সলোমন নরথাপের কথা জানে না এমন মানুষ বিরল। সংগীতের প্রতি দরদ ছিল প্রথম যৌবনে। চেয়েছিলেন পেশা হিসেবে বেছে নিতে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত। কিন্তু ভাগ্য সায় দেয়নি। সেখানে তাকে অপহরণ করা হয়। তারপর বিক্রি করে দেয়া হয় নিউ অরলিন্সে নিয়ে। লুইজিয়ানার রেড রিভার অঞ্চলে টানা ১২ বছর দাসত্ব করে কাটিয়েছেন তিনি। বীভৎস সে দাসজীবনকে পরবর্তী সময়ে তুলে ধরেছেন ‘টুয়েলভ ইয়ার্স আ স্লেভ’ স্মৃতিকথায়। ২০১৩ সালে স্মৃতিকথাকে সিনেমায় রূপ দেয়া হয়, যা জিতে নেয় অস্কার। অথচ ইতিহাসে সলোমন একা দাস না। কিংবা কেবল তার ওপরই নির্যাতন হয়েছে, এমনও না। ইউরোপে দাস ব্যবসা ছিল আয়ের অন্যতম উৎস। নির্যাতনও চলেছে অবর্ণনীয়। মৃত্যুবরণ কিংবা অঙ্গহানির ঘটনা ছিল স্বাভাবিক। তার পরও দাসপ্রথা নিয়ে আলোচনায় সলোমন ঠাঁই পান সবার আগে। কারণ সলোমন বলতে পেরেছেন, অন্যরা পারেনি। আর গল্প মানুষকে তাড়িত করে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। 

গল্প বলা ও শোনার সঙ্গে মানবজাতির সম্পর্ক মৌলিক। ঠিক একইভাবে মৌলিক গল্পের ন্যারেটিভ। নির্যাতিতের ন্যারেটিভ আর দাস ব্যবসায়ীদের ন্যারেটিভ এক নয়। হাজার বছর ধরে দাস ব্যবসায়ীদের ন্যারেটিভ আধিপত্য করেছে বলেই দাস ব্যবসা টিকে ছিল। উনিশ শতাব্দীতে সেটাকে ভাঙতেই কাজ করেছেন সলোমনরা। এভাবে প্রতিটি সম্প্রদায়, জাতি, রাষ্ট্র ও আদর্শের একটা নিজস্ব বয়ান থাকে, যা সংগঠিত অবস্থানের পক্ষে যুক্তি ও সম্মতি উৎপাদন করে। ফলে যেকোনো দুটি পক্ষ যখন সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন বাস্তবিকভাবেই তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করে ন্যারেটিভ। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংঘাতে সে সত্য আরো বেশি করে হাজির। ইসরায়েলের জন্মের পর থেকেই দেশটির ঐতিহাসিকরা চলমান টানাপড়েনকে সামনে এনেছেন ডেভিড ও গোলিয়াথের সংঘাত হিসেবে। ডেভিড বাইবেলের নবী, যাকে ইসলামে দাউদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে গোলিয়াথ ইসলামে চিহ্নিত জালুত নামে। নবী দাউদ গোলিয়াথকে বীরদর্পে পরাজিত করেন। ইসরায়েলের দাউদীয় অভিযাত্রায় ফিলিস্তিন যেন গোলিয়াথের বাধা হয়েই দাঁড়িয়েছে। অথচ ফিলিস্তিনিরা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরে বসবাস করে আসছে প্রাচীন কানানীয় সভ্যতার আমল থেকে। তাদের চোখে ইসরায়েল রাষ্ট্র কেবলই দখলদার শক্তি। তারা জবরদখলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করেছে এবং করে যাচ্ছে। 

ন্যারেটিভের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পরিভাষা। ইসরায়েল কি অভিযান চালাচ্ছে নাকি দখলদারত্ব? গাজার মানুষ কি খুন হচ্ছে না মারা যাচ্ছে? এমন অনেক পরিভাষায় নির্ভর করে বয়ান। ফিলিস্তিন ১৯৪৮ সালের ঘটনাকে নাম দিয়েছে নাকবা বা বিপর্যয়। তাদের ঐতিহাসিক ও জাতীয় অস্তিত্বের জন্য বিপর্যয়ই বটে। কারণ তার পর থেকেই বাস্তুহারা হতে বাধ্য হয়েছে বহু ফিলিস্তিনি। অন্যদিকে ইসরায়েলের সনাতন ঐতিহাসিকরা ১৯৪৮ সালকে স্বাধীনতার বছর বিবেচনা করে। মনে করে, দুই হাজার বছর ধরে বাস্তুহীন থাকার পর ঘরে ফেরার তারিখ। একত্র হওয়ার মৌসুম পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের। আরবরা সে জন্মকে বাধা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সফল হয়নি। আর আরব শরণার্থীদের কেউ বের করে দিচ্ছে না। তারা নিজেদের ইচ্ছায় ফিলিস্তিন ত্যাগ করছে। এমনকি বার্নার্ড রাইখ তার ‘‌হিস্টোরিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব দ্য আরব-ইসরায়েলি কনফ্লিক্ট’ বইতেও ১৯৪৮ সালের ঘটনাকে স্বাধীনতা বলেই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ফিলিস্তিনি চোখে যেটা বিপর্যয়, ইসরায়েলের চোখে তা প্রতিষ্ঠা। 

ন্যারেটিভ সশস্ত্র সংঘাতের পেছনে কাঠখড় দেয়। একটা দেশ বা জাতির স্কুলে, কলেজে, মাঠে ও বাজারে একই ন্যারেটিভ চর্চিত হয়। সংঘাত চলতে থাকার প্রধান কারণ ন্যারেটিভে বৈপরীত্য চলতে থাকা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সে ন্যারেটিভ শক্তিশালী হয়ে ওঠে জাতির মন ও মগজে। ন্যারেটিভের সমালোচনা করা ট্যাবুতে পরিণত হয় তাদের জন্য। নরম্যান ফিনকেলস্টেনের পূর্বপুরুষ হিটলারের যুগে আউশভিৎসের শহিদ। অথচ ইসরায়েলি ন্যারেটিভের সমালোচনা করে তিনি অ্যান্টি-সেমেটিক তকমা পেয়েছেন। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলি ন্যারেটিভেই যে ভূখণ্ডের চিত্র অঙ্কিত হয়, তাতে অন্যপক্ষের কোনো অধিকার নেই, ছিল না। ফলে নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে ঘৃণার উত্তরাধিকার নিয়ে। ন্যারেটিভ কেবল একটা পক্ষকে সমর্থন ও নৈতিক পাটাতন দেয়। ফলে ন্যারেটিভের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ আছে, জাতীয় মনস্তত্ত্বেও তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতীতের ন্যারেটিভ যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে ভবিষ্যতের ন্যারেটিভেও ভূমিকা রাখে। এজন্য ‘‌১৯৮৪’ উপন্যাসে জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন, ‘যে অতীত নিয়ন্ত্রণ করে, সে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে। সে বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করে, সে অতীত নিয়ন্ত্রণ করে।’

তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ দেখিয়েছেন, কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব নানা কিসিমের ফিকশনের জন্ম দিয়েছে প্রাচ্যকে ঘিরে। আর সেই ফিকশন পরবর্তী সময়ে তৈরি করেছে তাদের জন্য পৃথক বাস্তবতা। নিজেদের মতো করে তৈরি হয়েছে ন্যারেটিভ। ফিলিস্তিনি সমস্যা বুঝতে গিয়েও পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের বয়ানে চেপেই কথা বলছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের সংকট জটিল থেকে জটিলতরই হচ্ছে শুধু। সাঈদ দাবি করেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা অনেক আগেই জায়োনিস্টদের কাছে তাদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিচয় হারিয়েছে। কথাটা যে কতটুকু সত্য, তা তাদের ওপর নিয়ত নজরদারির গল্পগুলোই প্রমাণ করে। 

ইসরায়েলি ন্যারেটিভে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে আশির দশকে। তখন এমন কয়েকজন ঐতিহাসিকের উদ্ভব ঘটে, যারা প্রচলিত ইসরায়েলি বয়ানে আশ্বস্ত নয়। বেনি মরিস, টম সেগেভ, সিমহা ফ্ল্যাপেন, আভি শ্লেইম ও ইলান পাপ্পে তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ইসরায়েলি ইতিহাসকে বাইবেলীয় প্রবণতা থেকে বের করায় জোর দেন তারা। পরিচিতি পান নিউ হিস্টোরিয়ান বা নয়া ঐতিহাসিক নামে। তাদের ন্যারেটিভ ইসরায়েলি বর্ণনার চেয়ে অনেক বেশি ফিলিস্তিনি ন্যারেটিভের কাছাকাছি। তাদের বয়ানে জায়োনিজম ইউরোপের মধ্যে থাকা ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরি করে, পরবর্তী সময়ে যা কলোনিয়াল শক্তিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে যখন ফিলিস্তিনি অংশ দখল করেছে, তখনই তারা কলোনিয়াল বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করেছে। সিমহা ফ্ল্যাপেন ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত বই ‘‌দ্য বার্থ অব ইসরায়েল: মিথ অ্যান্ড রিয়ালিটিজ’-এ তার বিস্তারিত চিত্রিত করেছেন। জায়োনিস্ট ন্যারেটিভে দাবি, ১৯৪৮ সালে ইহুদি সম্প্রদায়কে ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নয়া ঐতিহাসিকরা অভিযোগটিকে অস্বীকার করেন। তাদের ভাষ্য, আরব দেশগুলো কেবল আত্মরক্ষার নীতি গ্রহণ করেছিল। ঠিক একই বয়ান হাজির করেন ফিলিস্তিনি অধ্যাপক ওয়ালিদ খালিদি। তিনি জানান, আরব শাসকদের কখনই ইহুদি রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করার নিয়ত ছিল না। তারা ইহুদি রাষ্ট্রে আক্রমণ করার চেয়ে নিজেদের সীমানা প্রতিরক্ষার দিকেই জোর দিয়েছেন। ইতিহাস বিজয়ীর প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ক্ষেত্র। আর বিজয়ী হিসেবে সনাতন ইসরায়েলি ভাষ্য, ফিলিস্তিনিদের কোনো ন্যায্য অধিকারই নেই ওই ভূখণ্ডের ওপর। এমন ন্যারেটিভ থেকে বের করে আনার চেষ্টায়ই ইসরায়েলি ঐতিহাসিক সিমহা ফ্ল্যাপেন এবং আরব ঐতিহাসিক ইবরাহিম আবু লুগদ তাগিদ দিয়েছেন নতুন করে ১৯৪৮ সালের ঘটনাকে বিবেচনা করায়। কারণ যেকোনো ধরনের সমঝোতার আলাপ ব্যর্থ হবে যদি ১৯৪৮ সালের ঘটনার সুরাহা না হয়। কারণ ইসরায়েলের ইতিহাস ডেভিড ও গোলিয়াথের সংঘাত নয়। মানুষ আর মানুষের সংঘাত।

‘‌ডেমোক্রেসি ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিকস’ বইতে লেস্টার পিয়ারসন দাবি করেছেন, মানবসভ্যতা এমন একসময়ে দাঁড়িয়েছে, যখন বিভিন্ন সভ্যতার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান জরুরি। পরস্পর থেকে শেখা জরুরি। কেবল এর মাধ্যমেই ইতিহাস, আদর্শ, শিল্প, সংস্কৃতির লেনদেনের মাধ্যমে পরস্পরকে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। বিপরীতে জন্ম নেবে ভুল বোঝাবুঝি, সংঘাত ও বিপর্যয়। মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সহাবস্থানের যোগ্যতার ওপর। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গে এসে ন্যারেটিভগুলো বারবার জড়িয়ে যাচ্ছে বলেই সুরাহা হচ্ছে না। সর্বশেষ সংঘাতে ইসরায়েল ও গাজা মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে সাড়ে ১০ হাজার অতিক্রম করে গেছে। তাদের বড় একটা অংশই শিশু। অথচ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বনেতাদের মধ্যে তেমন তোড়জোড় নেই। সমঝোতার চেয়ে পক্ষ বেছে নেয়াই যেন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সমঝোতায় আসা না গেলে পরিণাম কত ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তার উদাহরণ সামনেই দৃশ্যমান।

আহমেদ দীন রুমি: লেখক ও সাংবাদিক