কম্পিউটারের আউটলুক অ্যাড্রেস বুকে থাকা সবার কাছে ই-মেইল চলে যাবে। ই-মেইলে লেখা থাকবে, ‘পাঠানো প্রেমপত্রটি খুলে দেখুন’। সঙ্গে একটি টেক্সট ফাইল থাকবে ‘লাভ লেটার ফর ইউ’ শিরোনামে। শশব্যস্ত জীবনে হুট করে এমন ই-মেইল যে কারো জন্য লোভনীয়। নিজেকে আটকে রাখাও সহজ নয়। সুতরাং ই-মেইলপ্রাপ্ত ব্যক্তি আগে বা পরে ফাইলটি ওপেন করবেই। ঠিক তখনই কেল্লাফতে। তার কম্পিউটারও আক্রান্ত হবে ভাইরাসে। আক্রান্ত কম্পিউটার আবার একইভাবে অ্যাড্রেস বুক থেকে সবার কাছে ই-মেইল পাঠাবে। ক্রমে মহামারীর মতো একের পর এক কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়বে ভাইরাস। ২০০০ সালে ২৪ বছর বয়সী ফিলিপিনো তরুণ ওনিল দ্য গুজম্যান যখন ভাইরাসটি তৈরি করলেন, সম্ভবত নিজেও কল্পনা করেননি এর প্রভাব। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস ঘটনাটিকে মনে রেখেছে অন্যতম বৃহৎ দুর্ঘটনা হিসেবে। ‘লাভ বাগ’ নামের ভাইরাসটি প্রায় সাড়ে চার কোটি কম্পিউটারকে আক্রান্ত করেছিল তখন। তাও খুবই দ্রুততম সময়ের মধ্যে। ক্ষতি হয় ৫০০ থেকে ৮০০ কোটি ডলার। আধুনিকতা যেন অনিরাপত্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে দিল মানবজাতির জন্য। স্থাপন করল প্রতিরক্ষার নতুন সংজ্ঞা।
প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে মানুষ। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া যোগ করেছে নয়া মাত্রা। দুনিয়ার নানা প্রান্তের মানুষ মুহূর্তেই যোগাযোগ করতে পারছে পরস্পরের সঙ্গে। সহজ হয়েছে রক্তদান, সামাজিক সচেতনতা বিষয়ক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের অনুসন্ধান। মানুষকে একীভূত করার ক্ষমতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তাও উঠেছে অনন্য উচ্চতায়। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, পিসিতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা প্রতি ঘণ্টায় ১২ মিনিট ব্যয় করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য এ সময় ১৮ মিনিট। নতুন প্রজন্মের বড় একটা অংশ রীতিমতো আসক্ত হয়ে পড়েছে এখানে। তার পরও সোশ্যাল মিডিয়া কি মানুষকে শক্তিশালী করেছে, নাকি আরো বেশি দুর্বল করে তুলেছে- সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কোনো শহরেই কেবল সাধুরা বসবাস করে না; নানা মতলবের অসাধুরাও গড়ে তোলে আস্তানা। ফলে অপরাধপ্রবণ মানুষের সামনে নতুন অঞ্চল উন্মোচিত হয়েছে তর্জনী ঘুরানোর জন্য। তারাও পরস্পরের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তুলছে বৃহত্তর অপরাধ ঘটানোর জন্য।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারকারী প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেন নিজের অ্যাকাউন্টে। শেয়ার করেন নিজের ভৌগোলিক অবস্থান। বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে দেন কোথাও খেতে বা ঘুরতে যাওয়ার কথা কিংবা কোনো সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা। অপরাধী চক্রের জন্য কিন্তু তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের পর সুবিধামতো সময়ে ব্যবহারকারীকে মুখদর্শন দেবে অপরাধী। সাক্ষাতের ফলাফল যে ব্যবহারকারীর জন্য কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। উদাহরণ হিসেবে ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবরে সংঘটিত কিম কার্দাশিয়ানের কথাই তুলে ধরা যাক। অপরাধীরা কিমের টুইটার পোস্ট দেখে তার অবস্থান জানতে পারে। তারপর প্যারিসের হোটেল থেকে ছিনতাই করে নেয় ১ কোটি ডলার মূল্যের অলঙ্কার। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের ঘটনার নজির কম নেই। তবে বাংলাদেশে নতুন একটা চর্চা চালু হয়েছে ফেসবুকের সঙ্গে। কারো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার পর তার বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার চাওয়া। একবার অ্যাকাউন্ট হাত করা গেলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ব্ল্যাকমেইলও করা যায় সহজে। কাহিনী কতদূর গড়াতে পারে তার নিপুণ চিত্র দেখা যায় চার্লি ব্রুকারের অ্যান্থলজি সিরিজ ‘ব্ল্যাক মিরর’-এ। আধুনিক দুনিয়া অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। পরিবর্তন এসেছে অপরাধের ধরনেও। বিকাশ কিংবা ফোনে জালিয়াত চক্রের কাছে প্রতারিত হয়ে টাকা খোয়ানোর গল্প পুরনো। সোশ্যাল মিডিয়া এ চর্চায় নতুন মোড়ক দিয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অপরাধীরা ই-মেইলে অবাক করে দেয়ার মতো কিছু পাঠায়। হতে পারে অফিসের হয়ে, হতে পারে ব্যাংক, লটারি কিংবা প্রেমপত্রের মতো করে। বড়শি পানিতে ফেলার পর যেমন ডাঙায় আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করে শিকারি। ঠিক তেমনই এত আয়োজনের পেছনে থেকে অপেক্ষায় বসে থাকে অপরাধী চক্র। অপেক্ষা শুধুই ব্যবহারকারীকে ফাঁদে ফেলার জন্য। বর্তমান সময়ে ফিশিং বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। তার বাইরে রয়েছে ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিভিন্ন লিংক, অ্যাটাচমেন্ট ও মেসেজ। ব্যবহারকারী একবার সাড়া দিলে অজ্ঞাতেই মোবাইল বা কম্পিউটারে ছড়িয়ে যাবে ভাইরাস। সোফোস অ্যান্টিভাইরাসের দাবি অনুযায়ী, ম্যালওয়্যারে আক্রান্ত ব্যবহারকারীদের ৪০ শতাংশের সমস্যার মূলে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার। কেবল ২০১৭ সালেই মার্কিন মুল্লুকে আইডেন্টিটি থেফটের অভিযোগ এসেছে ১৭ হাজার ৬৩৬টি। পেছনে ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ১৫ হাজার ২৯৮ ডলার। বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ কম নেই; ভুক্তভোগী ব্যক্তি আইনের দ্বারস্থ হয় কালেভদ্রে। তবে সূচক কেবল বাড়ছেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হুমকি দেয়া বা হেনস্তা করাটা তৃতীয় বিশ্বে খুবই সাধারণ চিত্র। ১৮-২৯ বছর বয়সী নারীরা সাইবার-স্টকিংয়ের শিকার। যদিও হেনস্তা কেবল নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
হেক্টরের মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি ট্রয়ের যুদ্ধ। ট্রয় নগরীর অজেয় প্রাচীরের সামনে গ্রিকরা ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে। ১০ বছর ধরে ব্যর্থ বসে থাকার পর হতাশা স্বাভাবিক। ঠিক তখনই নাড়া দেয় নতুন পরিকল্পনা। কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় অতিকায় ঘোড়া। তারপর ঘোড়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকেন বাছাই করা সব গ্রিক বীর। গ্রিক শিবিরের বাকি অংশ পিছিয়ে যাওয়ার ভান ধরল। যেন কাঠের ঘোড়াটা ফেলে রেখে জাহাজ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে গ্রিকরা। রণাঙ্গন খালি দেখে ট্রয়ের জনতার আনন্দ আকাশছোঁয়া। বিজয়ের স্মারক হিসেবেই কাঠের ঘোড়াটাকে নিয়ে যায় নগরীর মধ্যে। ঠিক পরের রাতে ঘটে আসল ঘটনা। ঘোড়ার ভেতর থেকে নীরবে বের হয়ে আসেন গ্রিক বীররা। খুলে দেয় নগর দরজা। পিছিয়ে থাকা বাকি সৈন্যরাও খুব দ্রুত প্রবেশ করে নগরে। আঘাত হানে অপ্রস্তুত ট্রয়বাসীর ওপর। গ্রিকদের জয় দিয়ে শেষ হয় দীর্ঘদিনের যুদ্ধ। গ্রিক মিথের ট্রোজান হর্সের মতোই সোশ্যাল মিডিয়া ভেতরে আততায়ী নিয়ে প্রবেশ করে ব্যবহারকারীর চৌহদ্দিতে। তারপর অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রমণ করে বসে নিরাপত্তার দেয়ালে।
ভেঙে যাচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের প্রাচীর। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ার জামানায় এরই মধ্যে প্রাইভেট ও পাবলিক জীবনের মধ্যকার সীমারেখা উধাও হয়ে গেছে। তারকাদের ঘরের খবর সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়মিত গুঞ্জনের বিষয়ে পরিণত। যে সমস্যা দুজন বসে দুদিনে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে দুই হাজার মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। ভুল তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে দেয়ার নজির দেখার অভিজ্ঞতাও হয়েছে দেশে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য ধর্মীয় ইস্যু উসকে দেয়া বেশ লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে বারবার। কক্সবাজারের রামু, পাবনার সাঁথিয়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর তার উদাহরণ। সোশ্যাল মিডিয়া ছিল সেখানে নৈরাজ্য ছড়ানোর হাতিয়ার।
ভার্চুয়াল স্পেস যেন নতুন একটা নগরীতে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিটি অলিগলিতে অপেক্ষা করে ফাঁদ। চাকরি দেয়ার নামে যুবকের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেয়া কিংবা প্রেমের নামে বালিকা অপহরণের ফিরিস্তি বেশুমার। ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে অভিজ্ঞতার ঝুলি। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে প্রতারক চক্র ক্রেডিট কার্ডের তথ্য নিয়ে টাকা উত্তোলন ও ক্রয় করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেনাকাটা করছেন অনেকেই। তার জন্য নাম, ঠিকানা, ই-মেইল ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিতে হয় প্রায়ই। গোপনীয়তার সামান্য এদিক সেদিক হলে তথ্য চলে যেতে পারে তৃতীয় পক্ষের কাছে। ক্রেডিট কার্ড তখন শূন্য করে দিতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না অপরাধী চক্রের। গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করেছিল।
বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি বিভাগের হেল্প ডেস্কে ২০১৫-১৬ সালেই ১৭ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে। সংখ্যাটি পরে বেড়েছে বই কমেনি। ফেসবুকে চ্যাট ও ভিডিও কলের ছবিকে এদিক-ওদিক করে লঙ্ঘন করা হচ্ছে গোপনীয়তার নীতি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে পর্নোগ্রাফির ওয়েবসাইটে। ভুক্তভোগী মানুষটি শিকার হচ্ছে মানসিক ট্রমার। তবে তার চেয়ে সেনসিটিভ বিষয় হলো ভুয়া চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অর্থ সংগ্রহ। টাকা দেয়ার সময় মানুষ হয়তো ভাবে তারা দুর্গতদের জন্য ব্যয় করছে, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে সে পয়সা বাঁটোয়ারা হয় স্বার্থান্বেষী একটা মহলের মধ্যে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ প্রতারিত ব্যক্তিরা পরবর্তী সময়ে সত্যিকার অর্থেই বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে কুণ্ঠাবোধ করে, দ্বিধান্বিত হয়। মানুষ মানুষের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেললে ভেঙে পড়ে গোটা সমাজ ব্যবস্থা।
সোশ্যাল মিডিয়া প্রায় দুই যুগ ধরে যুক্ত মানবজাতির অগ্রযাত্রায়। তাকে ঘিরে অপরাধীরাও গড়ে তুলেছে নিজস্ব সাম্রাজ্য। উন্নত বিশ্বই থৈ পাচ্ছে না, তৃতীয় বিশ্বের ব্যবহারকারীরা সেখানে আরো বেশি অসহায়। আইনি মোকাবেলাও যেহেতু এখানে অত সহজ নয়, ফলে সচেতনতাই একমাত্র রাস্তা। নাহলে সোশ্যাল মিডিয়া এ প্রজন্মের জন্য ট্রোজান হর্সে পরিণত হবে।
আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক










