এইচবিও চ্যানেলের বিখ্যাত টিভি সিরিজ গেমস অব থ্রোনের ছয়টি নেকড়ের কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। জঙ্গলে মৃত মা নেকড়ের পাশে থাকা ছয়টি নেকড়ে শাবকের প্রতি মায়া আর আদর কাজ করেনি এমন দর্শক হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর বুকে আজ থেকে প্রায় ১০ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল এই ডায়ার উলফ নামের নেকড়ের ভয়ংকর প্রজাতিটি।

তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়োটেকনোলজি কোম্পানি কলোসাল বায়োসায়েন্সেস ঘোষণা দিয়েছে তারা সে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডায়ার উলফ নামক প্রাণীটিকে ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছে। এ যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারটি পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা। খবর এবিসি নিউজ

প্রতিষ্ঠানটি আরো জানায়, তারা চারটি রেড ডায়ার উলফের ক্লোন করতে সফল হয়েছে। এ প্রজাতিটি বর্তমানে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং বনে এর সংখ্যা মাত্র দুই ডজনেরও কম বলে ধারণা করা হয়।

কোম্পানির সিইও এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেন ল্যাম এবিসি নিউজকে বলেন, আমরা কোনো ফাউন্ডেশন, অলাভজনক সংস্থা বা একাডেমিক থিংক ট্যাংক নই। আমরা প্রযুক্তি ও পণ্য তৈরি করছি বাস্তব প্রয়োগের জন্য।

dire-wolf-2

কলোসালের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে টম ব্র্যাডি, টাইগার উডস, প্যারিস হিলটন এবং পিটার জ্যাকসনের মতো ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন।

মার্চে কোম্পানিটি উলি মাউস নামে একটি নতুন ধরনের ইঁদুর তৈরি করার কথা জানায়, যার পশম উলি ম্যামথের মতো ঘন। সেই সঙ্গে ২০২৮ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত আরেকটি প্রাণী উলি ম্যামথ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বলেও জানায় কোম্পানিটি।

এবিসি নিউজের রিপোর্ট অনুযায়ী, টেক্সাসের ডালাসে অবস্থিত কলোসালের গবেষণাগারে ডায়ার উলফকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।

এ শাখার প্রধান বিজ্ঞানী বেথ শাপিরো বলেন, আমার সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ছিল যে এটা সফল হবেই।

তার দল দুটি ডায়ার উলফের জীবাশ্ম থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্স সম্পূর্ণ করে। এরপর এই প্রজাতির সবচেয়ে নিকটাত্মীয় প্রজাতি গ্রে উলফের ডিএনএ ব্যবহার করা হয়।

শাপিরো বলেন, গ্রে উলফের কোষ থেকে আমরা ডায়ার উলফের ডিএনএর অনুরূপ অংশগুলো জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করেছি। গ্রে উলফ আর ডায়ার উলফের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ মিল রয়েছে।

সর্বশেষ সারোগেট কুকুর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ডায়ার উলফের শাবকগুলোর জন্ম হয়। এ প্রক্রিয়ায় কোনো প্রাণীর কোনো ক্ষতি হয়নি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

প্রথম দুটি পুরুষ ডায়ার উলফ শাবক জন্ম নেয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে এবং তৃতীয় মেয়ে শাবকটি ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি জন্ম নেয়। তাদের নাম রাখা হয়েছে রোমুলাস, রেমাস ও খালিসি—রোমান পৌরাণিক কাহিনী ও গেমস অব থ্রোনসের চরিত্র অনুসারে। একটি গোপন দুই হাজার একরের বিশাল প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকায় বসবাস করছে তারা।

শাপিরো বলেন, যখন আমি তাদের জন্মাতে দেখলাম এবং তারা সাদা ছিল, আমার মনে হলো, আমরা পেরেছি। এগুলোই ডায়ার উলফ।

Dire-Wolf-3

তবে সবাই এতে একমত নন। বিখ্যাত নেকড়ে গবেষক ড. জুলি মিচেন, যিনি শাপিরোর সঙ্গেই ২০২১ সালের একটি গবেষণাপত্রে কাজ করেছিলেন, তিনি মনে করেন এ প্রাণীগুলো আসল ডায়ার উলফ নয়।

মিচেন বলেন, আমার মতে, এগুলো ডায়ার উলফ নয়। এগুলো আসলে একটা নতুন কিছু—একটা গ্রে উলফ, যেটার চেহারা ডায়ার উলফের মতো।

তবে শাপিরো এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, যদি এটা দেখতে, ব্যবহারগতভাবে ও পরিবেশগত ভূমিকা অনুযায়ী সে প্রজাতির মতো হয়, তাহলে এটাকে সেই প্রজাতি বলাই যায়।

মিচেন মনে করেন, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার বদলে বর্তমানে বিপন্ন প্রাণীগুলোকেই রক্ষা করা উচিত।

কলোসালের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বেন ল্যাম। তবে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিসিস্ট ও জিনতত্ত্ববিদ ড. রবার্ট ক্লিটজম্যান সতর্ক করে বলেন, জিন নিয়ে নিছক ছেলেখেলার ফলে ঘটতে পারে ভয়ংকর কিছু। আপনি হয়তো এমন এক সুপার উলফ তৈরি করলেন যা আরো বেশি হিংস্র।

তবে তিনি এ প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকারও করেন না। তিনি বলেন, যদি এমন প্রাণী হয়, যেটা আমরা মানুষরা বিলুপ্ত করে দিয়েছি এবং সেটার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ থাকে, তাহলে এই প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

এ প্রযুক্তিগুলোর অগ্রগতি ব্যবহার না করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন শাপিরো।