,
এখানে করপোরেট
ও কোম্পানির
কর দেয়ার
ব্যবস্থা নেই।
অভিযোগ উঠেছে
কর মেলায়
কর প্রদানের
পরও পরবর্তী
সময়ে করদাতাকে
আবার কর
অফিসে ডেকে
পাঠানো হয়েছে।
তাকে নতুন
করে আসতে
বলা হচ্ছে।
কর মেলায়
বেশি ভিড়
হওয়ার নেপথ্যে
কিন্তু এটাও
একটা কারণ
যে কর
প্রদানে আগ্রহীরা
কর অফিসে
গিয়ে কর
দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ
করেন না।
এটা থেকেও
শিক্ষা নেয়ার
রয়েছে। প্রত্যেক
কর অঞ্চলে
তথ্য ও
সেবা কেন্দ্র
খোলা আছে।
কর দেয়ার
পদ্ধতি সহনশীল
ও টেকসই
করতে হলে
ঘোষিত নীতি
পদ্ধতির মধ্যে
কনসিস্ট্যান্সি রাখতে
তা ঘন
ঘন পরিবর্তন
করা ঠিক
নয়। কর
প্রদানের ক্ষেত্রে
প্রতি বছরই
নতুন নতুন
পরিবর্তন আনা
হলে বাস্তবায়নে
জটিলতা বাড়ে।
একটা আর্থিক
আইন জারি
করলে সর্বনিম্ন
চার থেকে
পাঁচ বছর
তা বহাল
থাকা উচিত।
তাহলে সবাই
আইনটি সম্পর্কে
অবগত থাকবে।
প্রতি বছর
যদি বিধিবিধানের
পরিবর্তন করা
হয় তাহলে
অনুসরণে সমস্যা
হয়।
আরেকটি জটিল
বিষয় হচ্ছে
জুনে যে
বাজেট পেশ
হয়, তার
সঙ্গে একটি
অর্থ আইন
দেয়া হয়।
অর্থ আইনটি
পাস হওয়ার
সঙ্গে সঙ্গেই
এটির প্রয়োগ
শুরু হয়।
ধরা যাক,
করহার পরিবর্তন
হলো। ফলে
করদাতা যখন
আগের অর্থবছরের
রিটার্ন জমা
দিচ্ছেন তখন
নতুন হারে
তা দিতে
হচ্ছে। এ
রকম বাড়তি
হারের বিষয়টি
তিনি আগে
অবগত ছিলেন
না। বিনিয়োগ
সিদ্ধান্তকালে এ
ব্যাপারে তার
প্রস্তুতি ছিল
না। এটি
কর প্রয়োগ,
প্রক্রিয়া ও
হিসাবায়নের ক্ষেত্রে
জটিলতার অন্যতম
একটি কারণ।
করদাতাকে একসঙ্গে
প্রশিক্ষিত, উৎসাহিত
ও বারবার
অবগত করা
যায় না।
আয়কর পরিপত্র-১
জারিতে বিলম্ব
করেও তাতে
কিছু বিষয়ে
অস্পষ্টতা নিরসনে
ব্যাখ্যার অবকাশ
থেকে যায়।
সরকারকে রাজস্বের
ইনফ্লেটেড ফিগার
দেখানোর সমস্যা
হলো, উল্লিখিত
আয়ের অংককে
ধরে অন্য
খাতে ব্যয়ের
কর্মসূচি ঠিক
করা হয়,
তাই জোর
দেয়া উচিত
প্রকৃত ও
নেট ফিগারের
দিকে। ভুল
ফিগারকে সঠিক
ধরে ব্যয়ের
বিভিন্ন পদক্ষেপ
নেয়া হলে
সামষ্টিক অর্থনৈতিক
ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা
তৈরি হতে
বাধ্য। এক্ষেত্রে
কর আহরণের
প্রকৃতি এবং
বাজেট প্রণয়ন
ও ব্যবস্থাপনায়
সংস্কার আনা
প্রয়োজন। বাজেটপূর্ব
আলোচনায় সবাই
এমন এক
সময় নিজেদের
দাবি ও
সুপারিশ উত্থাপন
করেন, তখন
বাজেট প্রস্তাব
সংশোধনের কোনো
সুযোগ থাকে
না। এক্ষেত্রে
আলোচনা ও
দাবিদাওয়া পেশ
করার সময়ও
পাওয়া যায়
না ঠিকমতো।
ফলে যে
দাবি ও
সুপারিশ আসছে,
তার বিবেচনায়
কোনো ভিত্তি
হয়ে ওঠে
না; ফলে
দাবি ও
সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন
বা পূরণ
করা সম্ভব
হয় না
ঠিকমতো।
দক্ষ লোকবল
নিয়ে রাজস্ব
বিভাগ পরিচালিত
হওয়ার প্রয়োজন
রয়েছে। বাংলাদেশে
এনবিআরে তুলনামূলকভাবে
দক্ষ ও
অভিজ্ঞ লোকবলের
অভাব স্পষ্ট।
বিশেষ করে
আশির দশকে
রাজস্ব বোর্ডের
গুরুত্ব তেমন
ছিল না।
আর রাজস্ব
অবকাঠামো তখন
যে ক্ষুদ্র
পরিসরে ছিল,
তা স্থির
ছিল বহু
বছর। ২০০৮
সালের দিকে
রাজস্ব বোর্ডের
লোকবল ও
অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের
জন্য প্রস্তাব
রাখা হয়।
লোকবল ও
কাঠামো প্রায়
দ্বিগুণ-তিন
গুণ বৃদ্ধি
করার যে
প্রস্তাব তখন
রাখা হয়েছিল,
তার বাস্তবায়ন
শুরু হয়
২০১৩ সালের
দিকে। সেখানে
দক্ষ ও
উপযুক্ত লোকবল
নিয়োগ দিতে
একটু সময়
লেগে যাচ্ছে,
যারা সেখানে
নিয়োগ পাবেন,
উপযুক্ত প্রশিক্ষণ
না পেয়ে
তারা এ
কাজ কতটুকু
করতে পারবেন,
সেটা নিয়েও
প্রশ্ন থেকে
যায়। বিশেষ
করে রাজস্ব
বিভাগে যারা
কাজ করবেন,
তাদের মেধা
ও দক্ষতা
আর দশটা
দপ্তর বা
বিভাগের চেয়ে
বিশ্লেষণ ক্ষমতায়,
পারঙ্গমতায় অবশ্যই
বেশি হওয়া
আবশ্যক। আশির
দশকে বিশেষ
বিবেচনায় একটি
বিশেষ পর্যায়ের
কিছু কর্মচারী
এ বিভাগে
আত্তীকৃত হন।
দুই দশক
তাদের সঠিকতা
নির্ণয় ও
আত্তীকরণ যৌক্তিকতা
প্রমাণ উপলক্ষে
রজ্জুকৃত প্রায়
আট ডজন
মামলার ফেরে
পড়ে রাজস্ব
বিভাগে প্রারম্ভিক
পর্যায়ে কর্মকুশল
কর্মকর্তা সরাসরি
নিয়োগ বন্ধ
ছিল। ফলে
উপযুক্ত ও
দক্ষ লোকবলের
অভাবে ন্যায্য
রাজস্ব আহরণ
শেষ পর্যন্ত
কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে
উন্নীত করতে
ধকল সইতে
হচ্ছে।
যৌথ ও
সমন্বিত দেখভালের
দর্শন বাস্তবায়নুগ
পাওয়া যায়
না আন্তঃসমন্বয়
সমস্যার কারণে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
সংস্কারযোগ্য বিষয়
হলো নীতি
প্রণয়নকারী ও
বাস্তবায়নকারী, কার্যসম্পাদনকারী
ও তার
প্রতিকার প্রার্থনা
(appeal) শ্রবণকারী
একই কর্তৃপক্ষ/কর্মকর্তা
হওয়া। বাস্তবায়নকারী
নীতি প্রণয়ন
কিংবা নীতি
প্রণয়নকারী বাস্তবায়নের
দায়িত্বে থাকলে
নীতি প্রণয়ন
ও বাস্তবায়ন
উভয়ই সুবিবেচনাপ্রাপ্ত
হয় না।
একইভাবে বাস্তবায়নকারীর
দ্বারা সৃষ্ট
অনিয়মের পরীক্ষা
পর্যালোচনা বা
আপিল শ্রবণের
দায়িত্ব তার
কাছে থাকলে
সুবিচার নিশ্চিত
হয় না।
রাজস্ব আহরণ
কার্যক্রমে ও
পদ্ধতি প্রক্রিয়ায়
আইনসংগত স্বচ্ছতার
আলোকে গতিশীলকরণের
স্বার্থে ভিন্ন
প্রেক্ষাপটে আইন
ও প্রক্রিয়ার
যৌক্তিকতা যথা
বিশ্লেষণ হওয়া
উচিত। বিশেষ
করে কর
আহরণ প্রক্রিয়ার
যেসব আইনি
জটিলতা, সেটা
ঠিকমতো সংস্কারের
মাধ্যমে স্পষ্ট
করা না
গেলে সমস্যা
থেকেই যাবে।
অন্তত এ
অবস্থায় রেখে
ব্যাপক কর
আদায়ের যে
কথা চিন্তা
করা হয়,
তা অর্জন
স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্ভব
হয় না।
এক্ষেত্রে আইনের
আর্থ-প্রশাসনিক
প্রয়োগের ক্ষেত্রে
যদি আরো
কিছু অসম্পূর্ণতা
ও ফাঁকফোকর
থেকে থাকে,
তা সংশোধন
করা না
গেলে লক্ষ্যমাত্রা
অর্জনে এনবিআর
কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব
দেয়া কঠিন
হয়ে যাওয়াটাই
স্বাভাবিক। (শেষ)
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান










