যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়ামে এড শিরানের ট্যুর অন্যতম শিল্পী ছিলেন ম্যাকলমোর। কিন্তু ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বার্তার জন্য তাকে বাদ দেয়ার ঘটনায় এড শিরান অরাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন। এ পপ গায়ক বলেন, ‘আমরা যদি সব সময় সবচেয়ে জোরে চিৎকার করার দিকেই মনোযোগ দিই, তাহলে কখনোই কোনো পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে।’

তবে ট্যুরের সঙ্গে যুক্ত অন্য সব সংগীতশিল্পীরা দেখিয়ে দিলেন এ নিরপেক্ষতা পুরোপুরি ঠিকঠাক না। শিল্পেরও দায় আছে। ট্যুরের সঙ্গে যুক্ত বিলি আইলিশের ভাই ফিনিয়াস, ডেনিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম, আইরিশ গীতিকার অ্যারন রো এবং শিরানের আইরিশ ব্যাকিং ব্যান্ড বিওগা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ম্যাকলমোরকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তারা ট্যুরের বাকি আয়োজন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

শিরান বলছিলেন, ম্যাকলমোরকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত তার ছিল না। গত সপ্তাহে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মঞ্চে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিলেন ম্যাকলমোর। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি এতে জড়িত নই।’

২০১৪ সালে মঞ্চে একটি পোশাক পরার কারণে ইহুদিবিদ্বেষী ছড়ানোর অভিযোগে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল ম্যাকলমোরকে। তবে এবার লিখেছেন, ট্যুর থেকে তাকে বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফট। বস্টনের বাইরে জিলেট স্টেডিয়ামের মালিকও ক্রাফট। সেপ্টেম্বরে শেষ দিকে সেখানে শিরানের ‘লুপ’ ট্যুরের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে।

ক্রাফট নিশ্চিত করেছেন, জিলেট স্টেডিয়ামে শিরানের আগে পরিবেশনা থেকে ম্যাকলমোরকে তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। তবে অন্য ভেন্যুগুলোয় ম্যাকলমোরকে বয়কটের ব্যবস্থা করার অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এক বিবৃতিতে ক্রাফট বলেন, তার সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ‘নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগকে খাটো করা বা তাদের পক্ষে কথা বলার অধিকার কারো কাছ থেকে কেড়ে নেয়া নয়’; তবে এ ধরনের বক্তব্যে ‘হামাসের দায়বদ্ধতার বিষয়টি আড়াল হওয়া উচিত নয়’।

এড শিরান বলেছেন, নিজের প্লাটফর্মকে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করেন না তিনি। কারণ এটি হওয়া উচিত ‘নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের একটি জায়গা, যেখানে কূটনীতি বজায় রাখা এবং আলোচনা চালু রাখা যায়’।

তবে শিরান যে নিজের পরিচয় ও প্লাটফর্মকে রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য ব্যবহার করেন না এটা পুরোপুরি সঠিক নয়। ২০২২ সালে ‘কনসার্ট ফর ইউক্রেন’-এ অংশ নিয়েছেন তিনি। ব্রেক্সিট নিয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-কে লেখা খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন, জেরেমি করবিনকে সমর্থন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইকুয়ালিটি অ্যাক্ট’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

যেভাবেই দেখা হোক, শিরানের অরাজনৈতিক অবস্থানের পরিণতি দেখায় যে ‘নিরপেক্ষ অবস্থান বলে আসলে কিছু নেই’। বিশেষ করে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি ঘটছে যেখানে করপোরেট ক্ষমতার বাড়াবাড়িকে খুব কমই বাধা দেয়া হয়। ক্রাফট নিজে কি রাজনৈতিক নিরপেক্ষ? তার অন্যতম পরিচয়, তিনি ট্রাম্পের বন্ধু এবং ইসরায়েলের বড় দাতা। ২০১৯ সালে ক্রাফটকে সম্মাননা দেয়া হয়েছিল এক অনুষ্ঠানে। সেখানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের এর চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত বন্ধু আর নেই।’

ট্যুরের অন্য সংগীতশিল্পীদের সিদ্ধান্ত শিরানের অসহায়ত্বের দাবিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। শিরান বলেছেন, শো বাতিল করে ‘ভক্তদের হতাশ করবেন না’ এবং ‘ট্যুরের কর্মী ও অন্য সহশিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের, যারা কাজ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার ওপর নির্ভর করেন, তাদের পরিত্যাগ করবেন না’।

কিন্তু যুক্তিকে উল্টে দিয়েছেন অন্য শিল্পীরা। তারা বুঝেছেন, আর্থিক ও পেশাগত সুযোগ হারিয়ে এবং কিছুটা অসুবিধা তৈরি করাই কখনো কখনো অবস্থান স্পষ্ট করা যায়। গণহত্যা ও স্বাধীন মতপ্রকাশ দমনে বিলিয়নিয়ারদের ভূমিকার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্যও তারা নিজ ইচ্ছায় বেছে নিচ্ছেন।

Hamas responds to Gaza cease-fire plan seeking some changes_thumb

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বক্তব্য দেয়ার পর ‘হিন্দস হল’ গানটি পরিবেশন করেছিলেন ম্যাকলমোর। ২০২৪ সালের ওই গানে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দমনের সমালোচনা করা হয়েছে, বিশেষ করে নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে। গানটির নাম দেয়া হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের নামে। গানে ম্যাকলমোর প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কী ঝুঁকি নিতে রাজি? তুমি কী দিতে রাজি?’

ইসরায়েলের গাজা অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা অনেক শিল্পীই এর আগে কাজ হারানোর কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সুসান সারান্ডন বলেন, তার অভিনয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। আইরিশ পপ তারকা সিএমএটি বলেন, একটি লাভজনক বিউটি ব্র্যান্ডের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সুইডিশ তারকা জারা লারসন বলেন, তাকে ব্র্যান্ড চুক্তি ও পুরস্কার অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

তবু তারা এবং আরো অনেকে কথা বলা চালিয়ে গেছেন। ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে নৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছেন এসব শিল্পীরা। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এরই মধ্যে আনুমানিক ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।

এড শিরানের ট্যুরের সবচেয়ে ছোট পরিসরের সহশিল্পী অ্যারন রো-র হারানোর ঝুঁকিও ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি শিরানকে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া সুযোগের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘কিন্তু আইরিশ মানুষ হিসেবে গণহত্যা, জোর করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি এবং সহিংস দখলদারত্ব সম্পর্কে আমরা খুব ভালোভাবেই জানি। উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং যে স্বাধীনতা আজ আমি আয়ারল্যান্ডে উপভোগ করি, তার জন্য লড়াই করা আমার পূর্বপুরুষদের প্রতি এবং নিজের প্রতি সৎ থাকতে হবে।’

শিরানসহ অনেকে মনে করেন, পপ সংস্কৃতি এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে ভক্তরা কিছুক্ষণের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারেন। ব্রিটিশ সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি, অনেক মানুষই কিছু সময়ের জন্য রাজনীতিকে পাশে রেখে গান উপভোগ করতে চান।’ ডানপন্থী রাজনীতিকদেরও এ অবস্থান নতুন নয়। বরং তরুণদের মধ্যে বিপুল প্রভাব থাকা এবং সাধারণত বামঘেঁষা মতাদর্শের পপ সংস্কৃতির ব্যক্তিত্বদের সত্যিকারের হুমকি হিসেবে দেখেন তারা।

অন্যদিক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, বিষয়টি শুধু শিরানের ট্যুরের শিল্পীদের নিয়ে নয়; বরং ‘মাত্র কয়েকজন স্টেডিয়াম মালিক কীভাবে একটি বিশাল ইস্যু নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দিতে পারেন, এ ক্ষেত্রে গাজায় গণহত্যা নিয়ে’ সেটিই মূল বিষয়।

চলমান বিতর্ক সবচেয়ে খারাপভাবে দেখলে করপোরেট স্বার্থের মুখপাত্র শিরান, যেখানে নিরপেক্ষতার নামে গণহত্যাকে আড়াল করা হচ্ছে। সবচেয়ে ভালোভাবে দেখলে ইচ্ছাকৃতভাবে সরল অবস্থান নেয়া একজন শিল্পী তিনি। কিন্তু অন্য সংস্কৃতির সংগীতের নানা উপাদান নিয়ে তিনি যে বৈশ্বিক ঐক্যের কোমল ছবি তুলে ধরেন, সেই সংস্কৃতিগুলোর বাস্তব জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গেও তাকে যুক্ত হতে হবে। তার নিষ্ক্রিয়তা এবং নীতিবাদী সহশিল্পীদের হাতে অপদস্থ হওয়া এমন এক ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানকে কার্যত অচল করে দিয়েছে, যা হয়তো শুরু থেকেই কার্যকর ছিল না।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত লরা স্নেপসের কলাম অবলম্বনে