আগস্টের শেষ সপ্তাহে হয়ে গেল ব্রিকস সম্মেলন। উন্নয়নশীল দেশে কার্যক্রম বাড়ানো নিয়ে সিদ্ধান্ত হলো। পদক্ষেপ নেয়া হয় ডলারের আধিপত্য কমাতে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের। সম্প্রতি শেষ হওয়া জি২০ ও আসিয়ানের সভায়ও আঞ্চলিক ব্যবসায় দেয়া হয়েছে গুরুত্ব। রাশিয়া তৎপর ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরাম নিয়ে। ফলে একদিকে স্থানীয়করণ ঘটছে বাণিজ্যের, অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার জেরে পরিবর্তন আসছে সরবরাহ চেইনে। কিছু দেশ আবার গ্রহণ করেছে একলা চলার নীতি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বিশ্বায়নের সূর্য কি তাহলে অস্ত যেতে চলল? 

বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান প্রতিবন্ধকতা জলবায়ু ঝুঁকি, জ্বালানির পরিবর্তন, প্রযুক্তির পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, বৈষম্য ও মহামারী। বিশ্বায়ন কাজ করে সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্য নীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন নিয়ে। এর মাধ্যমেই একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয় দেশ এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু নীতি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সম্প্রতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্বায়ন। অনেক সরকার এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রক্ষণশীল নীতির দিকে ঝুঁকছে। তারা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বায়নের বিপরীত এ প্রবণতা পরিচিত ডিগ্লোবালাইজেশন নামে। আন্তর্জাতিক ব্যবসায় নতুন ভূরাজনৈতিক প্রবণতা এ ডিগ্লোবালাইজেশন 

বা অবিশ্বায়ন।  

ডিগ্লোবালাইজেশনের প্রধান চালক ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দা। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রতিক্রিয়ায় কিছু সরকার তখন নীতি পরিবর্তন করেছিল। সীমান্তজুড়ে আরোপ করেছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা। বিশ্বব্যাপী মহামারী এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে দেড় দশক আগের সে রক্ষণশীল নীতিগুলোই। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের জেরে ২৪টি দেশ রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়াও আরোপ করেছে নিষেধাজ্ঞা। পাল্টাপাল্টি এ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে, যার ফল আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতির সূচকে দৃশ্যমান। 

সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ায় সরকারগুলো তাদের বাণিজ্য কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ছে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সরবরাহ চেইন তৈরির প্রবণতা। অর্থাৎ অর্থনীতি ও বাণিজ্য স্থানীয়করণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণে দাঁড়িয়ে দেশগুলো অনুসরণ করছে নয়া শিল্পনীতি। খুব কাছের একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রতি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। দেশটি থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় অনেক ইউরোপীয় কোম্পানি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে ভোক্তাপণ্য খাতে সৃষ্ট সে শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে এশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বন্দর ও জ্বালানি ব্যবসায় একচেটিয়াভাবে প্রতিষ্ঠা করছে আধিপত্য। মিয়ানমারের সঙ্গে চীন, থাইল্যান্ড ও জাপানের মতো দেশগুলোর সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকার কারণে বেড়েছে এসব দেশের বাণিজ্যিক তৎপরতা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মিয়ানমার ৫৪০ কোটি ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে চীন ও হংকংয়ের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ডলার, যা মোট বিনিয়োগের ৫৫ শতাংশ। 

বহুমাত্রিক সামাজিক প্রতিবন্ধকতাগুলো বিশ্বায়ন নিয়ে বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালছে। আন্তঃবাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকির উত্থান ব্যবসাগুলোকে মহামারী-পরবর্তী বিশ্বে নতুনভাবে তৈরি করছে। জলবায়ু সংকট, অর্থনীতি এবং মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এ ঝুঁকির মধ্যেই পড়ে। ডিগ্লোবালাইজেশন নিয়ে বিতর্ক যে নেই, তা নয়। তার পরও সামনের বছরগুলোয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রাখতে গিয়ে দেশগুলোয় ডিগ্লোবালাইজেশনের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। হয়তো ডিগ্লোবালাইজেশন এখনো পুরোপুরিভাবে বিশ্বায়নকে উৎখাত করেনি। তবে বিশ্বায়ন যে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, সেটাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

কিছু দেশ বিশ্বায়ন থেকে অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ধারা যে অসম রয়ে গেছে, তা কারো কাছেই অস্পষ্ট নেই। দেশগুলোর মধ্যে বর্ধিত বৈষম্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জিডিপি, মূল্যস্ফীতির হার এবং ব্যবসায়িক কার্যকলাপের মতো অর্থনৈতিক সূচকগুলো নতুন নির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।

ডিগ্লোবালাইজেশন চিহ্নিতকারীর মধ্যে রয়েছে মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্যের বাধা। সে বাধার দুটি রূপ হলো ট্যারিফ ও কোটা। এর মাধ্যমে সরবরাহ চেইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ করা যায়, হচ্ছেও তাই।   এক দশকে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে স্থানীয়করণ ঘটেছে। ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে বেড়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। প্রাসঙ্গিক হিসেবে ভারতের উদাহরণ সামনে আনা যায়।  কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখেছে ভারত। ২০২১-২২ সালের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ভারতে। ইউরোপীয় ও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ সাড়ে ৬ হাজার কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে গত বছর চীনের বিদেশী বিনিয়োগ নেমে এসেছে ২ হাজার কোটি ডলারে। অথচ দেশটিতে ২০১৮ সালেও বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার কোটি ডলার। ভারতের এ উল্লম্ফনে অন্য অনেক কারণের একটি চীন-মার্কিন ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন। পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামে ব্যবসা স্থানান্তর করছে। একইভাবে ভারতের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের বড় মন্ত্র দেশটির সরবরাহ চেইনে স্থানীয়করণ নীতি। 

মহামারী ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সরবরাহ চেইনে পরিবর্তন ঘটলেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার ঘটেনি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ডাটা থেকে দেখা যায়, বছরের শুরুর দিকে উন্নত অর্থনীতিগুলোয় গড় সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে, যা প্রভাব ফেলেছে মূল্যস্ফীতির ওপর।

সরবরাহের গতি নিয়েও এখনো সব মহলে উদ্বেগ বিদ্যমান। নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় নির্মাতারা ২০২৩ সালের গোড়ার দিকে কাঁচামাল আমদানি এক দশকের সর্বনিম্ন স্তরে নিয়ে এসেছে। এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য শুভ নয়। চাহিদা কমার পাশাপাশি কমেছে ইনভেন্টরি। উৎপাদনকারীরা দুই বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে আসার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে বৃহত্তর চিত্রটি উদ্বেগজনক। ভূরাজনৈতিক শৃঙ্খলা আরো অনিশ্চিত। ক্রমে দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরির মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অন্যের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করেছে। আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার এবং আরো ব্যাপক বাণিজ্য চুক্তির দিকে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করা সত্ত্বেও উভয় পক্ষের অনেক শুল্ক বহাল রয়েছে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জলবায়ু ঝুঁকি এবং বাণিজ্যের মতো বৈশ্বিক বিষয়গুলোয় সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে, তবে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এখনো জটিল। আগামী বছরগুললোয় সে সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হবে, তা ডিগ্লোবালাইজেশনের প্রবণতার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। বাণিজ্যের চারপাশে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো একটি অনিশ্চিত এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে, যা বিশ্ববাজারের জন্য অনুকূল নয়।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন পূর্ব ইউরোপের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করেছে, এ অঞ্চলের বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং শক্তি প্রবাহকে ব্যাহত করেছে। এটি বাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য বড় আঘাত। পাশাপাশি এটি বিশ্বায়ন থেকে পশ্চাদপসরণের দিকে পরিচালিত করেছে। দেশগুলো অভ্যন্তরীণ স্থিতিস্থাপকতা ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বেইজিং, ব্রাসেলস, মস্কো, রিয়াদ ও ওয়াশিংটন ডিসিতে জ্বালানি তেলের দাম এবং সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারণের সিদ্ধান্তে জ্বালানি তেলসংশ্লিষ্ট ভূরাজনীতি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর উপর্যুপরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পাশাপাশি চীন মহামারী-পরবর্তী বিধিনিষেধ তুলে নেয়ায় আগামী বছরগুলোয় জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়বে, যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে পরবর্তী ভূরাজনৈতিক সমীকরণে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। জি৭-ভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাইস ক্যাপ (মূল্য বেঁধে দেয়া) করেছে, যার প্রভাব এর মধ্যেই দৃশ্যমান। এর ফলেই ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে। উচ্চমূল্য ২০২৩-২৪ সালের শীতকালজুড়ে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের দিকে মূল্য কিছুটা কমতে পারে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউরোপের বাইরের দেশগুলোকেও বাধ্য করেছে বৈশ্বিক ঝুঁকি নিয়ে ভাবতে। পারমাণবিক বিস্তার, সাইবার অপারেশন, অবকাঠামো স্থিতিস্থাপকতা এবং নিরাপত্তা জোটের ভবিষ্যৎ পুনর্বিবেচনা করতে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই বিশ্ব ডিগ্লোবালাইজেশনের পথে হাঁটছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট অনেককেই গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিয়ে সন্দিহান করে তোলে। কিছু সরকার রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করতে থাকে। এক্ষেত্রে বিশ্বায়নের বিপরীতে হাঁটার প্রবণতা জোগান দিয়েছে। মহামারী তাতে পালন করেছে নিয়ামকের ভূমিকা। যদিও বিশ্ব এখন মূল্যস্ফীতির ক্ষত থেকে কাটিয়ে ওঠার পথে হাঁটছে। একই সময়ে ডিগ্লোবালাইজেশনের প্রবণতা এগিয়েই চলছে। 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক ও সংবাদকর্মী