দেশে বেসরকারিভাবে টিকা দেয়ার অনুমোদন না থাকলেও এসএমএস পাঠানো হচ্ছে সেলফোনে। এতে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। যদিও সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, বেসরকারিভাবে টিকা দেয়ার সুযোগ নেই। মাঝে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাবের বিপরীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, বিষয়টি সরকার ভেবে দেখবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলেই খবর মিলছে। এদিকে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে নভেল করোনাভাইরাসের টিকা বেসরকারিভাবে না দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকার টু সরকার এ পদ্ধতির বাইরে বেসরকারিভাবে আপাতত টিকা আমদানির কোনো সুযোগ নেই। অতীতে বেসরকারিভাবে টিকা আনার অভিজ্ঞতা তিক্ত। তাই জি টু জি পদ্ধতিতেই টিকা আনা হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। কোনোভাবেই বেসরকারিভাবে টিকা না দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কারণ বেসরকারি খাতে টিকা এলে অব্যবস্থাপনা বেড়ে যাবে। দেখা যাবে মেয়াদোত্তীর্ণ টিকা নিয়ে আসবে। পানি ভরে টিকা দেয়া হবে। আর সব দোষ পড়বে সরকারের ওপর। আবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পর্যন্ত টিকা বিক্রিতে নেমে পড়বেন। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। এক্ষেত্রে যারা মোবাইলে বার্তা দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

প্রথম দেশ হিসেবে পাকিস্তান করোনা টিকা বিক্রির বিষয়টি বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়। বেসরকারি খাত চাইলে টিকা আমদানি  এবং তা বিক্রিও করতে পারবে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা রাশিয়ার টিকা স্পুটনিক-ভি বেশ চড়া দামে বিক্রি শুরু করেন। ব্যাপক চড়া দামে টিকা বিক্রি করলেও তা নিতে অনেক মানুষকে লাইন দিতে দেখা যায়। বেসরকারি টিকা সেন্টারগুলো খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টিকা শেষ হয়ে যায়। ভিড় সামলাতে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমও চালু করে। টিকা-সংক্রান্ত সরকারি বিধিনিষেধের কারণে যারা টিকা নিতে পারছেন না, তাদের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। পাকিস্তানের বাসিন্দারা বেসরকারি খাতে টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টিকে ইতিবাচক বললেও এর দাম নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। পাকিস্তান ছাড়াও ভারতে বেসরকারি খাতে টিকা বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ওষুধ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (সিডিএসসিও) করোনার টিকা আমদানির জন্য নতুন একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি করোনার টিকা আমদানি করতে পারবে। তবে মানতে হবে কিছু শর্ত। নির্দেশিকায় করোনার টিকা আমদানির ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর আমদানিকারক কিংবা অনুমোদিত এজেন্ট যেকোনো দেশ থেকে টিকা আমদানি করতে পারবে। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ যে কেউ জাতীয় নির্দেশিকা মেনে আমদানিকারকদের কাছ থেকে ওই টিকা সংগ্রহ করতে পারবে।  যদি আমদানি করতে চাওয়া টিকাটি এরই মধ্যে সিডিএসসিওর অনুমোদন কিংবা আমদানির জন্য লাইসেন্স পেয়ে থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতসহ যেকোনো প্রতিষ্ঠান জাতীয় নির্দেশিকা মেনে আমদানিকারকদের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহ করার সুযোগ পাবে। এদিকে সরকারের দিক থেকে মনিটরিং করার জন্য যথেষ্ট লোকবল নেই। ফলে বেসরকারি খাতে টিকা নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া কলম্বিয়া সরকারও চলতি মাসের শুরুতে বেসরকারি খাতকে টিকা আমদানির অনুমতি দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়াসহ আফ্রিকার আরো কয়েকটি দেশও টিকাকে বেসরকারি খাতে দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরাসহ সব পক্ষই বেসরকারি খাতে টিকার মূল্য নির্ধারণ নিয়ে চিন্তিত। বেসরকারি খাতের টিকা শেষমেশ মানুষের প্রয়োজন নাকি মুনাফা বাড়াবে, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

যেসব দেশ করোনার টিকা বেসরকারি খাতে আমদানি ও প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে, তাদের কারো অভিজ্ঞতাই সুখকর নয়। অতিরিক্ত দামে টিকা বিক্রি, টিকার নামে স্যালাইন পুশ করা থেকে শুরু করে টিকা সংরক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অসুস্থতারও খবর মিলছে। ফলে দেশগুলো বেসরকারি খাতে টিকা দেয়া স্থগিত করার চিন্তাভাবনাও করছে। ভারত এরই মধ্যে তদারকি জোরদার করেছে এবং বেসরকারি খাতে টিকার প্রয়োগের অনুমতি সীমিত করে এনেছে। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে টিকা আনার আগেই মোবাইলে বার্তা দেয়া, টিকার কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া, এমনকি সরকারি টিকা বিক্রির অভিযোগও উঠছে। এমন অবস্থায় বেসরকারি খাতে টিকা আমদানি ও তা প্রয়োগের অনুমতি দিলে নকল টিকা তৈরি ও তা প্রয়োগের আশঙ্কা বেড়ে উঠবে। এতে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই জি টু জি পর্যায়ে টিকা আমদানি এবং সরকারি মাধ্যমে তা প্রয়োগ করতে হবে। সরকারের সে সক্ষমতা রয়েছে। দেশব্যাপী ইপিআইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মিবাহিনীকে টিকা কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে। তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী না করে এ মুহূর্তে বেসরকারিভাবে করোনার টিকা আমদানি ও প্রয়োগের সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। দেশের বড় অংশ জনগণকে টিকার আওতায় আনার পর বেসরকারি খাতে এটি উন্মুক্ত করার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে, তার আগে নয়।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সরকারিভাবেই করোনার টিকা সংগ্রহ ও দেয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে। সন্দেহ নেই, চাহিদার চেয়ে করোনার টিকা সরবরাহ সীমিত হওয়ায় এর ব্যবস্থাপনা হতে হবে সুষ্ঠু। বেসরকারি খাতে এটি আমদানি ও ব্যবহার উন্মুক্ত করা হলে মুনাফা অর্জনের জন্য টিকা মজুদ করে ফেলতে পারে ব্যক্তি খাত। এতে দরিদ্র মানুষের টিকাপ্রাপ্তিতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সরকারি মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ ও তা দেয়ার কথা বলে আসছে। তাছাড়া করোনার টিকা নকল হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। সুষম বণ্টনেরও প্রশ্ন রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ টিকা ক্রয় ও দেয়ার কার্যক্রম বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করেনি। বাংলাদেশেও করোনা টিকাকে বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করে দেয়ার সময় এখন আসেনি বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার ভিন্ন মতও রয়েছে, কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ টিকাদানের গতি বাড়াতে বেসরকারি খাতে এটি আমদানি ও ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার কথা বলছেন। তবে দাম ও ফি নির্ধারণের পরামর্শ তাদের। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং এক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। এ পরিস্থিতিতে টিকা আমদানি ও তা প্রয়োগে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত না করে জি টু জি ভিত্তিতে এগোনোই সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত।

করোনার টিকা ব্যবস্থাপনা ও প্রদান নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে কীভাবে টিকাদানে সম্পৃক্ত করা যায়, তা ভাবা উচিত। অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ইপিআইয়ের টিকা বিনা মূল্যে দিয়ে থাকে। অনেকে আবার সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকে। করোনা টিকা দিতে বেসরকারি হাসপাতালের সহায়তা নেয়া যেতে পারে, তবে সেখানে আর্থিক লেনদেনের কোনো বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক হবে না। সরকার টিকা সরবরাহ করবে। একই সঙ্গে তদারকি জোরদার করবে, যাতে এর অপব্যবহার না হয়। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন সরকারকে দুটি প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রথমত, তারা এ টিকা বিনামূল্যে চেয়েছে। আর তা না হলে সরকার যে দাম ঠিক করে দেবে, সেই দামে তারা কিনে নেবেন। ফ্রি পেলে তারা বিনামূল্যেই এ টিকা দেবে। আর দাম দিয়ে কিনলে সামান্য লাভ রেখে তারা এ টিকা দেবে। সারা দেশে করোনার টিকা দেয়া শুরু হয়েছে, কিন্তু তাতে বেসরকারি হাসপাতালের কোনো অংশগ্রহণ নেই। অথচ স্বাস্থ্য খাতে তারা অনেক বড় সেবা দিয়ে আসছে। করোনা টিকা দেয়ায়ও তাদের সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের দিক থেকে মনিটরিংয়ের জন্য যথেষ্ট লোকবল নেই। ফলে বেসরকারি খাতে টিকা নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তদারকিও নিশ্চিত করা চাই।