কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউরোপীয় দেশগুলোয় বড়দিনকে কেন্দ্র করে যেমন কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। বাংলা নামের ব-দ্বীপে সেই স্থান গ্রহণ করেছে ঈদ। উৎপত্তিগতভাবে ধর্মীয় উৎসব হলেও শত শত বছরের ইতিহাস নিয়ে জড়িয়ে গেছে এখানকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে। এ সর্বব্যাপী রূপের কারণে এখানকার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকে রূপ নিয়েছে ঈদ।

ঈদ মৌসুমে রেমিট্যান্স আসার সূচক বেড়ে যায়। তার প্রমাণ মার্চের রেমিট্যান্স সূচক। মার্চে দেশের অভ্যন্তরে রেমিট্যান্স এসেছে ২০২ কোটি ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর এ মান সর্বোচ্চ। কেবল ফেব্রুয়ারির তুলনাতেই মার্চের রেমিট্যান্স ছিল ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ফেব্রুয়ারির রেমিট্যান্স ছিল ১৫৬ কোটি ডলার। আগের মাসগুলোতেও সূচক কাছাকাছি। এ বড় উল্লম্ফনের পেছনে প্রধান কারণ রমজান মাস ও ঈদের প্রস্তুতি। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বসবাস করা ঘরের মানুষকে পাঠিয়েছে অর্থ। প্রবাসী আয়ের এ সূচক এপ্রিলে বেড়েছে বই কমেনি। চলমান বৈশ্বিক মন্দা ও দেশীয় বাজারে অস্থিতিশীলতার সময়ে এই রেমিট্যান্স দেশীয় অর্থনীতির জন্য আশাজাগানিয়া। রমজান ও ঈদ সামনে রেখে রেমিট্যান্সের বড় একটা অংশই ছড়িয়ে পড়ে বাজারে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় দেশী আয়ের মানুষ। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীরা ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বোনাস পান, সেটিও ছড়িয়ে পড়ে বাজারেই। এ কথা সত্য, বঙ্গবাজার ও নিউ মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিঘ্নিত হয়েছে ঈদের বাজার। তাই বলে থমকে যায়নি। দেশজুড়ে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত যথারীতি চলবে এ তোড়জোড়। মুদ্রার এ প্রবাহ দেশীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করে নতুন চালিকাশক্তি।

রমজান মাস থেকেই বেড়ে যায় দেশীয় বাজারে বিভিন্ন পণ্যের বেচাকেনা। রমরমা হয়ে ওঠে মাছ, মাংস ও মসলার বাজার। কর্মব্যস্ত শহুরে মানুষ বন্ধু ও পরিচিতজনকে সঙ্গে করে আয়োজন করে ইফতার পার্টির। অধিকাংশ সময়ই বেছে নেয় ঈদের ঠিক আগের ছুটির দিনগুলোকে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলও আয়োজন করে ইফতারের। মূলত ইফতার পার্টি বর্তমানে রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়েছে দেশীয় প্রেক্ষাপটে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, বিদেশী কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সমমনা সংগঠনগুলো ইফতার উপলক্ষেই আয়োজন করে আলোচনা সভার। নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি ও বিরোধী দলগুলো তোড়জোড় শুরু করে শিবির গোছানোর জন্য। এসব তৎপরতার অর্থনৈতিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। পুরো রমজানে ছোট ছোট ব্যবসা দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। ঈদ কেন্দ্র করে তৈরি হয় নতুন উদ্যোক্তা। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন পেমেন্ট মাধ্যমের উত্থান এ সুযোগকে আরো সহজ করে দিয়েছে। কেবল প্রচলিত ব্যাংক কিংবা বাজারের সঙ্গেই লেনদেন সহজ হয়নি, ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতাদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ঈদের অর্থনৈতিক প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয় না সমাজের ছিন্নমূল অংশও। আবশ্যকীয়ভাবে পালন করা বিশেষ দান ‘‌ফিতরা’ তাদের হাতে সামান্য হলেও অর্থের সংস্থান করে। 

বছরের সিংহভাগ সময় গ্রামীণ জনতার বড় একটা অংশ চাকরি ও ব্যবসার সুবাদে শহরে অবস্থান করে। কেউ সপরিবারে আবার কেউ পরিবার রেখে। শহরের কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যেই তাদের জীবন। কিন্তু ঈদের মৌসুমে বদলে যায় দৃশ্যপট। বিপুল শহরবাসী গ্রামে ছুটে যায় নাড়ির টানে, গ্রামের বাড়িতে সবাইকে নিয়ে ঈদ উদযাপনের জন্য। তাদের আগমনে প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে গ্রামের হাটবাজার ও দোকানগুলো। নতুন রক্ত সঞ্চারিত হয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে। সমীকরণটা অনেকটাই বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনার মতো। শহর থেকে টাকা উপার্জন করে গ্রামে ফিরে মানুষ সেখানেই ব্যয় করে। গ্রামের উৎপাদিত পণ্যের উপযোগ বৃদ্ধি পায়। পণ্য ভোক্তার কাছে না গিয়ে খোদ ভোক্তাই যেন পণ্যের কাছে চলে এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ঈদ কেন্দ্র করেই ঈদগাহ মাঠের চারপাশে সাময়িক দোকানগুলোকেও এ মিছিলে যুক্ত করা যায়। আর পুরো সময়টায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে পরিবহন ব্যবস্থা। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ঘাটগুলোয় ভিড় দেখা যেতে থাকে। ভাড়া বেড়ে গেলেও আটকে থাকে না বাড়ি যাওয়া। ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন মিলে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যাওয়া একটা নতুন প্রবণতায় পরিণত হয়েছে, যা পর্যটন খাতকে আশাবাদী করে তুলছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ঈদকেন্দ্রিক ভিড় বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। পর্যটন বর্তমান দুনিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে জনগণের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমে এ খাতে অর্থনৈতিক গতি আনা সম্ভব। 

ঈদ ও রমজান উপলক্ষে ব্যাংক খাতে পৃথক কর্মচঞ্চলতা দেখা যায়। মুদ্রার সরবরাহ, লেনদেন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইতিবাচক প্রভাব ফেলে জাতীয় অর্থনীতিতে। বছরের দুই ঈদ কেন্দ্র করেই তৈরি হয় পৃথক প্রবাহ। তবে ঈদুল আজহার কথা আলাদা করে না বললেই নয়। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর মোট ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৩টি গবাদিপশু কোরবানি দেয়া হয়েছে। তার আগের বছর ঈদে কোরবানি হয়েছিল ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি। কোরবানির সূচক ঊর্ধ্বমুখী। দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার কারণে পশুকেন্দ্রিক ব্যবসাও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোরবানির পশু উৎপাদনের পেছনে গড়ে উঠেছে খামার ও চাষী। এ দৃশ্য খুবই সাধারণ যে গ্রামীণ কৃষকরা অল্প পুঁজি নিয়ে একটা গরু দীর্ঘদিন ধরে পালন করে। পরবর্তী সময়ে কোনো কোরবানির ঈদে বিক্রি করে এককালীন অর্থ হাতে পায়, যা দিয়ে অনায়াসে সে নতুন কোনো ব্যবসা দাঁড় করাতে পারে। কোরবানি পশুর চামড়ার জন্য পৃথক অর্থনীতির সমীকরণ তো রয়েছেই। রফতানি বাণিজ্য, পোশাক কারখানা, জুতা, ব্যাগ ও নানা চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় কোরবানির পশুর চামড়া। চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতেও জড়িত থাকে বিপুল কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ। হজের সঙ্গে যেহেতু সময়গতভাবে ঈদের সংযোগ রয়েছে। ফলে হজকেন্দ্রিক অর্থনীতিও ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতিরই অংশ। বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর হজে যেতে পারবেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন মানুষ। তাদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাবেন ১৫ হাজার। বাকিদের যেতে হবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। দেশ থেকে চলতি বছর হজের জন্য সরকারিভাবে প্যাকেজ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৫ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬১৮ টাকা। এভাবে মুদ্রার লেনদেন, সংগ্রহ ও প্রবাহ সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। 

ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রবহমানতা থেকে রাষ্ট্রের আরো উপকৃত হওয়া সম্ভব। সরকারি পরিবহন ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও আস্থাপূর্ণ করে তুলতে পারলে কিংবা সরকারি ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো গণমুখী করতে পারলে রাষ্ট্রের তহবিল আরো শক্তিশালী বানানো সম্ভব। বর্তমান সময়ে ঈদকে কেন্দ্র করে অসদুপায় অবলম্বনকারীদের দৌরাত্ম্য কম নেই। বড় বড় শহরে ছিনতাইকারীদের উৎপাত রয়েছে। জাল টাকার বিস্তারও চোখে পড়ার মতো। কয়েক মৌসুম ধরে চামড়া পাচার কিংবা সিন্ডিকেট তৈরি করে চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো ঘটনা অনেককে হতাশ করেছে। যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। এক্ষেত্রে সরকার ও অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঈদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়াটা ইতিবাচক হতে পারে। ঈদ যেহেতু বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া বার্ষিক উৎসব, সেহেতু ভবিষ্যতেও ঈদ পালিত হবে। ফলে ঈদ কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে সরকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ঈদ অর্থনীতির পরিপূর্ণ ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে অর্থনীতির মহারথীদের মাধ্যমে। একদিকে বিশ্ব অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে। অন্যদিকে রয়েছে করোনা-পরবর্তী বিশ্বে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিবন্ধকতা। বাণিজ্যের ধীরগতি, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় দেশে দেশে ব্যাহত হচ্ছে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা। বাংলাদেশের জন্য ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সেই মন্দাবস্থাকে কাটিয়ে ওঠার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক