প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে পুরনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের। দ্বিপক্ষীয় এ বাণিজ্যের সিংহভাগই স্থলপথনির্ভর। বাণিজ্যের জন্য অবকাঠামোগত দুর্বলতা দুই দেশেই বিদ্যমান, যার কারণে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশের প্রতিটি স্থলবন্দর আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেসব পণ্যের জট বেশি লেগে আছে সেগুলো অন্য বন্দর দিয়ে আমদানির সুযোগ করে দিতে হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সহজীকরণে চারটি বড় বাধা রয়েছে। বাধাগুলো হলো অবকাঠামো দুর্বলতা, শুল্ক ও বন্দরসংক্রান্ত সুবিধা, অশুল্ক বাধা এবং ঝামেলাপূর্ণ রফতানি প্রক্রিয়া। দুই দেশের বাণিজ্য সহজীকরণে স্থলবন্দর, রেলপথসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থলবন্দরগুলো আরো গতিশীল ও কার্যকর করার পক্ষেও আছে নানা সমস্যা। স্থলবন্দরের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজও দুর্বল। বন্দরগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করে সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বেনাপোল ছাড়া অন্যান্য স্থলবন্দরে আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত গুদামঘর, ওজন যন্ত্র, ব্যাংকিং সুবিধা ইত্যাদি নেই। ফলে সীমান্ত অতিক্রমকালে বন্দরের আনুষ্ঠানিকতায় বিলম্ব হয়। এতে দেখা যায় পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি। বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয়, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া বন্দরগুলোর কাজ গতিশীল করতে পণ্য খালাস পদ্ধতির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। কাগজপত্র কম্পিউটারাইজড করা দরকার, দরকার উন্নত মানের সড়ক। বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার ভারতের সঙ্গে যে আমদানি-রফতানি হয়, তার বড় অংশ হয় স্থলবন্দরের মাধ্যমে। ভারত তাদের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে সহজে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি বন্দর ব্যবহার করছে। মিয়ানমারের সঙ্গেও বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত দিয়ে আমদানি-রফতানি রয়েছে। পাশাপাশি নেপাল বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে সড়কপথে পণ্য নেয়ার পরিকল্পনা করছে। রয়েছে ভুটানের সঙ্গে স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি। ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করেছে। ফলে স্থলবন্দরগুলোর উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
বেনাপোল, পেট্রাপোলসহ বাংলাদেশের সব স্থলবন্দরের ভৌত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন আবশ্যক। এ ধরনের সেবার অনুপস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতার ফলে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পণ্য পরিবহনে রেলপথ ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পণ্য আমদানি-রফতানিতে এর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। রেলওয়ের কনটেইনার ডিপোও স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর ব্যবহারে ভারত অত্যন্ত আগ্রহী, তবে এজন্য বিদ্যমান নৌপথের বেশকিছু জায়গায় নাব্যতা বৃদ্ধিতে ড্রেজিং এবং সংশ্লিষ্ট কিছু নীতিমালার সংস্কার করা জরুরি।
স্থলবন্দর নির্মাণে অর্থ সংকটের পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কাটিয়ে উঠতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণকাজের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, নৌ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জড়িত থাকে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় থেকে কাগজপত্র অনুমোদন নিতে অনেক সময় অপচয় হয়। এ কারণেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হয় না। স্থলবন্দরগুলোর আয় বাড়াতে হলে এগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। সমস্যাটি দ্বিমুখী। স্থলবন্দরগুলোর দক্ষতা না বাড়ালে আয় বাড়ানো যাবে না, আবার আয় না বাড়লে অবকাঠামোগত উন্নয়নও কঠিন হবে বৈকি। বর্তমানে স্থলবন্দর ছাড়া বিভিন্ন শুল্ক স্টেশন দিয়েও পণ্য আমদানি-রফতানি হয়। এসব শুল্ক স্টেশনের ব্যয় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে সব পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে স্থলবন্দর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলে আয় অবশ্যই বাড়বে। বন্দরকে বলা হয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতীক। স্থল, সমুদ্র কিংবা বিমানবন্দর কোনোটিরই গুরুত্ব আসলে কম নয়। তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে স্থলবন্দরগুলোর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। আর স্থলবন্দরগুলোর সার্বিক উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সরকারের উচিত জনস্বার্থেই স্থলবন্দরের উন্নয়নে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ করা।
সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ও ভারতের অর্থায়নে স্থলবন্দর উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন গতি খুবই ধীর এবং কয়েকটি সময়োপযোগী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের অংশের তুলনায় ভারতীয় অংশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা অধিক বলে ব্যবসায়ীরা জানান। ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের আমদানি করা পণ্য অনেকদিন আটকে থাকে বলেও জানা যায়। এক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় অংশে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। আশার কথা হলো, এরই মধ্যে বেনাপোল ছাড়া কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সব বন্দর দিয়ে সব পণ্য আমদানি-রফতানি করা যায় না। এ নিয়ম পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
স্থলবন্দরগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের যেসব সংযোগ সড়ক আছে, অনেক জায়গায় সেগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো না। বন্দরের জিরো পয়েন্ট থেকে পরের ১৫০ গজ পর্যন্ত রাস্তাগুলো দুই দেশের বিভিন্ন ধরনের বাধার কারণে নির্মাণ করা যাচ্ছে না। সড়কের এসব দুর্বলতার কারণে পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আমাদের যে পণ্যগুলো আসে, সেগুলো পরিবহন করা হয় ভারী ট্রাকগুলোয়। এসব ট্রাক চলাচলের উপযোগী করে সড়কগুলো তৈরি করা দরকার। এসব সমস্যা সমাধানে বন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দেয়া দরকার। এসব বিষয় সমাধানের জন্য উভয় দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা জড়িত। ফলে অনেক দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা যায় না। পরিণতিতে বার্ষিক উন্নয়ন অগ্রগতি মন্থর হয়ে যায়, যা সামগ্রিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে। তাছাড়া বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় অন্য দেশের ভূরাজনৈতিক বিষয় বন্দরের কার্যক্রমেও প্রভাব সৃষ্টি করে। অনেক সময় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও অন্য দেশ যদি তার স্থলবন্দর ভালোভাবে উন্নতি না করে, তাহলে বাংলাদেশে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এর পুরো সুফল ঘরে তুলতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কার্যকর ব্যবস্থা, যা উভয় পক্ষ বা সব পক্ষের জন্য সমান পরিবেশ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য আরো বাড়বে। বিদ্যমান বাণিজ্যের চাপ সামলাতে গিয়ে স্থল, নৌ ও রেলপথ হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে বেড়ে ওঠা বাণিজ্যের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। উভয় দেশের সরকারের উচিত আগামী ৫০ বছরের বিষয় বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার আলোকে পুরো প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানো। হতাশার বিষয় হলো, উভয় দেশ অবকাঠামো দুর্বলতায় বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও উন্নয়নে তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অবকাঠামো সীমাবদ্ধতার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনবলের স্বল্পতা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সব বন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।










