জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন না বাড়ায় খাদ্যশস্য আমদানিনির্ভরতার হার বাড়ছে। কয়েক বছর ধরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। চালের ক্ষেত্রে এ প্রবৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক হলেও নেতিবাচক গমে। যেটুকু উৎপাদন বাড়ছে, তা ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। এ ঘাটতি পূরণে আমদানিনির্ভরতার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। টানা ছয় বছর খাদ্যশস্য আমদানিনির্ভরতার হার দুই অংকের ঘরে রয়েছে, যা টেকসই খাদ্য স্বয়সম্পূর্ণতা ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধক। বিশ্ব খাদ্যপণ্যের বাজার কোনো কারণে অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে মারাত্মকভাবে পড়ে। ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের শিক্ষা সবার মনে থাকার কথা। তত্কালে খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে রফতানি বন্ধ করে দেয়। সে সময় অর্থ ব্যয় করেও বিশ্ববাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ করা যায়নি। তাই নিজস্ব খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

টেকসই কৃষি উন্নয়নের প্রধান সমস্যা কৃষিজমির সীমাবদ্ধতা। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিল্পের প্রসার এবং নগরায়ণের জন্য ক্রমেই কৃষিজমি চলে গেছে চাষাবাদের বাইরে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য ফসলের নিবিড়তাও বেড়েছে। তার পরও খাদ্যশস্যের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। দেশের কৃষিকাজ সেচনির্ভর। বর্ষার অতিবৃষ্টিজনিত বন্যা ও শীতে খরা এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বন্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি বলে বর্ষাকালীন কৃষির উৎপাদন এখনো অনেকটা অনিশ্চিত। তাই গুরুত্ব বেড়েছে সেচনির্ভর শীতকালীন ফসল উৎপাদনের ওপর। বর্তমানে প্রদত্ত সেচের অধিকাংশই ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সম্পাদিত হয়। ভূ-উপরিস্থ পানির হিস্যা খুব কম। তাতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। এ পরিস্থিতিতে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো দরকার। দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদী-নালাগুলো সংস্কার ও বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেচকাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে জলাধার নির্মাণ করা দরকার। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে খুবই সংযত ও মিতব্যয়ী হতে হবে। বৃষ্টিনির্ভর কৃষির ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। সেজন্য কম সেচনির্ভর শস্যের জাত উদ্ভাবন ও তার সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

কৃষকের অধিক মুনাফা প্রাপ্তিতে, অধিক জায়গায় চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে, জমির বা ব্যবহূত উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে, বাজার চাহিদা পূরণ করতে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় মোট উৎপাদন বাড়ানোর চেয়ে প্রতি একক আয়তনের জমিতে ফলন বাড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কতটুকু সম্পদ বা উপকরণ ব্যবহার করে কী পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা যায়, তার অনুপাতকে উৎপাদনশীলতা বলা হয়। এটা উৎপাদনের দক্ষতাকেও ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ কম খরচে অধিক উৎপাদন। অন্য কথায় সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বাধিক উৎপাদনের জন্য ব্যবহূত উপকরণের ভারসাম্য রক্ষাই হলো উৎপাদনশীলতা। উৎপাদনশীলতা, ফলন বৃদ্ধি ও টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জরুরি ভিত্তিতে বীজ খাতের উন্নয়ন ও যান্ত্রিকীকরণে অনেক বেশিমাত্রায় বিনিয়োগ আবশ্যক। সেজন্য বেসরকারি খাত সহায়ক নীতি-কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় অনিবার্যভাবে অদূর ভবিষ্যতে কৃষি উপাদান ও উপকরণের মান বাড়বে না। দেশ খাদ্য সরবরাহে আরো বিদেশনির্ভর হয়ে পড়বে। খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিনিয়ত ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তাই বীজ খাতের আবশ্যকীয়তা ও গুরুত্ব প্রমাণ করে। প্রতিটি নতুন জাতের উদ্ভাবনে সময় লাগে ৮ থেকে ১১ বছর। ফলে আগামী ৫০ বছরের লক্ষ্য সামনে রেখে গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারের কৃষিনীতি সবসময় ধানের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। অতীতে (১৯৬০-৭০-এর দশকে) এ নীতি হয়তো যথার্থ ছিল। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে মধ্যবিত্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন এবং শিক্ষিতের হার বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জনগণের খাদ্যাভ্যাস বদলে যাচ্ছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের। এখন শুধু ধান নয়, বরং খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহের লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দিকেও নজর দিতে হবে। নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ফসলের জাত হতে হবে রোগবালাই প্রতিরোধে সক্ষম অথবা এসবের প্রতিকারে উপকরণের ব্যবহার করতে হবে কম, জৈব-অজৈব পীড়নের সহ্যশক্তি থাকতে হবে বেশি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও ফলন বাড়বে। একই সঙ্গে কম জমি, পানি, সার ও কীটনাশক ব্যবহারে বেশি ফলন মিলবে—এমন গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

অনেকের মতে, বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো ক্রমবর্ধমান ভূমিহীনের সংখ্যা, জমির মালিকানার ধরন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষাবাদ এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রান্তিক চাষীদের জ্ঞানের অভাব। অনেকে মনে করেন, সামাজিক কাঠামো ও জমিজমার ভাগ সংস্কার করে ভূমি ও শ্রম, কৃষি উৎপাদনের দুটো মূল উপাদানকে যদি জোতদার ও বাণিজ্যিক কৃষির দিকে ঠেলে দেয়া যায়, তাহলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ভূমি সংস্কার করে বাণিজ্যিক চাষাবাদের দিকে জোর দিলেও উৎপাদনশীলতা বাড়বে বৈকি; তবে এ পথ কঠিন। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সহজ পথ হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে উচ্চফলনশীল নতুন জাতের উদ্ভাবন।

বিশ্ব এখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। যুগের চাহিদা পূরণের জন্য এখন অল্প জমিতে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করার আধুনিক পদ্ধতির অনুসরণ চলছে। একদিকে ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদন প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষাবাদ। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে মাটিবিহীন কৃষিচর্চা। দেশে বর্তমান সময়ে সবজি ও ফল উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্য ঘটেছে। কোনো কোনো সবজি ও ফল ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অনুকরণে গ্রিনহাউজে করা হচ্ছে। আর বেশি ফলন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আমদানি করা পরীক্ষিত বীজ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে। ফলে পাল্টে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই। খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়াতে এ ধরনের প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। তবে অবশ্যই তা দেশীয় আবহাওয়া উপযোগী হওয়া প্রয়োজন। উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহারেও সতর্ক থাকতে হবে। নতুন নতুন যেসব কৃষিযন্ত্র আসছে, তাতে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। উৎপাদন দক্ষতা, পরিবর্তন দক্ষতা ও বাজারজাত ব্যবস্থাকে সহজীকরণ করতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে জমি চাষে। কৃষির অন্যান্য ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ হচ্ছে ধীরগতিতে। সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগ নিলেও তার বাস্তবায়ন অপেক্ষাকৃত ধীর। কার্যক্রমের গতি বাড়াতে জটিলতা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।