২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে  বেঁচে যান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বাংলাদেশ টেলিভিশনে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেদিনের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আপনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের একটি সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এক ডজনেরও বেশি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এ হামলায় আপনি রক্ষা পেলেও দলের ২২ নেতাকর্মী সেদিন নিহত হন। আহত হন প্রায় ৫০০ মানুষ। পেছন ফিরে তাকালে আপনার কী অনুভূতি হয়?

শেখ হাসিনা: দেখুন, বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের আমলে সারা দেশে সন্ত্রাসের অভায়রণ্য তৈরি হয়েছিল, একটা রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, বোমা হামলা এটা যেন প্রতিনিয়ত চলছিল। বিএনপির ২০০১ থেকে শুরু করে এসব ঘটনা ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট যখন সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজারে গ্রেনেড হামলা করা হয় এবং সেখানে তিন-চারজন মারাও যান আর ব্রিটিশ হাইকমিশনার সেই গ্রেনেডে আহত হন। কূটনীতিকের ওপর হামলা করা এবং আহত করা, এটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিদেশে খুব খারাপভাবে নষ্ট করে। আমরা একটি সন্ত্রাসবিরোধী র্যালি করার সিদ্ধান্ত নিই এবং যখন এই র্যালি করছিলাম তখন অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি সরকার অনুমতি দেয়নি। আমরা মুক্তাঙ্গনে করতে চেয়েছিলাম। ওরা দেয়নি, কিন্তু যখন আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে আমরা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনেই করব। তখন আগের দিন রাতে ১১টা-সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ তারা আবার পারমিশন দেয়। তখন আমাদের মাইকটাইক লাগানো হয়ে গেছে, পোস্টার ছাপানো, প্রচার সবকিছু হয়ে গেছে। তা আমরা ওখানেই আমাদের সমাবেশটা করি।

ওই সমাবেশে আমি যখন যাই, বক্তব্য রাখি। মানে বক্তব্য শেষ করে আমি মাইকটাও হাত থেকে রাখতে পারিনি। এরই মধ্যে এই বোমার আওয়াজ। বোমার আওয়াজটার সাথে সাথে আমাদের নেতাকর্মীরা আমাকে ধরে বসিয়ে দেয়।

বিশেষ করে হানিফ (সাবেক মেয়র মো. হানিফ) ভাইয়ের কথা আমি বলব। তাছাড়া মামুন, আমার সাথে কাজ করত অজিত, মায়া, ওরা সবাই ওখানে ছিল। ট্রাকের ভেতরেই তখন আমরা। আমাকে একদম ঘিরে রাখে। একটার পর একটা গ্রেনেড, প্রথমে তিনটা, তারপর আবার তিনটা, এভাবে এক ডজনের কাছাকাছি গ্রেনেড তারা ছুড়ে মারে। সত্যি বলতে কি, তখন আসলে নিজের কথা ভাবার চেয়ে আমার চিন্তা ছিল, এতগুলো মানুষ আমার ট্রাকের ওপরে আর আশপাশে আমাদের নেতাকর্মীরা সবাই। সে সময় কার যে কী অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছি না।

যা হোক, একটা পর্যায়ে যখন গ্রেনেড হামলা কিছুটা থামল। আমাকে যে গ্রেনেড মেরেছিল তার স্প্লিন্টারগুলো বিশেষ করে হানিফ ভাই, তখন ঢাকা সিটি মেয়র, আমাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল, সমস্ত স্প্লিন্টার তার মাথায় পড়ে, গায়ে পড়ে। তার সেই রক্ত আমার শরীরে, মানে আমার কাপড়ে চলে আসে। সবাই মনে করে যে আমি মনে হয় আহত। আমি বলি, না আমার কিছু হয়নি। এটা আমার কাছে একটা বিস্ময় যে আমার গায়ে একটাও স্প্লিন্টার লাগেনি। কিন্তু আমার চশমাটা হারিয়ে যায়।

যে মুহূর্তে গাড়িতে উঠতে যাব, দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল আমার সাথে একজন সেনা কর্মকর্তা মাহবুব। ও ছিল আমার ড্রাইভার কাম সিকিউরিটি। ও গেটটা খুলে দাঁড়ায়। আর ঠিক সে সময় গুলি একটা চলে আসে। সেখানে মাহবুব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউ দিয়ে যখন চলে আসছি, সে সময় পুলিশ ওখানে লাঠি চার্জ শুরু করে এবং টিয়ার গ্যাস মারে। সেটা আমি পরে জানতে পেরেছি, তখন জানতে পারিনি। কথা হচ্ছে যে এ রকম মৃত্যুর মুখে দাঁড়ানো। এটা জানি না...আমি কখনো নিজের কথা ভাবিনি। আমি জানি, মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে।

সন্ত্রাসবিরোধী সভা, সেখানেই আমরা সন্ত্রাসের শিকার হলাম। এই সন্ত্রাসটা এমন যেটা মনে হলো, সাধারণত আমরা মিটিং করতে গেলে সরকার থেকে পুলিশ ঘেরাও করে রাখে, কর্মীদের আসতে বাধা দেয়। কিন্তু সেদিন কোনো প্রস্তুতি নেই।

আরেকটি কথা, আমাদের পার্টির ভলান্টিয়ার যারা, সবসময় আমাদের মিটিংয়ে প্রত্যেকটা ছাদে চলে যায়। সেদিন কিন্তু কাউকে যেতে দেয়নি। পুলিশ বাধা দিয়েছে। অনুভূতির কথা আমি এটুকুই বলব, আল্লাহ হয়তো আমার জীবনটা বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ আগেও তো আমি বেশ কয়েকবারই এ ধরনের হামলার শিকার হয়েছি। হয়তো আমার হাত দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের কোনো কল্যাণ তিনি করবেন, এজন্যই বুঝি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এছাড়া আর কী?

এ হামলা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। যেভাবে এর ছক কষা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে পুরো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য হামলা করা হয়েছে। এ জিঘাংসার কারণ কী?

শেখ হাসিনা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সংগঠনটা গড়ে তুলেছিলেন এবং এ সংগঠন করার জন্য তিনি মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র দরকার, একটা আত্মপরিচয় দরকার। যখনই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, তাকে কিন্তু গ্রেফতার করা হলো এবং পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকেও হত্যার একটা প্রচেষ্টা তো বহুদিন ধরেই ছিল। তার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া। এ আওয়ামী লীগকে নিয়েই তিনি বাংলাদেশের মানুষকে সুসংগঠিত করেছেন, আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় অর্জন করেছেন। যারা আমাদের স্বাধীনতা চায়নি, স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল, যারা পাকিস্তান সরকারকে সাপোর্ট করেছে বা পাকিস্তান সরকারের পদলেহন করত, তারা তো কখনো এ দেশের স্বাধীনতাই চায়নি। আওয়ামী লীগের ওপর তাদের ক্ষোভ এজন্য যে আওয়ামী লীগ সংগঠনটাই তো এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার আন্দোলন সংগ্রাম বিজয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগ প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। পাকিস্তানিরা পরাজিত হয়। কাজেই সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ তারা নিতে চেয়েছে। এজন্যই।

তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায়। হামলা-পরবর্তী সময়ে তাদের আচরণ ছিল অত্যন্ত অমানবিক। বিশেষ করে তখনকার সরকারপ্রধান খালেদা জিয়া, তার কথাবার্তা, আলামত নষ্ট করা, তদন্তের নামে প্রহসন, জজ মিয়া নাটক ইত্যাদি। তাদের এ আচরণকে আপনি কীভাবে আখ্যায়িত করবেন?

শেখ হাসিনা: দেখুন, খালেদা জিয়ার একেকটা বক্তৃতার মধ্য দিয়ে কিন্তু একেকটা মেসেজ যায়। সে যখন বক্তৃতা দিল যে আওয়ামী লীগ ১০০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আরেকবার আরেকটা বক্তৃতায় বলল, ঠিক এই ২১ আগস্টের আগে, প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, কোনোদিন বিরোধীদলীয় নেতাও হতে পারবে না। এই যে তার বক্তব্য, এর থেকেই তো বোঝা যায় যে তাদের উদ্দেশ্যটা কী ছিল। এর সাথে যে সরকারের সবাই জড়িত ছিল এটা তো খুব স্পষ্ট। তার কেবিনেটের মন্ত্রী সালাম পিন্টু, সে এর সঙ্গে জড়িত। তখন ডিজিএফআই-এনএসআই কর্মকর্তা, পুলিশের কর্মকর্তাদের নিয়েই এ চক্রান্তটা করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, তার ছেলে তারেক রহমান। সে তো দীর্ঘদিন এই ষড়যন্ত্র তৈরি করা এবং এটাকে কার্যকর করাতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই তার পেছনে ছিল এবং সমর্থন দিয়েছে।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, এ ঘটনার আগে তারেক জিয়া কিন্তু ৫ নম্বর রোডে তার যে শ্বশুরবাড়ি, সেখানে অবস্থান করেছে অনেকদিন বা কয়েক মাস। ঠিক আগস্টের আগে সে সেই বাড়ি ছেড়ে চলে যায় ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে। আমার মনে সন্দেহ ছিল, এখানে বসে সে কিছু একটা ঘোট পাকাচ্ছে। যেমন রমনা বটমূলে যে বোমা হামলা, সেটা। তারপর উদীচীর মিটিংয়ে বোমা হামলা, এ রকম অনেকগুলো বোমা হামলা এবং আমাদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা। এ হামলাগুলো যে হচ্ছিল সে সময় কিন্তু তারেক রহমান ওখানে। হাওয়া ভবন মানে যত দুর্নীতির আখড়া আর যত রকম চক্রান্ত, সব সেখানে বসে বসে করা, এটাই ছিল তার কাজ।

হামলার পর একটি গ্রেনেড যেটা বিস্ফোরিত হয়নি, একজন সেনা অফিসার সেটা নিয়ে যায়। তার একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল যে এটা রেখে দিতে হবে। কারণ এটা কেসে কাজে লাগবে। কিন্তু আমি শুনেছি যে এটা শোনার পরই খালেদা জিয়া নিজে ধমক দিয়েছে যে এটা করা যাবে না। এটা যেন ধ্বংস করে দেয়া হয়। সিটি করপোরেশন থেকে গাড়ি নিয়ে এসে ওই জায়গাটা ধুয়ে-মুছে সবকিছু পরিষ্কার করে ফেলা হয়, সব আলামত সরিয়ে ফেলে। সাধারণত এ রকম কোনো ঘটনা ঘটলে সেখানে পুলিশ যায়, সব আলামত সংগ্রহ করে। কিন্তু তাদের সে রকম কোনো প্রচেষ্টা ছিল না, বরং সব আলামত ধ্বংস করে ফেলা ও মুছে ফেলার চেষ্টা এবং এটা যখন তারা করে তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যুবলীগে তখন নানক ছিল, আজম ছিল, আমাদের ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, তাদের বললাম সব ধ্বংস করে দিচ্ছে, তোমরা তাড়াতাড়ি এগুলো সংরক্ষণ করো। যেখানে যেখানে গ্রেনেড পড়ে ছিল, ওরা তখন গিয়ে সেগুলো অন্তত চিহ্নিত করে।

এরপর একটা তদন্ত কমিশনের নামে তখন একটা তামাশা করা হলো। তারা বলল, পাশের দেশ থেকে এসে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আমাদের দলের এতজন এমপি আহত। আইভি রহমান তিনি নিহত হয়েছেন। তাছাড়া আরো অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আমরা যারা ছিলাম, কথা বলতে চেয়েছি, কথা বলতে দেয়নি পার্লামেন্টে। এটা নিয়ে আলোচনাই করতে দেবে না। খালেদা জিয়া তো বলেই বসল, ওনাকে আবার কে মারতে যাবে। তার ও তার নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, উনি তো নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার হাতে তো ভ্যানিটি ব্যাগ ছিল না। আমি তো ব্যাগ ছাড়াই মঞ্চে উঠেছি। গ্রেনেডটা আমি নিলাম কীভাবে? আর গ্রেনেড মারতে এত পারদর্শী কীভাবে হলাম? আর এটা হলো আর্জেস গ্রেনেড। যেটা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং এটা পাকিস্তান থেকেই আসা। এটা তো পরে বের হয়েছে। কাজেই সবকিছুতে তাদের সম্পৃক্ততা, এতে তো কোনো সন্দেহ নেই। ওইদিন খালেদা জিয়া কোথায় ছিল? খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া কিন্তু ঢাকায় ছিল না। একজন লক্ষ্মীপুরে আরেকজন গোপালগঞ্জে। দিনের বেলা একটা রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য জনসভায় হামলা, আমার মনে হয় এটা পৃথিবীতে কোনোদিন হয়নি। এটা ছিল একটা রণক্ষেত্র। যুদ্ধক্ষেত্রে যা ব্যবহার করে তা তারা ব্যবহার করল সাধারণ মানুষের ওপর, একটা দলের ওপর।

ওইদিন যদি আপনাকে হত্যা করা হতো, বাংলাদেশের অবস্থা হতো আফগানিস্তানের মতো। মৌলবাদীরা দেশ দখল করত। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা, অসাম্প্রদায়িক বাংলার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত। আপনার অভিমত কী?

শেখ হাসিনা: সবাই এটা বিশ্বাস করে। তার কারণ খালেদা জিয়ার আমলে যেভাবে সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়া হয়েছে। রাজশাহীতে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে বাংলা ভাই, তারা মিছিল করছে। আর পুলিশ তাদের পাহারা দিচ্ছে। আর বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তাদের মদদ দিচ্ছে। নাটোর-রাজশাহীর বহু নেতা প্রকাশ্যে এদের মদদ দানকারী। পরবর্তীতে আপনি দেখেন, জঙ্গিবাদ যেভাবে, কিবরিয়া সাহেবকে একটি জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে হত্যা করা হলো। সুরঞ্জিত সেনের মিটিংয়ে বোমা হামলা। সিলেটে কামরানের মিটিংয়ে আরেকবার বোমা হামলা। এভাবে তো সারা বাংলাদেশে চলছিল। একটা দিনে সারা বাংলাদেশে ১৭ আগস্ট ৫০০ জায়গায় বোমা হামলা হলো। ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩টিতেই কিন্তু বোমা হামলা হয়েছে। ঢাকা সিটিতে ৩৫টা জায়গায় বোমা হামলা হয়েছে। ঠিক ১১টার দিকে আমি ফোন পেলাম, দিনাজপুর থেকে আমাদের এক কর্মী ফোন করেছে যে আপা আমাদের এখানে বোমা হামলা। সাথে সাথে ঢাকাসহ আরো কয়েক জেলা থেকে ফোন আসছে, গোপালগঞ্জ থেকেও। সেখানেও বোমা হামলা। এ কথা শুনেই আমার যাওয়ার কথা ছিল দুপুরের পর, আমি সাথে সাথে রওনা হয়ে গেলাম, ঢাকায় আসার। একটা বিষয় লক্ষ করতে বলি, একমাত্র মুন্সীগঞ্জে কিন্তু বোমা হামলা হয়নি। আমার কিন্তু মুন্সীগঞ্জ দিয়েই আসার কথা ছিল। আমি এসেছিলাম মুন্সীগঞ্জ দিয়েই, এটা ঠিক। কিন্তু ওরা সময়টা হিসাব করতে পারেনি। আমার রওনা হওয়ার কথা টুঙ্গিপাড়া থেকে বিকাল ৩টা-৪টায়, মুন্সীগঞ্জ পৌঁছতে ৫-৬টা বাজবে। এ খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি সাড়ে ১১টায় রওনা হয়ে গিয়েছি। আমাকে অনেকেই মানা করেছিল যে ঢাকায় সব জায়গায় বোমা, কোথায় যে বোমা পড়বে, আপনি এ সময় মুভ করবেন না, আপনি থাকেন। আমি বললাম, আমাকে ঢাকায় যেতেই হবে। আমাকে থাকতেই হবে ঢাকায়, কারণ এতগুলো জেলা থেকে ফোন আসছে। একটার পর একটা ফোন আসছে সব জেলা থেকে। এ সময় তো আমার ঢাকায় থাকতেই হবে, না হলে তো আমি কিছু করতে পারব না। আমি সরাসরি রওনা হয়ে চলে আসি। এটা যদি কেউ চিন্তা করে, সব জেলায় হলো এখানে হলো না। কারণ নিশ্চয়ই তাদের একটা প্ল্যান ছিল। যখন আসব, পার হব, সেখানেই হবে বা কিছু করবে। আমার যেহেতু ফেরি ধরার কথা, আমার জন্য বিশেষ ফেরি থাকত, কাজেই সে হিসাব নিশ্চয়ই তাদের কাছে ছিল।

আমি এসেছি, সাধারণ রাস্তা দিয়ে যেভাবে আসে তা না করে বিডিআরের ভেতর দিয়ে এসে আমি সুধা সদনে ঢুকি। বিএনপি আমলে তো একটা সন্ত্রাসী দেশ করেই ফেলেছিল এবং বহু লোক চলে যায় আফগানিস্তানে, ট্রেনিং নিয়ে আসে। এই মুফতি হান্নান নিজেই তো ট্রেনিং নিয়ে আসে। তারপর তাজউদ্দিন আরেকজন যে, সেও তো ট্রেনিং নিয়ে আসে। এরা তো সব বিএনপির লোক, তাজউদ্দিন তো বিএনপির খাস।

গ্রেনেড হামলার পরপর ওইদিন রাত ১টার সময় চারজনকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তুলে দেয়া হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় তারা চলে যায়। সেখানে কিন্তু ডালিম আর রশিদও ছিল। জাতির পিতা হত্যার সাথে যে জিয়াউর রহমান জড়িত এবং তার স্ত্রী যে তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে, ছেলেকেও একই পথে নামিয়েছে, এটা তো স্পষ্ট।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুধু ২১ আগস্ট নয়, আপনাকে হত্যার জন্য ২০-২২ বার হামলা করা হয়েছে। এই যে এতবার আপনার ওপর হামলা, এত আক্রোশ কেন আপনার ওপর? এরা কারা?

শেখ হাসিনা: একাশি সালে বাংলাদেশে পা দেয়ার পর আমি যেখানেই গেছি, আমাকে বাধা দেয়া হয়েছে। আমি যখন খুলনা থেকে রাজশাহী রওনা হলাম, এত মানুষ, মানুষের ঢল সব জায়গায়। এর কারণ ১৫ আগস্টের পর মানুষ কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু আমি আসার পর মনে হলো মানুষের একটা যেন জোয়ার চলে এল। পথে পথে মিটিং করতে করতে আমাদের এত সময় লাগল যে রাত ১১টার দিকে আমি ঈশ্বরদীতে গিয়ে মিটিং করি। নাটোরে ঢুকব, সেখানে আমার মঞ্চ ভেঙে দিল, আগুন দিয়ে পোড়াল, আমাদের নেতাকর্মীদের এখানে-ওখানে মেরে ধানখেতে ফেলে রেখে দিল। এটা আমি যখন এসেছি সেই সময়ে। আমি মে মাসে এসেছি, এটা মনে হয় জুন মাসের ঘটনা। এভাবেই কিন্তু সবসময় তারা আমাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

১৫ আগস্টের পর তো আমাদের দেশে আসতে দেয়া হয়নি। জিয়াউর রহমান রেহানার পাসপোর্টটাও করতে দেয়নি। যেহেতু আমি দিল্লিতে ছিলাম, সেখানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন শাসছুর রহমান সাহেব, আমাদের পাসপোর্টটা তিনি রিনিউ করে দিয়েছিলেন। আমরা যাতে দেশে আসতে না পারি সে বাধা ছিল। তারপর আওয়ামী লীগ যখন আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে, আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফিরে আসবই। তার পর থেকে স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী, যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এ শক্তিটাই তো জিয়াউর রহমানের আমলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমাদের সংবিধান, যেটা জাতির পিতা আমাদের উপহার দিলেন, মাত্র নয় মাসে সেখানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এগুলো তো উল্লেখ করা ছিল। তখন এসে গেল মার্শাল ল, সেটা তো আর গণতন্ত্র না। কাজেই গণতন্ত্রও গেল, সমাজতন্ত্র গেল, ধর্মনিরপেক্ষতাও গেল, সবই গেল। এই যে পরিবর্তনটা, এটা কাদের খাতিরে করা?

জিয়াউর রহমান তো পাকিস্তান আর্মিতে জয়েন করেছিল। তার বাবা-মার কবরও কিন্তু পাকিস্তানে। তারা ইন্ডিয়া থেকে পাকিস্তানেই চলে এসেছিল, বাংলাদেশে কিন্তু বিশ্বাস করত না। এটা হলো বাস্তবতা। তার সাথে আমাদের যারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, তাদেরই তো রাজত্ব হয়ে যায়। তারাই দেশ চালায়। লাখো শহীদ যে আদর্শ নিয়ে রক্ত দিল, সেটা তারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করল। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাসই তো বিকৃত করা হয়েছিল। আমি আসার পরে স্বাভাবিকভাবে সে বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। সেই আদর্শ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত করে দেশ যেন মর্যাদাপূর্ণ দেশ হয় সে চেষ্টা করেছি। আর এদের প্রচেষ্টা ছিল বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আর যেন কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। স্বাধীনতাটা যেন অর্থবহ না হয়। এটাই তো আসল উদ্দেশ্য ছিল। এটাই তো তাদের মূল। আর আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। মাত্র ১২ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে পারি। জাতির পিতা যদি বেঁচে থাকতেন, আরো ৪০ বছর আগেই আমরা সেটা করতে পারতাম। আমি এসে সে আদর্শ নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু তারা তো সেটা চায়নি।

সেই সময় কিন্তু একটা স্লোগান চলত বাংলাদেশে। আমি কোট করছি, ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। আজকে আফগানিস্তানের অবস্থাটা তারা দেখুক যে সেখানে কী অবস্থা। তারা সে বাংলাদেশে করতে চেয়েছিল। এটা হয়তো আমরা আছি বলে সে দেখেনি। আমাদের তরুণ সমাজকে আমি বলব, ইতিহাস আর শিকড়ের সন্ধান করে, আদর্শ নিয়েই চলতে হবে, যাতে লাখো শহীদের রক্ত বৃথা না যায়।

বারবার আঘাত এসেছে, সেই একাশি সালে দেশের মাটিতে নামার পর থেকেই আমার ওপর হামলা হচ্ছে। আর আল্লাহ আমাকে কীভাবে যেন বাঁচিয়ে দিচ্ছেন। আল্লাহ তো সবার জন্য কিছু কাজ লিখে দেয়, হয়তো কিছু আমার ওপর এ দায়িত্বটা আছে। এই বাংলাদেশের যে মর্যাদাটা হারিয়ে গেছে, সেটা ফিরিয়ে দেয়া আর গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য আমার আব্বা যে কিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন সেটা যেন হয়। এটাই বোধহয় আল্লাহর ইচ্ছা। সেটা যেন আমার হাত দিয়ে হয়। এই যে আমি যতটুকু সফলতা অর্জন করছি বা যতটুকু বাংলাদেশের জন্য করতে পারছি এটাও আমি মনে করব, একদিকে আমার দল আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণ ও উপরে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের ইচ্ছায়।

আল্লাহ যতদিন হায়াত দিয়েছেন ততদিন বেঁচে থাকব। মৃত্যু তো অবধারিত। একবার যখন জন্মেছি মরতে হবে। আজকে মরি কালকে মরি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ জীবন দিয়েছেন তিনি যেদিন জীবন তুলে নেবেন, কাজেই আমার এটা নিয়ে চিন্তা নেই। আমি একটাই চিন্তা করি, সকালে উঠে ভাবি একটা দিন পেলাম, অন্তত দেশের জন্য একটু কাজ করতে পারলাম।