‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমার মস্তিষ্কই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি নিজেই নিজের শত্রু হয়ে পড়েছি অজান্তেই। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত। আর না। এবার মুক্তি চাই। প্রিয় মা-বাবা, ছোট বোন সবাই পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে লাফ দেয়ার আগে চিঠিটা রুমে রেখে যান অমিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অমিত কুমার বিশ্বাস। আত্মহত্যা করেন ২০২২ সালের মে মাসে। চিঠি দীর্ঘ নয় বলে অনেক প্রশ্নই রহস্যে ঢাকা। ঘটনাবহুল দেশ। তেমন আট-দশটা ঘটনার মতোই সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন অমিত। অল্প সময়ের জন্য। তারপর কেউ তলিয়ে দেখেনি আত্মহত্যার কারণ। শুধু অমিত নয়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সেখানে ৫৭ জনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। স্কুলের ২১৯ জন, মাদ্রাসার ৪৪ জন ও কলেজপড়ুয়া ৮৪ জন। আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে নারী ২৪২ জন ও পুরুষ ২৬২ জন। শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যাটি চার গুণ। ২০২১ সালে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে আত্মহত্যা করেছিল ৭৯ জন। জরিপ চালানো প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশন শঙ্কার কথা জানিয়েছে। প্রতি বছর যে হারে তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, তা শঙ্কার বটে। বিষয়টি নিয়ে মাথাব্যথা নেই কোনো মহলে। হয়তো আধুনিকতা কেবল আত্মহত্যাকেই সহজ করেনি, জীবিতদেরও অনুভূতিহীন করেছে।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম তার ‘লা সুইসাইড’ প্রকাশ করেন ১৮৯৭ সালে। আত্মহত্যার পেছনে বিয়ে, ধর্ম, বসবাসের স্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক অবস্থাকে দায়ী করেন। তার চিন্তায় ক্যাথলিকদের চেয়ে প্রটেস্ট্যান্ট ও বিবাহিতের চেয়ে অবিবাহিতের আত্মহত্যার হার বেশি। আত্মহত্যাকে চারটি আলাদা শ্রেণীতে ফেলে মূলত ইশারা করতে চান সামাজিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকে। অবশ্য হাল আমলের সমাজবিজ্ঞানী থমাস জয়নার আরো নির্দিষ্ট করেছেন আলোচনা। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার সামনে নিজেকে বোঝা মনে করা ও বিচ্ছিন্নতা তার চোখে আত্মহত্যার ফ্যাক্টর। ব্যক্তি যখন পরিবার ও সমাজের চোখে নিজের অস্তিত্বশীলতা ধরতে পারে না। তখনই মূলত নিজেকে বোঝা ভাবার প্রবণতা শুরু। স্বপ্নগুলো দৃশ্যমান সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে থাকে সংযোগহীন। বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিকাঠামোতে নিজেকে আবিষ্কার করে এলিয়েন হিসেবে। নিজস্ব বিচারে সমাজে তার প্রয়োজন নেই, তার কাছে প্রয়োজন নেই সমাজের। সেক্ষেত্রে দুনিয়া থেকে সরে যাওয়ার চিন্তা আসা স্বাভাবিক। শৈশবের স্মৃতি ও মানসিক যন্ত্রণা কখনো অনুঘটক। কিন্তু তার পেছনের গল্প বেশ জটিল। একটা মানুষ হুট করেই বিশ্বাস করতে শুরু করে না—‘আমার জীবনের চেয়ে আমার মৃত্যু শ্রেয়’।
গত দেড় দশকে দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে দেশ। রাজনৈতিক টানাপড়েন সবসময়ই ছিল। তবে এ সময়ে পেয়েছে নতুন মাত্রা। সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিহিংসা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তরুণরা নিজেদের এলিয়েন হিসেবে আবিষ্কার করছে মাত্র। শুধু হতভম্বের মতো দেখা ছাড়া কিছু করার নেই। চল্লিশের দশকে দেশ ভাগ একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল, ষাটের দশকজুড়ে ছিল স্বাধীনতা লাভের ক্ষুধা, আশির দশকে গণতন্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ছিল সামনে। বর্তমান প্রজন্মের বড় অংশে তেমন কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার চেয়ে তারা প্রাধান্য দিচ্ছে ক্ষমতা কাঠামোর উপরের স্তরে থাকাকে। কারণ নাগরিক হলেই নাগরিক সুবিধা পাওয়া যায় না, তার জন্য ভিন্ন মাপকাঠি রয়েছে। জর্জ অরওয়েল তার অ্যানিমেল ফার্মে উদ্ধৃত করেছিলেন, ‘অল অ্যানিমেলস আর ইকুয়াল, সাম অ্যানিমেলস আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদারস’। এখানকার সমাজ বাস্তবতায় কথাটা প্রাসঙ্গিক। অন্তত তরুণরা সেটাই মনে করে। এ দৃশ্য সমাজের সিংহভাগ স্তরে। ফলে ‘আইন সবার জন্য সমান’ কথাটা পঠিত হয় সত্য, তাতে ঠোঁট নড়লেও মন নড়ে না। ভরসা আসে না ভেতর থেকে। চাপা সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিরাপত্তা বোধ থেকে মুক্তি তখন একদিকে গিয়ে ঠেকে। একটা ঝামেলাহীন ক্যারিয়ার। নিজেকে আর পরিবারকে নিয়ে থাকা। কিন্তু সেটাও সহজ নয়। প্রথমত, এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ জনবল তৈরি করতে যথেষ্ট পিছিয়ে। দ্বিতীয়ত, দক্ষদের জন্য তৈরি হয়নি উপযুক্ত কর্মসংস্থান। শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান চাপ কেবল হতাশাই বৃদ্ধি করে তরুণদের জন্য। হাজার স্বপ্ন নিয়ে যে ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রেখেছে, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বছরের মাথায় পায়ের নিচে মাটি সরে যায়। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে ১০১ জন। তাদের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াই ৬২ জন। নয়জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ছয়জন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের। আত্মহত্যার জরিপে তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীর হারই ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। কারণ তখন থেকেই জীবনের জটিলতা স্পষ্ট হতে থাকে।
তরুণদের আত্মহত্যার কিছু কারণ খুব সাধারণ। সম্পর্কজনিত তিক্ততা, পারিবারিক টানাপড়েন, ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। যিনি চলে যান, তিনি জটিল সমস্যা বুঝেই যান। অনেক কিছুই তাকে হতাশ করেছে। তবে তার চেয়ে হতাশাজনক হলো, হতাশার কথা জানানোর মতো তিনি কাউকে পাননি। গত দেড় দশকেই দেশ প্রবেশ করেছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। ডিজিটাল মাধ্যমের উত্থান দুটি প্রজন্মকে যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। বদলে গেছে শিক্ষা ও বিনোদনের সংজ্ঞা। তরুণ প্রজন্মের ভাষা বুঝতে পারছেন না অভিভাবকরা। বিপরীতে অভিভাবকদের ভাষা দুর্বোধ্য লাগে তরুণদের কাছেও। পিতা-মাতা সন্তানের প্রথম সাইকিয়াট্রিস্ট। নিজের জমানো অভিজ্ঞতা দিয়ে পাঠ করেন সন্তানকে। অথচ নতুন প্রজন্মের মনোজগৎকে স্পর্শ করতে পারছেন না অভিভাবক। বরং অজ্ঞাতে বহু দূর বিস্তৃত হয়েছে বিচ্ছিন্নতা। বিচ্ছিন্নতা পরিবার ও সমাজ থেকে। সন্তানরা তাদের ভালোলাগা ও মন্দ লাগা নিয়ে আগের মতো কাছাকাছি হতে পারছেন না অভিভাবেকর সঙ্গে। সৃষ্ট ক্ষতের মিথ্যা ওষুধ রূপে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ক্ষতের সমাধান হতে নয়। ক্ষতের খবর থেকে ভুলিয়ে রাখতে। যে কাজ সাধারণত মাদক করে। ফলে টানাপড়েন ছড়িয়ে যাচ্ছে পরিবার থেকে সমাজে। তরুণরা যে পরস্পরের পাশে দাঁড়াচ্ছে, সেটাও নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্কগুলো অনাস্থা আর অবিশ্বাসে ঘেরা। বরং দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা। নিজের প্রাপ্তিকে প্রদর্শন করা মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। সাদামাটা এ কাজটাই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা মানুষের ওপর তৈরি করে চাপ। বাড়তে থাকে ডিপ্রেশন। পেছাতে পেছাতে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন ফায়সালা হয় আত্মহত্যায়।
দেশে হরেক কিসিমের ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান আছে। তারা চাইলে শিক্ষাঋণের প্রসার ঘটাতে পারে। তাতে অন্তত জোর থাকবে এগিয়ে যাওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মস্তিষ্ক। অথচ আত্মহত্যার তালিকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণই বেশি। যেহেতু সেখানে পড়া তরুণদের বড় অংশ মফস্বলের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা মানসিক চাপ সৃষ্টির পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে থাকা অসম্ভব নয়। দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে। যেন ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের চিন্তায় বর্তমানটা নষ্ট না হয়। আত্মহত্যা থেকে মুক্ত না হলেও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ হার কম এজন্যই। তবে সেখান থেকে বিদেশ চলে যাওয়ার হার বেশি। তরুণদের আত্মহত্যা কিংবা বিদেশে পাড়ি জমানো, কোনোটিই দেশের জন্য সুখবর নয়। এসবের বাইরে কিছু আত্মহত্যার পেছনে সম্পর্কজনিত টানাপড়েন জড়িত। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তির মানসিক ভঙ্গুরতা ও অবসাদ। তার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও কাউন্সেলিং সেন্টার পালন করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফরমাল সম্পর্কের বাইরেও শিক্ষকদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, যেন তরুণরা নিজেদের চাপ প্রকাশ করতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, ইন্ট্রোভার্টদের আত্মহত্যার অনুপাত বেশি। কারণ তাদের সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একই কথা প্রযোজ্য আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তরুণদের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এসে ‘অপরায়ন’ হয়ে থাকা তৈরি করে বাড়তি চাপ। আত্মহত্যা মহামারীর চেয়ে ভয়াবহ। প্রতি বছর দুনিয়ায় প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। মৃত্যুর মাধ্যম হিসেবে প্রথম সারিতেই এর অবস্থান। কভিড-পরবর্তী দুনিয়ায় এটি নতুন রূপ নিয়েছে। তার প্রমাণ খোদ বাংলাদেশের জরিপ।
শেকসপিয়ারের নায়ক-নায়িকারা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তারা ভুল করে ও ভুল বোঝে। তারপর পরিস্থিতি হাতের নাগালে চলে গেলে আত্মহত্যা করে ফেলে। যেন সমাধান হয়ে গেল। নাটক হিসেবে ট্র্যাজেডি উপভোগ্যও বটে। এজন্যই প্রিন্স অব ভেরোনাকে বলতে শোনা যায়, ‘ রোমিও ও জুলিয়েটের চাইতে বড় কোনো আখ্যান দুনিয়ায় নেই।’ কিন্তু জীবনের হিসাব অত সরল নয়। আত্মহত্যা সমাধান নয়। আত্মহত্যা যেকোনো দেশেই সামাজিক বন্ধনের ভঙ্গুরতার লক্ষণ। জীবনের অর্থহীনতা অনুধাবন করা ব্যক্তির অস্তিত্ব বোধের সঙ্গেই জড়িত। ফলে মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে মোকাবেলা না করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থহীনতা ‘লুপ’-এ পরিণত হলেই ব্যক্তি বেছে নেয় আত্মহত্যার সড়ক। তরুণদের ‘একিলিস হিল’ এটি। একে সুরক্ষিত করার একমাত্র পথ তরুণদের চিন্তা ও কর্মকে প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি। তারুণ্যকে অর্থবাচক করতে পারলেই তরুণরা জীবনের দিকে আগ্রহী হবে। যুগে যুগে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় তো তরুণরাই। একটা আত্মহত্যাপ্রবণ প্রজন্ম নিয়ে কতদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব?
আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক










