গাজায় যখন বেড়ে চলছে নিহতের তালিকা, ঠিক তখনই বেনয়ামিন নেতানিয়াহু আমালেক জাতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন ইসরায়েলকে। যেন গাজার সংঘাতকে পৌরাণিক আকারেই পাঠ করতে চায় তার সরকার। বাইবেলীয় যুগে বনি ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া জাতি আমালেক। বুক অব ডিউটেরোনমিতে (অধ্যায় ২৫, আয়াত ১৯) নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমালেকদের চিহ্ন মুছে ফেলতে। ঈশ্বর আমালেকদের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যুদ্ধ করে যাবেন (এক্সোডাস ১৭:১৬)। আমালেক বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে, এ নিয়ে নানা মত রয়েছে। যেহেতু জিন সংরক্ষিত নেই, ফলে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখন আর ইহুদি ও আমালেক চিহ্নিত করা সম্ভব না। ফলে সে ধরনের হুকুম রহিত হয়ে গেছে বলে মনে করেন ইহুদি পণ্ডিতরা। কেউ অবশ্য মনে করেন, এ নির্দেশনা ভবিষ্যতে মোশিয়াহর জন্য প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বিষয়টিতে নয়া রঙ দিয়েছে জায়নবাদ। তাদের দাবি, ইহুদিদের যেকোনো শত্রুই আমালেক। আমালেক একটা মনস্তত্ত্ব এবং সে সূত্র থেকে হিটলারও আমালেক। যে ব্যক্তি ইসরায়েল রাষ্ট্র নিয়ে সন্দেহ ও বিরোধিতা করবে, সেও আমালেক। আর কেউ আমালেক হওয়ার মানে তাকে হত্যা করা ধর্মীয়ভাবে বৈধ। ২০০৪ সালে ইসরায়েলের ল্যান্ড অথরিটির প্রধান বেনজি লিবারম্যান প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, ফিলিস্তিনিরা বাইবেলে ঘোষিত সেই আমালেক। চলমান সংঘাতের মধ্যে আমালেক জাতির স্মরণের মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু প্রোপাগান্ডা ও বৈষম্যমূলক বোঝাপড়াকেই দীর্ঘ করলেন। এভাবে ইসরায়েল বনাম আমালেক হিসেবে দেখার মনোভাব ইসরায়েল রাষ্ট্রকে চিরস্থায়ী হিংসার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খুব বেশি নয়। যদিও জায়নিজমের উত্থানের আগেও ইহুদিরা মুসলিম খেলাফতের অধীনে ফিলিস্তিন অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। কিন্তু জায়নিজমের মধ্য দিয়ে হিব্রু বুদ্ধিবৃদ্ধিক চর্চায় অদ্ভুত প্রবণতা তৈরি হয়। এ প্রবণতার কিছু অংশ ইতিহাস হলেও বড় অংশই প্রোপাগান্ডামূলক। ঘটনাকে ভেতর থেকে পাঠ করার চেয়ে দেখা হয়েছে ইসরায়েল বনাম আমালেকের রণভূমি আকারে। ট্র্যাডিশনাল ঐতিহাসিকদের হিসেবে গল্পটাকে মোটা দাগে এভাবে বর্ণনা করা যায়—১৯৪৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গিয়ে তীব্র হয়ে ওঠে আরব-ইসরায়েল টানাপড়েন। সে সময় জাতিসংঘ ভূমধ্যসাগরের পূর্বপাশে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস করে। একটা ইহুদিদের এবং আরেকটা আরব ফিলিস্তিনিদের জন্য। ইহুদিরা কষ্ট স্বীকার করে হলেও জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু আরবরা এটা মেনে নেয়নি। এমনকি খোদ আরব লিগও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিয়ে নানা চক্রান্ত করতে থাকে ব্রিটেন। আর সদ্য জন্ম নেয়া শিশু রাষ্ট্র ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দিতে পাঁচটি আরব দেশ সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায়। শিশু রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রবল পরাক্রমের পরিচয় দিয়েছে এবং বিজয়ী হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেই লাখো ফিলিস্তিনি পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোয় চলে যায়। ইহুদিরা তাদের থাকার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছিল। চেষ্টা করেছে সহাবস্থানের। কিন্তু তারা তাদের আরব নেতাদের কথাই মান্য করে। যুদ্ধের পরও বারবার ইসরায়েল আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করতে চেয়েছে। কিন্তু আরবদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।
এ চিত্রের কিছুটা পরিবর্তন আসে আশির দশকে। হঠাৎ এক দল তরুণের উদয় ঘটে সে সময়। ইতিহাসকে আরো একবার পাঠ করার আহ্বান জানান তারা। ১৯৮৭ সালে ‘বার্থ অব ইসরায়েল: মিথ অ্যান্ড রিয়ালিটিজ’ দিয়ে শুরু। লেখক বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও ঐতিহাসিক সিমহা ফ্ল্যাপেন। ঠিক পরের বছর প্রকাশ হয় তিনটি বই। ইলান পাপের ‘ব্রিটেন অ্যান্ড আরব-ইসরায়েল কনফ্লিক্ট (১৯৪৭-৫১)’, বেনি মোরিসের ‘বার্থ অব দ্য প্যালেস্টাইন রিফিউজি প্রবলেম (১৯৪৭-৪৯)’ এবং আভি শ্লেইমের ‘কলিউশন অ্যাক্রস দ্য জর্ডান’। চারটি বইতেই আঘাত করা হয়েছে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রচলিত বয়ানের ওপর। এ বড় চার চরিত্রের পাশে তালিকায় রয়েছে টম সেগেভ, হিল্লেল কোহেন, বারুখ কিমারলিং, জোয়েল মিগদাল, ইডিথ জারটাল ও শ্লোমো স্যান্ডের নাম। তারা পরিচিতি অর্জন করে নয়া ঐতিহাসিক বা ‘নিউ হিস্টোরিয়ান’ নামে।
নয়া ঐতিহাসিক প্রজন্ম উত্থানের পেছনে দুটি বড় অনুঘটক কাজ করেছে। প্রথমত, ইসরায়েলি সরকারের দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন গুরুত্বপূর্ণ নথি উন্মুক্তকরণ। আর দ্বিতীয়টি, ইসরায়েলের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। লেবানন যুদ্ধের পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন আসে। উন্মুক্ত করে দেয়া হয় প্রাথমিক উৎস। বিশেষ করে সেন্ট্রাল জায়োনিস্ট আর্কাইভ, ইসরায়েলি স্টেট আর্কাইভ, হাগানাহ আর্কাইভ, আইডিএফ আর্কাইভ, লেভার পার্টি আর্কাইভ এবং বেন গুরিয়ন আর্কাইভ উন্মুক্ত করে দেয়ায় গবেষণায় নয়া মাত্রা আসে। আরব সরকারগুলোও সীমিত আকারে তথ্য দিতে স্বীকার করে। নতুন এ ঐতিহাসিক প্রজন্ম সনাতন ঐতিহাসিকদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি বিষয় নিয়ে তর্কে নামে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতি, ১৯৪৮ সালের আরব ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তি, ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংকটের কারণ, আরবদের যুদ্ধের লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণ। সনাতন ঐতিহাসিকদের উত্তর ছিল অনুমেয়। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ছিল ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে বাধা দিতে। ইহুদিরা সংখ্যা ও অস্ত্র উভয় ক্ষেত্রেই ছিল কম। ফিলিস্তিনিরা নিজে থেকে সরে গেছে পুনরায় ফিরে আসার জন্য। আরবদের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া। আর আরবরাই সমঝোতার বদলে সৃষ্ট রাজনৈতিক বন্ধ্যাবস্থার জন্য দায়ী। নয়া ঐতিহাসিকরা প্রতিটি জায়গাতেই দ্বিমত করেন। তাদের জবাবে, ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাকে নয়, ফিলিস্তিনের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছে। আরবরা নয়, ইহুদিরাই আরবদের সম্মিলিত শক্তির চেয়ে বেশি ছিল অস্ত্র ও জনসংখ্যায়। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ ত্যাগ করেনি, ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। সম্মিলিত আরব জোট বলেও কিছু ছিল না, তাদের নিজেদের মধ্যে নানা বিষয়ে বিভাজন ছিল স্পষ্ট। আর রাজনৈতিক অগ্রগতিতে যে অচলাবস্থা, তার পেছনে যতটা না আরবরা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ইসরায়েল। নয়া ঐতিহাসিকদের দাবি, ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই আরবরা তৈরি ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে। কিন্তু ডেভিড বেন গুরিয়ন বিষয়টিকে এগিয়ে নেননি। সে সময়েই ইসরায়েল চাইলে শান্তি আলোচনার জন্য এগিয়ে যেতে পারত।
সিমহা ফ্ল্যাপেন তার ‘দ্য বার্থ অব ইসরায়েল: মিথ অ্যান্ড রিয়ালিটিজ’ বইয়ে ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে পঞ্চাশের দশকের ইহুদি রাষ্ট্র গঠন নিয়ে আলোচনা হাজির করেছেন। নাম থেকেই ঠাহর করা যায়, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত কিছু মিথ ভাঙার মিশন নিয়ে নেমেছেন। আভি শ্লেইমের আলোচনা আরো বেশি তাত্ত্বিক। তার ‘দ্য আয়রন ওয়াল: ইসরায়েল অ্যান্ড দ্য আরব ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন জিইব জাবোতিনস্কির থেকে। জায়োনিজমকে পুনর্পাঠ প্রবণতার পাটাতন খুব সম্ভবত কবি ও লেখক জিইব জাবোতিনস্কির আদর্শে নিহিত। জন্মসূত্রে রুশ এ চিন্তক ১৯২৩ সালে লেখেন ‘অন দ্য আয়রন ওয়াল’। তার দাবি ছিল, আরব জাতীয়তাবাদীরা কখনই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন দেবে না। এক্ষেত্রে আলোচনার চেষ্টাও ব্যর্থ হবে। ফলে কেবল একটাই রাস্তা। জায়োনিস্ট প্রকল্পকে সামরিক বাহিনীর পেছনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে, যেটাকে তিনি আয়রন ওয়াল বলেছেন। তবে এ সামরিক প্রতিষ্ঠাকে তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রকল্পের প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য করেন। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপ হবে ফিলিস্তিনি আরবদের সঙ্গে সমঝোতা। তাদের অধিকার ও অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা। আভি শ্লেইমের দাবি, জাবোতিনস্কির প্রথম অনুসিদ্ধান্তকেই পরবর্তী সময়ে ডেভিড বেন গুরিয়ন ও তার দল গ্রহণ করেছে। আয়রন ওয়াল পরিণত হয়েছে ইসরায়েল রাষ্ট্রের মূল পাটাতন। কিন্তু জাবোতিনস্কি যে দ্বিতীয় ধাপের কথা বলেছেন, তাতে আর এগিয়ে যায়নি কেউ।
নয়া ঐতিহাসিকদের এ প্রবণতার ফলাফলও দ্রুত দৃশ্যমান হয়। স্বল্প সময়ের জন্যও শিথিলতা আসে আয়রন ওয়াল ধারণায়। ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক নেসেটে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের দুরবস্থার সমবেদনা প্রকাশ করেন। শিক্ষামন্ত্রী ইয়োজি সারিদ এগিয়ে যান আরো এক ধাপ। তিনি আরবদের কাছে ক্ষমা চান ১৯৫৬ সালে কাফির কাসিমে আইডিএফের হত্যাযজ্ঞের জন্য। সমালোচনাও কম হয়নি। হিল্লেল হালকিন নভেম্বরে ‘ওয়াজ জায়োনিজম আনজাস্ট?’ শিরোনামে জায়োনিজমের পক্ষে মত দেন। সমালোচনা করেছেন প্রো-ইসরাইলি ঐতিহাসিক অনিতা শাপিরার মতো অনেকেই। ২০০১ সালের পর বদলে যায় সবকিছু। এরিয়েল শ্যারন ক্ষমতায় আসেন। তিনি ঘোষণা দিয়েই এসেছিলেন, নয়া ঐতিহাসিকদের কথা টেক্সট বইতে রাখা যাবে না। শিক্ষামন্ত্রী লিমোর লিভনাত ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি লেখেন, ‘ব্যাক টু দ্য আয়রন ওয়াল’।
তার পরও নয়া ঐতিহাসিকরা আলোচনা জারি রেখেছেন। গবেষণা ও বইয়ের ফিরিস্তি একেবারে ছোট নয়। সেটা সময়ের সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আরবদের সঙ্গে শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নেয়া। তার মাধ্যমে জনগণ কিছুটা হলেও জানতে পারছে যুদ্ধের কিছুটা আরব বয়ান। প্রোপাগান্ডার বাইরে গিয়ে ইসরায়েলের ভেতরের মানুষ ওয়াকিবহাল হচ্ছে দেশের জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে। তারাও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছে আরবদের কাছে। যদিও কেউ সংস্কারবাদী জায়নিস্ট হিসেবেই রয়ে গেছেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কেউ কেউ বলেন ফিলিস্তিনের অধিকারের কথা। ইসরায়েলের কলোনিয়াল মনোবৃত্তি ও বর্ণবাদী আচরণের কথা। তবে ইসরায়েল বনাম আমালেক হিসেবে ইতিহাসকে পাঠ করার যে আড়ষ্টতা, সেটা এখনো মূলধারা হিসেবেই রয়ে গেছে। সে আড়ষ্টতা কবে কাটবে কিংবা আদতেই কাটবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










