অ্যালি-মে, বয়স ১৩। টোনার, গ্লো-সিরাম আর ময়েশ্চারাইজার মিশিয়ে স্কিন ‘স্মুদি’ বানিয়ে ত্বকে মাখা, চোখের নিচে কনসিলার, গালে ব্ল্যাশ আর লিপগ্লস লাগানো তার নিত্যদিনের অভ্যাস। এরই মধ্যে স্কিনকেয়ার রুটিনের জন্য টিকটকে বেশ জনপ্রিয় মুখ অ্যালি। আট বছর বয়স থেকে স্কিনকেয়ার পণ্যের কনটেন্ট বানাচ্ছে সে। লকডাউনে মজার ছলে শুরু করা কাজটিই এখন তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অ্যাকাউন্ট রয়েছে, শুধু টিকটকেই ফলোয়ার সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার। কনটেন্ট পোস্ট করে বাৎসরিক ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করে সে।

32d85e50-60d4-11f1-89a3-d1f559421220.jpg

শুধু অ্যালি মে নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় চিলড্রেন অ্যান্ড স্কিনকেয়ার লিখে খুঁজলে ৩-৪ বছরের শিশুদেরও মেকআপ বা স্কিনকেয়ার ভিডিও পাওয়া যাবে। নারীদের লক্ষ্য করে কসমেটিকসের বিপণন নতুন নয়, তবে অতীতে ব্র্যান্ডগুলোর দাগহীন ত্বকের প্রতিশ্রুতিতে তরুণী ও মাঝবয়সী নারীরা আকৃষ্ট হতেন। কিন্তু বর্তমানের শিশুরা নিখুঁত বা ‘ফ্ললেস’ ত্বক পাওয়ার আশায় অ্যান্টি-এজিং উপাদান সমৃদ্ধ জটিল পণ্য ব্যবহার করছে। অনেকে বাবল, ড্রাঙ্ক এলিফ্যান্ট বা পি লুইসের মতো ব্র্যান্ডের অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করছে।

‘পাই’ ব্র্যান্ডের জরিপে দেখা গেছে, ৯-১২ বছর বয়সীদের প্রায় অর্ধেকই তাদের ত্বকের সমস্যা দূর করতে এমন সব পণ্য ব্যবহার করছে, যা তাদের ত্বকের উপযোগী নয়। কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষক ব্রুক এরিন ডাফি বলেন, আগে ৩০-৪০ ঊর্ধ্ব নারীদের বার্ধক্যের ভয়কে কাজে লাগিয়ে পণ্য বিক্রি করা হতো, এখন সে একই মানসিক চাপ কমবয়সী মেয়েদের ওপর ফেলা হচ্ছে।

5000

কসমেটিকোরেক্সিয়া কী?

ডার্মাটোলজিস্টরা ওপর উল্লেখিত প্রবণতার নাম দিয়েছেন কসমেটিকোরেক্সিয়া; যার অর্থ কম বয়স থেকে নিখুঁত ত্বক পাওয়ার এক অস্বাস্থ্যকর মানসিক তাড়না ও কসমেটিকসের অতিরিক্ত ব্যবহার। ইতালির মিলান ইউনিভার্সিটির ডার্মাটোলজিস্ট অধ্যাপক জিওভানি দামিয়ানির গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুরা দৈনিক ১০টি পর্যন্ত ভিন্ন পণ্য ব্যবহার করে এবং মেকআপ ছাড়া পরিবারের সঙ্গেও মেলামেশা করে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সীদের স্কিনকেয়ার রুটিনের গড় খরচ ১২৫ পাউন্ড। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরাও এখন কোরিয়ান ‘গ্লাস স্কিন’ লুক পাওয়ার চেষ্টা করছে। কনসালট্যান্ট ডার্মাটোলজিস্ট ড. জিন আয়ার বলেন, সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, শিশুদের ত্বক এমনিতেই নিখুঁত থাকে। তাদের ত্বক প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত।

এ পরিস্থিতিতে বিউটি জায়ান্ট এলভিএমএইচ’র সেফোরা ও বেনিফিট ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ইতালির সরকার। শিশুদের প্রচ্ছন্ন মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের লক্ষ্য করে কোনো ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে কি না তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাজ্যের এএসএ।

bdd7ebcf2abd75d9246a3615a0ee607f_1000_1100

কোমল ত্বকে মারাত্মক ক্ষতি

ড. আয়ার জানান, কসমেটিকস ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে ব্রণ এবং কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস (এক ধরনের একজিমা) মারাত্মকভাবে বাড়ছে। স্কিনকেয়ার পণ্যগুলোর রেটিনলের মতো অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্টস ত্বকের কোষ প্রতিস্থাপনের গতি বাড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া এমনিতেই দ্রুত ঘটে, ফলে রেটিনল ব্যবহারে ‘রেটিনল বার্ন’ হয়ে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি অল্প বয়সে অতিরিক্ত ফেস ক্রিম ব্যবহারের ফলে কপালের সামনের অংশের চুল পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। কসমেটিকস টয়লেট্রি অ্যান্ড পারফিউমারি অ্যাসোসিয়েশনের জরিপে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানের চেয়ে স্কিনকেয়ার সম্পর্কে কম জানেন।

post-cosmeticorexia

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও মরীচিকা

বিষয়টিকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে ইতালীয় মনোবিজ্ঞানী আলবার্তো স্টেফানা বলছেন, এ শিশুদের আত্মসম্মান বা সেলফ-এস্টিম কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক ও কমেন্টের ওপর নির্ভর করছে, যা তাদের ভবিষ্যতে নিজেদের আসল রূপ মেনে নিতে বাধা দেবে। নিজেদের চেহারার খুঁত নিয়ে তীব্র হীনম্মন্যতা তৈরি করবে, যা একসময় বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডারে রূপ নিতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী স্টেফানার মতে, ফিল্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার ছবিগুলো অবাস্তব। ফলে শিশুরা এমন এক কৃত্রিম সৌন্দর্যের পেছনে ছুটছে, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায় কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার নয়, ব্র্যান্ড ও অভিভাবকদেরও রয়েছে।

বিবিসি অবলম্বনে