সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইন পাস হলেও তার বাস্তবায়ন নেই। কীভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা যায়, এ সম্পর্কে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন
চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া প্রয়োজন
সড়কে মৃত্যুর জন্য অনেক বিষয় দায়ী থাকতে পারে। কিন্তু চালকদের দক্ষভাবে পরিবহন চালনার জন্য ন্যূনতম যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তার অধিকাংশই বাংলাদেশের পরিবহন ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এক্ষেত্রে বিশ্রামাগারের কথা বলা যায়। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটি সহজেই বোধগম্য যে চালকদের পর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার সংযোগ রয়েছে। তাই চালকদের দিনে ও রাতে পরিবহন চালনার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ বাসস্ট্যান্ডেই ঘুমানোর জায়গা নেই। নেই কোনো বিশ্রামাগার। ফলে চালকরা না ঘুমিয়েই দুটো ট্রিপে গাড়ি চালাতে বাধ্য হন কিংবা অপর্যাপ্ত ঘুম নিয়ে গাড়ি চালান। তাছাড়া সুষম খাদ্য ও অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা চালিয়ে নেয়ার বিষয়টিতেও কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। দেশের সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য এসব দিকে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। গবেষণালব্ধ উপলব্ধিকে নীতি প্রণয়নে কাজে লাগানো প্রয়োজন। অন্যথায় কেবল শাস্তি নিশ্চিত করে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব হবে না।
ইসতিয়াক নূর মুহিত: শিক্ষার্থী
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সড়ক দুর্ঘটনার কাঠামোগত ত্রুটিগুলো দূর হোক
বাসা থেকে বের হতে হয় প্রাণের শঙ্কা নিয়ে। চারদিকে এত পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা দেখে যাত্রাস্থল থেকে বের হওয়ার সময় মনে হয় ফেরা না-ফেরার সম্ভাবনা অর্ধশত ভাগ। ইউনিভার্সিটি, স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে রওনা দিয়ে না ফেরার পথে পাড়ি জমাতে হচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে হাজারো কোমল প্রাণের। হারাতে হচ্ছে পরিবারের একমাত্র সন্তানদেরও। বলা হয়, একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই থাকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। অনেকে আবার হয়ে যায় পঙ্গু। ফলে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কেঁদেও মুক্তি মেলে না করুণ বাস্তবতা থেকে। নিত্যনৈমিত্তিক রূপ নেয়া এ সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো হলো লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, ওভারটেকিং মনোভাব, ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য ধারণ করা, আইন প্রয়োগে প্রশাসন ও বিআরটিসির অবহেলা, ট্রাফিক আইন মেনে না চলা এবং অসতর্কতা। এছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটিসম্পন্ন গাড়িও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। লাইসেন্স প্রদানে দুর্নীতিও এসব দুর্ঘটনার কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। গাড়ির মালিক সচেতন হলে চালকরা সচেতন হতে বাধ্য। তবে যতদিন না দুর্নীতি দেশ থেকে দূর হচ্ছে ততদিন সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না। অবৈধ চালকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গেলে তদবির আসে অবৈধ ক্ষমতার। স্বার্থান্বেষী, অন্ধ, মানুষ আকৃতির নৈতিকতা বিবর্জিত মালিকরা একবারও চিন্তা করেন না মানুষের কথা। এছাড়া ভাঙা রাস্তা, প্রয়োজনীয় ফুটপাত না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টি দিতে হবে প্রথমত রাস্তার দিকে, তারপর চালকের বৈধতার ওপর। তাহলে হয়তো সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
দিলরুবা ইসলাম জিন্নাত: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ
শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়
শৃঙ্খলা ফিরুক সড়কে
যদি বলা হয়, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না কেন? তবে বলতে হবে, আমাদের সদিচ্ছাটা খুব করে দরকার। হতে পারে সেটা পথচারীদের, হতে পারে সেটা যাত্রীবাহী বা পণ্যবাহী যানবাহনের কিংবা হতে পারে দুই চাকা বা তিন চাকার বাহনের। কিন্তু আইন মেনে রাস্তায় চলাটা দরকার; নিজেদের প্রয়োজনেই দরকার। শিক্ষার্থীদের সড়ক আন্দোলনের কারণে নীতিমালা তৈরি হলেও বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ তেমন একটা হয় না! আমাদের বিবেক কবে থেকে কাজ করা শুরু করবে? একটা সিস্টেম নিয়মের মধ্যে আনতে এত সময় লাগে! ঈদে বাসায় যেতে হবে বলে হুট করে এত বিপুল চাপ পড়ে যাবে রাস্তায়, সেটা কি আমাদের ভোগান্তিতে ফেলবে না? যদি হুটহাট যেখানে-সেখানে বাস না থামানো হয়, যদি যাত্রীবাহী বাস আর পণ্যবাহী ট্রাকের আলাদা লেনে চলাচলের ব্যবস্থা করা যেত কিংবা ঈদের আগে ও পরের তিন-চারদিন ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখা যায় হয়তো অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটবে। জ্যামের কারণে যদি জনগণের নাভিশ্বাস উঠে যায়, ঈদ তবে নিজ নিজ কর্মস্থলে উদযাপন করাই শ্রেয়। প্রকল্পগুলোর এত দীর্ঘসূত্রতা বোধহয় না হলেও পারত! মনে রাখতে হবে প্রকল্পের মেয়াদ যতই বাড়ানো হবে, জনগণের ভোগান্তি ততই বাড়বে!
মো. আরিফুজ্জামান নিশাত: শিক্ষার্থী
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
চাই আইনের কার্যকর প্রয়োগ
ভোরের আলোয় পৃথিবী আলোকিত হতে না হতেই শুরু হয় মানুষের কর্মব্যস্ততা। আর এ ব্যস্ততার মধ্যেই ঘটে যায় নানা ধরনের অঘটন। যার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। পত্রিকা হাতে নিলেই হেড লাইনে কোনো না কোনো মৃত্যুর কথা উল্লেখ থাকবেই। আরো থাকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের মর্মব্যথা। ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৬ হাজার ২৮৪ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৮০৩ জনই শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালে রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুজন শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দেয়ার পর ছাত্ররা দেশব্যাপী আন্দোলনে নামে। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে সরকার সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়ন ও গেজেট আকারে প্রকাশ করছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এ আইন ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। তাছাড়া সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০২১ সালের ১৩ মে। কিন্তু আইনটি পুরোপুরি এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না বলেই অকালে মা হারাচ্ছে সন্তান, স্ত্রী হচ্ছে স্বামীহারা আর সন্তান হচ্ছে পিতৃহারা। আমরা আশাবাদী আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
মাহমুদা টুম্পা: শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
দুর্ঘটনা রোধে ব্যক্তিগত সচেতনতাও জরুরি
‘আপনি সচেতন হলে বাঁচবে একটি প্রাণ’—কথাটি সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কথা শুনলে যেন মনে হয় মৃত্যুর মিছিল চলছে আর আমরা সবাই উঠে পড়ে লেগেছি সেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিতে। আমরা সড়ক, যানবাহন ব্যবহার করি নিজেদের জীবনকে আরো সহজ ও আরামদায়ক করতে। কিন্তু আমাদের অসাবধানতাই আমাদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। আহত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ, অনেকে বেঁচে থেকেও পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে পরিবারের একটি কোণে।
প্রতিদিন খবরের কাগজ ছেয়ে যায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মর্মান্তিক দুঃসংবাদে। এসব খবর আমাদের হূদয় সিক্ত করে তোলে। কিছু নিয়ম-কানুন আছে, যেগুলো মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকরী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যার অভাব রয়েছে বলেই এ মৃত্যুর মিছিল বিদ্যমান। আমরা দেশের নাগরিক, তাই দেশের সব আইনকানুন মেনে চলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর যেন কোনো পরিবারকে চাপা কান্না নিয়ে বসবাস করতে না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
ফারিয়া ইয়াসমিন: শিক্ষার্থী
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়










