গত চার দশকে ফিলিস্তিন নিয়ে প্রকাশিত কিতাবাদির সংখ্যা বিপুল। সেগুলো সামনে রাখলে মোটাদাগে তিন ধরনের প্রবণতা নজরে আসে। প্রথমত, ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে মানবিকীকরণ প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়ত, সংঘাতের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মোকাবেলার বৌদ্ধিক বোঝাপড়া। তিনটি ক্ষেত্রেই মুখ্য হয়ে ওঠে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে আরব বনাম ইসরায়েলের টানাপড়েন। এ কথা অনস্বীকার্য যে পরিস্থিতি বোঝাপড়ায় অনেক বই-ই মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। সেটা সিমহা ফ্লাপেনের ‘দ্য বার্থ অব ইসরায়েল: মিথস অ্যান্ড রিয়ালিটিজ’-এর মতো ঐতিহাসিক পুনঃপাঠ হোক কিংবা এডওয়ার্ড সাঈদের ‘দ্য কোয়েশ্চেন অব প্যালেস্টাইন’-এর মতো তাত্ত্বিক বয়ান। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়েছে ফিলিস্তিনের স্বতন্ত্র স্বর। আলোচনা পর্যবসিত হয়েছে ‘ইহুদি প্রশ্ন’ কিংবা ‘আরব প্রশ্ন’ নিয়ে। ঢেকে গেছে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ, নাগরিক অধিকার এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতির মতো জরুরি বিষয়। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ কেবল সংঘাত ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নয়। আধুনিক বিশ্বের সামনে একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার বুঝে পাওয়ার বিষয়। আর সেটা স্বতন্ত্র পরিচয়কে সঙ্গে নিয়েই।
ফিলিস্তিন ঘিরে যেকোনো সংঘাত আরব-ইসরায়েল টানাপড়েন হিসেবে সাধারণীকরণ করে ফেলা হয়। অথচ ফিলিস্তিন প্রশ্নে কখনই সে অর্থে ‘প্যান-আরব’ ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার সময়কে বিবেচনায় নিলেই তার দলিল পাওয়া যায়। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরেই আরবরা প্রস্তুত ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে। বিষয়বস্তু ছিল সীমান্ত ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার। মিসরের রাজা ফারুক ইসরায়েলের স্বীকৃতির বিপরীতে গাজার অধিকার চেয়েছিলেন। কিং আবদুল্লাহ চেয়েছিলেন ট্রান্স জর্ডান থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত করিডোর। ক্ষমতায় থাকা সিরিয়ার কর্নেল হুসনি জাইম চেয়েছিলেন সি অব গ্যালিলির সীমান্ত পরিবর্তন। অর্থাৎ কর্তৃত্ববাদী আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনকে ঘিরে নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থেকেছেন। সেটা বর্তমানেও দৃশ্যমান। ইসরায়েলের ‘নিউ হিস্টোরিয়ান’ হিসেবে পরিচিত বেনি মোরিস, আভি শ্লেইম এবং পল সেগেভরাই প্রমাণ করেছেন আরবদের মধ্যে সে অর্থে ঐক্য ছিল না। আর সে অনৈক্যই ইসরায়েলের সীমাহীন আধিপত্যের বড় কারণ। এর পরও রাজনীতি বিশ্লেষক ও বৈশ্বিক নেতাদের মধ্যে সংঘাতকে আরব বনাম ইসরায়েল হিসেবে সাধারণী করার প্রবণতা প্রকারান্তরে ফিলিস্তিনের ভূমিপুত্রদের স্বাতন্ত্র্যকে উপেক্ষা করা। ফিলিস্তিনিদের আরব বলা যায়। কিন্তু আরব বলতেই তো ফিলিস্তিনি না। ফিলিস্তিনের আলাদা সংস্কৃতি আছে। আলাদা জাতীয় পরিচিতি ও ইতিহাস আছে। আছে নিজস্ব ভবিষ্যতের সম্মিলিত প্রত্যাশা। তারা সেই পরিচয় ও জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
ইহুদি পুরাণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়গুলোয় যতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, ফিলিস্তিনের স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস সে তুলনায় পঠিত হয়নি। ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগেই কানানীয় সংস্কৃতির আবাস ছিল। ছিল ইতিহাসের নানা পথপরিক্রমায় নিজস্ব বিবর্তনের ধারা। আত্মপরিচয়ের সে ন্যারেটিভ হালে পানি পায়নি। অথচ এ কথা অস্পষ্ট নয় যে ইহুদি জাতীয়তাবাদের শেকড় ঠেকেছে উপনিবেশবাদী অভিযাত্রার ওপর। সেখানে বিভিন্ন দেশের অভিবাসী রয়েছে। তারা সেসব দেশে নিজেদের আদিবাসী পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ। সেদিক থেকে তাকালে জায়নিজম দিন শেষে পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের বাই প্রডাক্ট, যা পশ্চিমা ইহুদি জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য তাড়িত করেছে। পশ্চিমা জনগোষ্ঠী জখন নিজস্ব ভূমি ও সার্বভৌমের বয়ান দাঁড় করছে, সে সময়ে দাঁড়িয়ে প্রভাবিত হয়েছে তারাও। আর সে চেতনায় ভূখণ্ডের শূন্যতা পূরণে বরাদ্দ করা হয়েছে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরকে। গোটা প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা দিয়েছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। এ সহযোগিতাও মূলত ঐতিহাসিক দায়মুক্তি। স্প্যানিশ ইনকুইজিশন থেকে শুরু করে হিটলারের আমল পর্যন্ত ইউরোপের মাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে যে ইহুদি বিদ্বেষ, তারা তা থেকে হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছে। পুরো বিষয়টি মীমাংসার ভার চাপিয়ে দিতে চেয়েছে আরবদের ওপর। এখন আরবরা ইহুদিদের হজম করতে পারল কিনা এটার ওপর তৈরি হচ্ছে নয়া বয়ান। প্রশ্ন উঠছে, আরবরা বর্ণবাদী কিংবা অ্যান্টি-সেমেটিক কিনা। আর পুরো গল্পে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে।
আরব বিশ্বের গণতন্ত্র অনেকটাই ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া। এ প্রতিক্রিয়ার রঙ বিভিন্ন রকম। ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক আচরণ তাতে পরিবর্তিত হয়নি। ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণকে বৈধ করতে তাদের অভিযানকে বারবার অভিহিত করা হয়েছে ‘এইন ব্রেইরা’ বা ‘ওয়ার অব নো চয়েস’ হিসেবে। সেটা অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে। কিন্তু ইলান পাপে ও বেনি মোরিসের মতো ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করেছেন, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ কিংবা ১৯৮২ সালের লেবাননে হামলাকে কোনোভাবেই ‘ওয়ার অব নো চয়েস’ বলা যায় না। ইসরায়েলের হাতে সে সময় বিকল্প পথে হাঁটার মতো উপায় ছিল। বর্তমানে রাইট টু ডিফেন্সের স্লোগান দিয়ে নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত হানা, এটাও দিন শেষে ইসরায়েলের ‘ওয়ার অব চয়েস’।
প্রসঙ্গক্রমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সামনে আনা যায়। পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীন হওয়ার ঠিক কয়েক মাস পর দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতায় আসে ন্যাশনাল পার্টি। তখনই পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের নাম থেকে প্রভাবিত হয়ে সামনে আনা হলো বান্টুস্তানের ধারণা। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিক করে ফেলা এবং শ্বেতাঙ্গদের একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করা হলো। বান্টুস্তান টেকেনি পরবর্তী সময়ে। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের পূর্বপাশের বর্তমান অবস্থা কোনো অংশে বান্টুস্তানের চেয়ে কম নয়। যেখানে ফিলিস্তিনিদের কেবল অ-ইহুদি হওয়ার জন্যই মোকাবেলা করতে হয় তল্লাশি, গ্রেফতার, চেকপয়েন্ট, কারফিউ, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া, বন্দি, উচ্ছেদ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়কে। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান সে অন্যায্যতাকে বৈধতা দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের মধ্যে চুক্তিটি সই হয়। সেটলার ইসরায়েলি চরিত্র ও বৈষম্যমূলক আচরণ তাতে জায়েজ হয়ে গেল। অথচ স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্ন থেকে গেল অধরা। উল্টো ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য তৈরি হলো নয়া বান্টুস্তান।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কম হয়নি। ১৯৭৯ সালে সাদাত-বেগিনের মধ্যকার ডেভিড ক্যাম্প চুক্তি, ২০২২ সালে আরব পিস ইনিশিয়েটিভ এবং ট্রাম্পের ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি আর সবিশেষ চারটি আরব দেশের নরমাইলাইজেশন অ্যাগ্রিমেন্টস উইথ ইসরায়েল। কিন্তু প্রতিটি উদ্যোগই প্রমাণ করেছে, আরব ও ইসরায়েল ইস্যুর মধ্যে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনকে অস্বীকার করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দুর্বলতা সব সময় ছিল। অসলো চুক্তির পর আরো ভাঙন তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক আঙিনায়। সময়ের ব্যবধানে তা আরো বেড়েছে বই কমেনি। সমঝোতার ধোঁয়াশা তৈরি কেবল কালক্ষেপণই হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু মৃতের মিছিল তো থেমে নেই। এখন পর্যন্ত একক রাষ্ট্র এবং দুই রাষ্ট্রের সমাধানের প্রস্তাব উঠেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু চুক্তি হয় সর্বশেষ। তাতে জায়নিজম প্রকল্পের আগ্রাসন আরো বেড়েছে। আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের দিকে এগিয়েছে তাদের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই। ফিলিস্তিনকে নিয়ে তারা কতটুকু বিবেচনায় নিয়েছে, সেটা প্রমাণিত। এমনকি গাজার চলমান পরিস্থিতিতে তারা পালন করেছে নীরব দর্শকের ভূমিকা।
নীতিগত টানাপড়েন কিংবা বৌদ্ধিক প্রশ্ন নয়, এটা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সেই ন্যায়বিচারের নানা প্রস্তাব হাজির করা যেতে পারে ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাতন্ত্র্য মৌলিক পরিচয়কে সমুন্নত রাখতে। একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রে সমান অধিকার নিয়ে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিরা বসবাস করবে। যেখানে কোনো ধরনের নাগরিক অধিকারের হরণ কিংবা বর্ণবৈষম্য থাকবে না। অথবা দুটি রাষ্ট্র হিসেবে পৃথকভাবে সার্বভৌম ইসরায়েল ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠাও একটা উপায়। সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই আলোচনার সুযোগ রাখাটাই ফিলিস্তিনিদের স্বীকৃতি। ফিলিস্তিনি জনতার ক্রমবর্ধমান আক্রোশ মূলত রাজনৈতিকভাবে সন্তোষজনক সমঝোতায় না আসতে পারার পরিণাম। দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদ অবদমিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রাজনৈতিক অচলাবস্থা থাকলে সশস্ত্র মোকাবেলা থাকবেই। বাড়বে সহিংসতা ও যুদ্ধ। মারা যাবে সাধারণ মানুষ। সহিংসতা নিজেকে জানান দেয়ারই আরেকটা ভাষার নাম। একাডেমিয়ায় আলোচনার ভিড়েও বাদ পড়ে যাচ্ছে সে দিকটা।
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










