বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর দেশটি দীর্ঘকাল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়ে গেছে। সামরিক শাসনের অবসান, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় অবশেষে বাংলাদেশ বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে কিছুটা সুস্থির হয়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় নিজেকে যুক্ত করেছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে। ২০২১-এর রূপকল্প সামনে রেখে ২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১০ বছরকে ভিত্তি হিসেবে ধরে এগিয়ে যায় দেশটি। ফলাফল হিসেবে শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও শিশু উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিদ্যুৎ, রেমিট্যান্স আয়, জিডিপি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করে দেশটি। কভিড মহামারীর নেতিবাচক প্রভাবকেও সুন্দরভাবে প্রতিহত করেছে। এ সময়ে সবচেয়ে বড় যে সাফল্য হিসেবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরিত হয়ে উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি লাভ করে। ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের মধ্যম আয়ে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ অনুমোদন করে। নিঃসন্দেহে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এটি বড় একটি অর্জন। সে কারণে তাদের সাধুবাদ প্রাপ্য। তবে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশকে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশ হলে বাংলাদেশের বাস্তবতা পরিবর্তিত হবে। নতুন পরিস্থিতিতে গ্রহণ করতে হবে নতুন সিদ্ধান্ত। আর তা বাস্তবায়নে ঢেলে সাজাতে হবে সার্বিক অবকাঠামোকে। তার জন্য চাই যথাযথ প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতি গ্রহণে বাংলাদেশের তিন বছরের কিছু বেশি সময় হাতে আছে। উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কী ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে এবং তা মোকাবেলা করার উপায় কী হতে পারে, সেসব বিষয়ে কিছুটা আলোকপাতের প্রয়াস চালানো হয়েছে আলোচ্য নিবন্ধটিতে। 

মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে এ তিনটি সূচক যাচাই করা হয়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) প্রতি তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোয় এ তিনটি সূচক নিরীক্ষা করে। পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মুক্তি ঘটে। কোন দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৬ থেকে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে বিশ্বব্যাংক সে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এখানে আবার দুটি ভাগ আছে। যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ৪ হাজার ১২৫ ডলারের বেশি, তাদেরকে বলা হয় উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ। আবার যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় ৪ হাজার ১২৫ ডলারের মধ্যে, তারা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ শেষোক্ত ভাগটির অন্তর্ভুক্ত। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা ততোধিক পয়েন্ট পেতে হয়। শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির অনুপাত, বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক সমতা, প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার হার ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মানবসম্পদ সূচকটি তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা তার কম থাকতে হবে। এ তিন সূচকের মধ্যে যেকোনো দুটি সূচকে সাফল্য অর্জন করতে পারলে একটি দেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেয়া হয়। বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই প্রয়োজনীয় মাইলফলক অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন এ ধারা অব্যাহত রাখা। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৯৩ ডলার। (বণিক বার্তা, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩)। স্পষ্টতই, মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনীয় মাত্রা অর্জন করেছি। তবে এ মাথাপিছু আয়ে একটি ফাঁক আছে। এক বছরে একটি দেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাইরে থাকা সব নাগরিকের মোট আয়ের গড়কে বলা হয় মাথাপিছু জাতীয় আয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি দেশের লোকসংখ্যা দুজন হয়, তাদের মধ্যে একজনের বার্ষিক আয় ধরা যাক ১০ হাজার টাকা, আরেকজনের ২ হাজার টাকা। তাহলে সে দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় হবে ৬ হাজার টাকা। কিন্তু এ পরিসংখ্যান দেশটির প্রকৃত পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করছে না। দুজনেরই গড় আয় ৬ হাজার টাকা হলেও প্রকৃত অর্থে তাদের মধ্যে ব্যাপক আয়বৈষম্য বিদ্যমান। বাংলাদেশেও এ ধরনের আয়বৈষম্য বিদ্যমান। 

উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অগ্রাধিকারমূলক ও শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, তা আর পাবে না। এলডিসি হিসেবে দাতা দেশগুলো থেকে যে সহজ শর্তে ঋণ পায়, তা বন্ধ হবে। প্রযুক্তি খাতে উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের প্রদত্ত বিভিন্ন সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান বন্ধ হবে। ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসি) কর্তৃক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য প্রবর্তিত এলডিসি ফান্ড থেকে আর সহায়তা পাবে না। ওষুধ খাতে বড় একটি প্রভাব পড়বে। ট্রেড রিলেটেড ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (ট্রিপস) চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ক্রান্তিকালীন সুবিধা পাবে। এতে বাংলাদেশ ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব কেনা ছাড়াই ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশকে প্রতিটি ওষুধ উৎপাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট ফর্মুলার মেধাস্বত্ব কিনে নিতে হবে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে বহুগুণ। এর প্রভাব পড়বে খুচরা বাজারে।

কভিড মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিদেশে অর্থ পাচার। ট্রেড বেজড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) এবং ঋণ খেলাপির কারণে ব্যাংকিং খাত বিপর্যস্ত হয়েছে। করদাতাদের অনুৎসাহ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতার কারণে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত আশঙ্কাজনক অবস্থানে আছে। হুন্ডিসহ বিভিন্ন অবৈধ পথে অধিকাংশ রেমিট্যান্স প্রবাহিত হচ্ছে। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত জটিলতা এবং অসহযোগিতার কারণে পর্যাপ্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে না বাংলাদেশ। শেয়ারবাজার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে বিদেশী কোম্পানিগুলো। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ঘটেছে ব্যাপক পতন। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজাতে হবে। নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে থাকতে হবে বৈশ্বিক বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। আইন বিভাগকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রশাসন এবং আইন বিভাগ যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রভাবিত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে অর্থের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে। সেজন্য রাজস্ব বিভাগে প্রয়োজনীয় সংস্কার আবশ্যক। রাজস্ব বিভাগকে সময়োপযোগী করে গড়ে তোলার মাধ্যমে বাড়াতে হবে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত। কর প্রদান শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত নজরদারি ও শুল্ক আইনের যথাযথ তদারকির মাধ্যমে ঋণ খেলাপি ও টিবিএমএলের সুযোগ রোধ করতে হবে। রেমিট্যান্স যেন শতভাগ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রণোদনা আরো বাড়ানো যেতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রবাসীদের এ ব্যাপারে সচেতন করা। তাদের সুযোগ-সুবিধার প্রতি সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে তাদের দেশের প্রতি আস্থাশীল করে তোলা।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় কার্যকর বৈঠকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পাটজাত দ্রব্য, ফুটওয়্যার, চামড়াজাত দ্রব্য ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা অব্যাহত রাখা এবং সে ধারাবহিকতায় উন্নত দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিতে হবে। আমরা যেন নিজেরাই প্রযুক্তি খাত, ওষুধ খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে উদ্ভাবনের জায়গায় যেতে পারি, সেভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বেকারত্ব যথাসম্ভব দূর করতে হবে। যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি প্রেরণের ব্যবস্থা করতে হবে। 


নিজাম আশ শামস: সাংবাদিক