ঔপনিবেশিক
শাসন ও শোষণের হাত থেকে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে যে সকল তরুণ বিপ্লবী দেশপ্রেমিক
নিজেদের জীবনকে হাসি মুখে উৎসর্গ করেছেন, আশফাকউল্লাহ খান
তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভারতীয় মুসলিম যাকে ব্রিটিশ রাজের
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফাঁসি দেয়া হয়। লখনৌর অদূরে কাকরি নামক স্থানে এক
ট্রেন ডাকাতির মামলায় ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদ কারাগারে
তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র সাতাশ।
আশফাকউল্লাহ
খান ১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুর শহরে এক সম্ভ্রান্ত পাঠান
পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শফিকউল্লাহ খান ছিলেন জমিদার, আর মাতা মাজহার উন নিসা ছিলেন একজন ধার্মিক গৃহকর্ত্রী। এই পরিবারের সঙ্গে
সংশ্লিষ্ট সকলেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং অনেকেই ব্রিটিশ ভারতের পুলিশ ও
প্রশাসনিক পদে কর্তব্যরত ছিলেন। তাঁর পরিবার চেয়েছিল পড়াশোনা শেষ করে তিনিও সরকারি
কর্মকর্তা হবেন; তবে ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য কিছু নির্ধারণ করে
রেখেছিল।
বাড়িতেই
প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ সমাপ্ত করার পর তাঁকে শাহজাহানপুরের অ্যাবি রিচ মিশন উচ্চ
বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীন তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত
বিপ্লবী রাম প্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে, যিনিও সেই সময় একই
বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে ছিলেন। একজন
পুরোদস্তুর বিপ্লবী হিসেবে বিসমিল তখন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সাহসী
এবং উদ্যমী যুবাদের খুঁজছিলেন। আশফাকউল্লাহ খানের মধ্যে একজন আদর্শ বিপ্লবীর সকল
গুণাবলী তিনি দেখতে পান। আশফাক নিজেও সেই সময় একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক পথপ্রদর্শকের
সন্ধানে ছিলেন, বিসমিলের মধ্যে যাঁর মূর্তিমান রূপ তিনি
দর্শন করেন। ফলত, এই দুই মহান বিপ্লবীর যুগল মিলন ঘটে,
হিন্দু-মুসলিম বিভেদের রাজনীতির বিপরীতে যা হয়ে উঠে ঐক্যের এক অনন্য
দৃষ্টান্ত। পণ্ডিত রাম প্রসাদ বিসমিল ছিলেন আর্য সমাজের অনুসারী হিন্দু, আর আশফাকউল্লাহ খান ছিলেন পাক্কা মুসলমান। এই ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য
তাঁদের বন্ধুত্বের পথে অন্তরায় হতে পারেনি, বরং পরস্পরের এই
ভিন্নতার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাশীল থেকে জন্মভূমির স্বাধীনতার অভিন্ন লক্ষ্যে তাঁরা
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে গিয়েছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ফৈজাবাদ কারাগারে
যেদিন আশফাকউল্লাহর ফাঁসি কার্যকর করা হয়, সেদিনই উত্তর
প্রদেশের আরেক শহর গোরখপুরের কারাগারে তাঁর চাইতে তিন বছরের বড় রাম প্রসাদ ফাঁসির
দড়িকে বরণ করে নেন।
যে
মামলায় আশফাকউল্লাহ খান ও রাম প্রসাদ বিসমিলের ফাঁসি হয়, ইতিহাসে তা 'কাকরি ট্রেন ডাকাতি মামলা' এবং 'কাকরি ষড়যন্ত্র মামলা' নামে
খ্যাত। ১৯২৫ সালের ৬ আগস্ট শাহজাহানপুরে বিসমিলের বাড়িতে বিপ্লবীদের গোপন এক বৈঠক
বসে, যেখানে বিসমিল স্বয়ং, আশফাকউল্লাহ
খান, শচীন্দ্রনাথ বখশী, চন্দ্রশেখর
আজাদ, মন্মথ নাথ গুপ্ত, রাজেন্দ্র
লাহিড়ী প্রমুখ বিপ্লবীগণ উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিপ্লবের আর্থিক যোগান নিশ্চিত করার
জন্য বিসমিল সরকারি কোষাগারের একটি বাক্স লুট করার প্রস্তাব দেন, যেটি ট্রেনে করে শাহজাহানপুর থেকে লখনৌ পাঠানো হচ্ছিল। তাঁর এই প্রস্তাব
সিদ্ধান্তে পরিণত হয় এবং সেই মোতাবেক ৯ আগস্ট লখনৌর অদূরে কাকরি নামক স্থানে
শাহজাহানপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া আট নম্বর ট্রেনটি তাঁরা থামান এবং গার্ড ও ড্রাইভারকে
বন্দী করে বাক্সে থাকা নগদ টাকা উদ্ধার করেন। বিপ্লবীদের এই কাণ্ডে ব্রিটিশ সরকার
বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে শাহজাহানপুর ও তার আশে পাশের বেশ কিছু জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে
একমাত্র আশফাকউল্লাহ খান ব্যতীত ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে গ্রেফতার করে। আশফাক
বাড়ি থেকে কিছু দূরে এক আখের ক্ষেতে আত্মগোপন করেন এবং সেখান থেকে পালিয়ে তিনি
কাশী চলে যান। সেখানে তিনি বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় বিপ্লবী বন্ধুদের সাথে
পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা তাঁকে কিছু দিন চুপচাপ থাকার
পরামর্শ দেন। এই বন্ধুদের সহায়তায় তিনি বিহার গিয়ে পৌঁছান। বিহারের পালামৌ জেলার
দৌলতগঞ্জের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে তিনি কেরানীর চাকরি পান। সেখানে নিজেকে তিনি
মথুরার এক কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেন। প্রায় দশ মাস তিনি এই চাকরি
করেন। কিন্তু এ নির্বাসন অসহনীয় হয়ে উঠলে তিনি বিহার ছেড়ে দিল্লি যান এবং
শাহজাহানপুরের এক সহপাঠী পাঠান বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই বন্ধুটি তাঁকে সাদরে
অভ্যর্থনা জানায়, আপ্যায়ন করে, সারা
রাত বসে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে, অতঃপর বিশ্বাসঘাতকতা করে।
পরের দিন পুলিশ এসে আশফাককে গ্রেফতার করে।
থানায়
এবং কারাগারে তাঁর বিচার কার্য চলাকালীন আশফাকউল্লাহ খানকে রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য
নানা ভাবে চাপ দেয়া হয়। তাঁর বন্ধু রাম প্রসাদ বিসমিলের বিপক্ষে তাঁর সাক্ষ্য
আদায়ের জন্য সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণ্য কৌশলেরও আশ্রয় নেয়া হয়। তাঁকে সরকারি চাকরি সহ
নানা ধরনের সুযোগ সুবিধার প্রলোভন দেখানো হয়।সকল কৌশল এবং প্রলোভনের সামনে অটল
অবিচল থেকে আশফাকউল্লাহ খান বলেন- "এই মামলায় আমিই একমাত্র মুসলিম। যদি আমাকে
ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, এই সম্মান একজন মুসলমানই লাভ করবে। এটি
আমার জন্য বিরাট সম্মানের ব্যাপার হবে। আর যদি আমি বিশ্বাসঘাতকতা করি, তাহলে পুরো মুসলিম জাতি তিরস্কৃত হবে। জীবন দিয়ে আমি প্রমাণ করতে চাই যে,
আমি একজন সাচ্চা মুসলমান ছিলাম। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না, দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করাকে ভয় করি।" তিনি তাঁর সহকর্মীদের
বলতেন, "ভাইয়েরা, এই আন্দোলনে
আমিই একমাত্র মুসলমান। দয়া করে আমাকে এই মহৎ উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগের অনুমতি
দিন।"
কাকরী
ষড়যন্ত্র মামলায় পণ্ডিত রাম প্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লাহ খান,
রাজেন্দ্র লাহিড়ী ও রোশান সিংকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিদের যাবজ্জীবন
কারাদণ্ডের রায় দেয় আদালত। এই রায়ে বিক্ষুব্ধ হয় সারা দেশের মানুষ। তারা
মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদ করে। মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে নামিয়ে
আনার জন্য কেন্দ্রীয় আইন সভার ভারতীয় সদস্যগণ ভাইসরয়ের নিকট আবেদন জানান। সেকালের
সর্বোচ্চ আদালত প্রিভি কাউন্সিলেও এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। কিছুতেই কিছু
হলো না। রায় অপরিবর্তিত থাকে।
আশফাকউল্লাহ
খানের উকিল তাঁকে কারাগারে দেখতে আসেন এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চান। আশফাক বলেন, "আমার শেষ ইচ্ছা হল, আপনি দয়া করে আগামীকাল আসবেন এবং
দেখবেন আমাকে কিভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।" তাঁর কথায় উকিল সাহেবের চোখে পানি
চলে আসে। ব্যথিত হৃদয়ে তিনি বলেন, "আপনাকে ফাঁসিতে
ঝুলতে দেখার মত অত সাহস আমার নেই। কিন্তু আপনার কবর আমি বার বার যেয়ারত করব।"
ফাঁসির আগের দিন আশফাক পরিষ্কার জামা পরিধান করে বন্ধুদের বলেন, "আগামিকাল আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। দয়া করে আমাকে জানান বরের মধ্যে কোন খুঁত
আছে কিনা!"
১৯২৭
সালের ১৯ ডিসেম্বর, ভোরবেলা। উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদ
কারাগার। আশফাকউল্লাহ খান সবেমাত্র গোসল করে নামাজ আদায় করলেন। খানিক বাদে তিনি
কোরআন শরিফ পড়া শুরু করলেন। এমন সময় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর কক্ষে আসলেন।
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় হয়েছে। তিনি তাদের সাথে করমর্দন করলেন এবং মঞ্চের দিকে
হাঁটা শুরু করলেন। তাঁর কাঁধে একটি ব্যাগ ঝুলানো ছিল, যেখানে
ছিল পবিত্র কোরআন। তিনি এই পবিত্র গ্রন্থের বিভিন্ন আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন। তাঁর
শ্মশ্রুমণ্ডিত দীপ্ত চেহারা দেখে কারাগারের কর্মচারী এবং ব্রিটিশ পুলিশরাও হতবাক
হয়েছিল। শোনা যায়, তাদের চোখেও নেমে এসেছিল বিষাদের কালো
ছায়া।
'হাসরাত' এবং 'ওয়ারেছি'-
এই দুইটি ছদ্মনামে আশফাকউল্লাহ খান উর্দু ভাষায় কবিতা লিখতেন।
হিন্দিতেও তিনি কিছু কবিতা রচনা করেন। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি এই পংক্তিগুলো
আবৃত্তি করেন, "শহিদোঁ কি মাজারোঁ পর লাগেঙ্গে হার বরস
মেলে/ ওয়াতান পর মরনে ওয়ালোঁ কা ইয়েহি বাকি নিশান হো গা/ বহুত হি জলদ টুটেগি
গুলামি কি ইয়ে জনজিরিঁ/ কিসি দিন দেখনা আজাদ ইয়ে হিন্দুস্তান হো গা।"
(শহীদদের মাজারে প্রতি বছর উৎসব লেগে থাকবে/ দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারীদের এটিই
একমাত্র চিহ্ন হবে/ দাসত্বের এ শেকল শিগগিরই ছিঁড়ে যাবে/ দেখো, একদিন
এই হিন্দুস্তান স্বাধীন হবে)
আজ ২২ অক্টোবর। শহীদ-এ-ওয়াতান আশফাকউল্লাহ খানের জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শুভ জন্মদিন, হে মহান বিপ্লবী।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক










