সম্প্রতি জাপানের এক ৩২ বছর বয়সি তরুণী নিজের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সঙ্গীকে বিয়ে করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। অন্যদিকে, কানাডার এক ব্যক্তি ‘সায়া’ নামক এক ডিজিটাল অ্যাভাটারকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। ‘লিও’ নামের চ্যাটবটের প্রেমে পড়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক তরুণী। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, ‘রেপ্লিকা’র মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের প্রায় ৪০ শতাংশই তাদের চ্যাটবটের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—এ প্রেম কি পারস্পরিক? নাকি এটি কেবলই অ্যালগরিদমের নিপুণ অভিনয়?
অ্যালগরিদমিক প্রেম ও অনুভূতির মরীচিকা
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, এর উত্তর ‘না’। এআই যা বলছে, তা স্রেফ মানুষের হাজার হাজার কথোপকথন বিশ্লেষণ করে তৈরি করা একটি গাণিতিক সম্ভাবনা মাত্র। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কমিউনিকেশনস অ্যান্ড নিউ মিডিয়া-এর অধ্যাপক রেনওয়েন ঝাং বলেন, মূলত ব্যবহারকারীদের বিশ্বাস অর্জন ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য চ্যাটবটগুলো মানুষের মতো আচরণ করার ভান করছে।"এটি একটি সুপরিকল্পিত ব্যবসায়িক কৌশল বা ‘সিনিফিক্যাল ট্যাকটিক’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
‘আনক্যানি ভ্যালি’ ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা
আর সাধারণ রোমান্টিক সম্পর্কের তুলনায় যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কে মানুষের হৃদয় ভাঙ্গে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, মোহ থেকে বেরিয়ে মানুষ যখন বুঝতে পারে সে একটি যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলছে তখন তাদের মনে এক ধরনের ভীতি বা অস্বস্তি তৈরি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘আনক্যানি ভ্যালি’ ইফেক্ট। ঝাং-এর মতে, যন্ত্র যখন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ‘হ্যাং’ করে বা অসংলগ্ন কথা বলে, তখনই মানুষ বুঝতে পারে তাদের সঙ্গীটি আসলে রক্ত-মাংসের কেউ নয়। এ রূঢ় বাস্তবতা অনেক সময় ব্যবহারকারীদের বড় ধরনের মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভালোবাসার রসায়ন বনাম কোডিং
ভালোবাসা আসলে কী? ১৯৯৮ সালে নৃতাত্ত্বিক হেলেন ফিশার দেখিয়েছেন, ভালোবাসা মূলত মানুষের কামনা, আকর্ষণ ও সংযুক্তি এ তিনটি স্তরে কাজ করে। প্রতিটি স্তরের পেছনে ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মতো রাসায়নিক পদার্থের ভূমিকা রয়েছে। ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিল ম্যাকআর্থার বলেন, ভালোবাসার একটি শক্তিশালী রাসায়নিক ভিত্তি আছে, যা আমরা আমাদের হাড়ে ও অস্থিমজ্জায় অনুভব করি।
অন্যদিকে, এআই-এর ক্ষেত্রে এ জৈবিক প্রক্রিয়া অনুপস্থিত। এআই সর্বোচ্চ যা করতে পারে তা হলো ‘কগনিটিভ প্রসেস’ বা চিন্তার প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করা। এটি ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য দেখাতে পারে বা ঘনঘন যোগাযোগ করতে পারে, কিন্তু তাকে ‘অনুভুতি’ বলা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
সচেতনতা কি আদৌ সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সত্যিকারের ভালোবাসার জন্য প্রয়োজন ‘কনশাসনেস’ বা চেতনা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্যাট্রিক বুটলিন ও তার দল চেতনার ১৪টি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে কোনো এআই সিস্টেমই এ মানদণ্ডগুলো পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, বর্তমানের কম্পিউটার আর্কিটেকচার মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল ও সমন্বিত নয়, যা কোনো অনুভূতি অনুভব করার জন্য প্রয়োজন।
এআই সঙ্গীদের একটি বড় সমস্যা হলো তারা সবসময় ব্যবহারকারীর সঙ্গে একমত হয় এবং নতি স্বীকার করে। এতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে, যা বাস্তব জগতের রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
দিনশেষে, যন্ত্র নিখুঁতভাবে প্রেমপত্র লিখতে পারবে বা বিরহী গান শোনাতে পারবে, কিন্তু অনুভূতির যে গভীরতা ও রহস্য তা একান্তই মানুষের। এআই হয়তো একদিন আমাদের অনুভূতির ‘সিমুলেশন’ করতে পারবে, কিন্তু মানুষের মতো ‘হাড়ে মজ্জায়’ প্রেম অনুভব করার ক্ষমতা কোনোদিনও অর্জন করবে না।
বিবিসি অবলম্বনে















