জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রূপকল্প দক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তোলা। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। জনপ্রশাসনের উৎসাহ বাড়াতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কারও আনা হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। তার পরও আশানুরূপ ফল মিলছে না। সেবার মান এখনো নিম্ন, প্রকল্প বাস্তবায়নও সন্তোষজনক নয়। বুধবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবদের নিয়ে আয়োজিত একটি সভায় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির পুনরুল্লেখ করে বলেন, ‘অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। তাই কোনো রকম দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।’ প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, যার যার মন্ত্রণালয়ের যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে, সে প্রকল্পগুলো যেন যথাযথভাবে কার্যকর হয়, এ বিষয়গুলো দেখা দরকার। সরকারপ্রধানের এ নির্দেশনা পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সচিবরা সক্রিয় হবেন বলে প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও মন্দ কাজের জন্য তিরস্কারের নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি, যার ঘাটতি রয়েছে। 

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রশাসনিক উত্তরাধিকারের উৎস এক। সেটি ব্রিটিশ প্রবর্তিত শাসন ও বিচার ব্যবস্থা। স্বাধীনতার পর ভারত প্রশাসনিক গঠন কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন না এনেও ভারতবাসীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়ার দর্শনে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছে। একটি মেধাবী, দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ প্রশাসন ব্যবস্থা তারা সফলভাবে তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এক থাকলেও সেবার মানে পিছিয়ে দেশের জনপ্রশাসন। প্রশাসনকে দক্ষ ও গতিশীল করতে এর কাঠামোগত পরিবর্তন আনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যোগ্য ও সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে পদায়ন প্রয়োজন। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে সিভিল সার্ভিস কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। কর্মকর্তাদের মেধার প্রাধান্য দেয়ার জন্য সর্বশেষ জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশও উপেক্ষিত হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে তাদের পদোন্নতি দেয়া প্রয়োজন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার আগ্রহ তৈরি হয়। হতাশার বিষয় হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করা হলেও জনপ্রশাসনের কাছ থেকে যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হয়নি। এর মূল কারণ প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত নানামুখী উদ্যোগ যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া।

এ কথা অনস্বীকার্য, উন্নয়নের জন্য একটি দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন অপরিহার্য। সংস্কারের মাধ্যমে তেমন একটি জনপ্রশাসন গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প নেই। দুঃখজনক বিষয় হলো, দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের অবস্থান পাকিস্তান, এমনকি নেপালেরও নিচে। এখানকার নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরনো। পদোন্নতি মেধাভিত্তিক তো নয়ই, পদের বিপরীতেও নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনপ্রশাসনের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মকর্তা দেশের প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশ নেন। অন্যদের দেখলে মনে হয় যেন তাদের জেলে পাঠানো হয়েছে। বিদেশে প্রশিক্ষণ ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অকার্যকর। কর্মকর্তাদের কাজের সঙ্গে এ প্রশিক্ষণের কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না। এর সংস্কার অতিজরুরি। সব দেশেই যেকোনো ধরনের সরকার ব্যবস্থায় একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো থাকে। এ কাঠামো যত মজবুত আর কার্যকর হয়, তত বেশি দক্ষ হয় সেই সরকার। তার সুফল ভোগ করে জনগণ। আর তা করতে প্রয়োজন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদায়ন ও পদোন্নতিকালে মেধা ও উপযুক্ততার যথার্থ মূল্যায়ন। তদুপরি আবশ্যক উপযুক্ত বেতন কাঠামো। আরো প্রয়োজন আইনানুগ দায়িত্ব সম্পাদনে তাদের ওপর অকারণ হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। দুর্ভাগ্যবশত আমরা কয়েক যুগ ধরে এর কোনোটিই যথার্থভাবে করতে পারছি না।

সরকারি চাকরিতে পেশাদারি প্রতিষ্ঠা করতে হলে পাঁচটা জিনিস প্রতিপালন করা খুব প্রয়োজন। এগুলো হলো নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি। এগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে হতে হবে। বর্তমান সরকারের অধীনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিপুল বেতন বৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর হয়নি। অথচ একসময় স্বল্প বেতনকে দুর্নীতির কারণ মনে করা হতো। তাহলে বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা গেল না কেন? এর কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের পেশাদারির শৃঙ্খলে বাঁধা যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের দুর্বলতাও দৃশ্যমান। প্রশাসনকে গতিশীল করতে নানা বিধি-বিধান বদল, কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ডেভেলপ, বিশেষ করে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও টেম্পারিং রোধে নতুন এসিআর পদ্ধতি চালু, কাজের গতি বাড়াতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সাবেক সচিবদের জন্য বিশেষজ্ঞ টিম, প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করার জন্য সিভিল সার্ভিস কমিশন, প্রশাসনের স্থবিরতা নিরসনে ভিজিল্যান্স টিম এবং রিসোর্স পারসনস পুল গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা সংস্কারে থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। এটি প্রশাসনের দক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলছে।

একবিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে নাগরিকদের তুলনামূলকভাবে ভালো ও সহজপ্রাপ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ফলাফলমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে, যেটি ভারতে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। ভারতে পেশাদারিত্ব উন্নয়নে মন্ত্রণালয়গুলোর ফাংশনাল ক্লাস্টার গঠন এবং আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব নিরসন, চাকরিতে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে তা হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, জনবল সুষমকরণ ও ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, প্রশাসনিক সরকারে অনেক দেশের চেয়ে বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। সরকারি অর্থের অপচয় হ্রাসে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য হিসাব নিরীক্ষণের জন্য মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে।

জনপ্রশাসনকে আধুনিকীকরণ, যুগোপযোগী ও উন্নয়নমুখী করা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব সরকারের। একই সঙ্গে সরকারের ভাবনা বা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমলাতন্ত্রের। তাই সরকার ও আমলাতন্ত্র প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং পরস্পরের পরিপূরক। এ প্রেক্ষাপটে সরকারকে এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হয়, যার মাধ্যমে সরকারের চিন্তাচেতনা, পরিকল্পনা ও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন যেমন সম্ভব, তেমনি জনগণ যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সুবিচার পায়, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে সর্বস্তরে সরকারের উপস্থিতিকে জনগণের কাছে প্রতিভাত করতে পারলেই তার সাফল্য দৃশ্যমান হয়। বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পাবলিক সেক্টরকে প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। সে কারণে দক্ষ ও যুগোপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং একে কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। পাবলিক সেক্টরে সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ প্রয়োগ একটি রাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে জাতীয় ও বিশ্ব অর্থনীতিতে দক্ষতার সঙ্গে অবদান রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অবকাঠামো বিনির্মাণ, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সর্বোচ্চ সেবার মাধ্যমে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের জন্য দক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। দক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী কয়েক দফায় কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত সেগুলোর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া।