এপ্রিলের এক সকালে করাচির পাখি বিক্রেতা রোজি খান ইসলামাবাদে তার ছোট্ট ব্যবসার কাজ সারতে গিয়ে ধাক্কা খান। ব্যাংকে গিয়ে দেখেন, তার একমাত্র ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর সচল নেই। ‘ইনভ্যালিড অ্যাকাউন্ট’—এই একটিই শব্দ ভেসে ওঠে স্ক্রিনে। তখন তিনি জানতে পারেন, ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এফআইএ) নির্দেশে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তার ১০ বছরের পুরনো অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

পাখি বিক্রি নিয়ে জট খুলতে শুরু করে

রোজি খানের হিসাব হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে উঠে আসে আসাদ আলি তুর নামে এক সাংবাদিকের নাম। ব্যাংক ব্যবস্থাপক তাকে একজন এফআইএ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। ওই কর্মকর্তা জানতে চান রোজির সঙ্গে তুরের কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কিনা। তখন রোজি জানান যে, তিনি তার ব্যবসার সূত্রেই কয়েকবার তুরকে পাখি দিয়েছিলেন, যেটা ছিল অন্যান্য ক্রেতার মতোই স্বাভাবিক লেনদেন।

4790c924-9ec4-4e5a-bf16-8293ea648728

রোজি খানের পাখির দোকানের এক কর্মীর হাতে টিয়া পাখি। ছবি: আল জাজিরা

লাহোরের আরেক পাখি বিক্রেতা নাদিম নাসিরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। তাকেও জানানো হয়নি কেন তার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে।

পরে জানা যায়, সাংবাদিক তুরের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের ভিত্তিতে আগে থেকেই তদন্ত চালাচ্ছিল এফআইএ।

কে এই আসাদ আলি?

আসাদ আলি তুর পাকিস্তানে একজন আলোচিত সাংবাদিক। তিনি ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশটির সামরিক ও বিচারব্যবস্থার কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি তিনি বিরল প্রজাতির পাখির সংগ্রাহক হিসেবেও খ্যাত। ২০২১ সালে তার ওপর হামলা হয়। আবার ২০২৪ সালে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাকে আটক করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

শুধু তুরের ব্যক্তিগত নয়, তার পরিবারের সদস্য ও ইউটিউব সহযোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আর সেই তালিকায় যুক্ত হন রোজি খান ও নাদিম নাসিরের মতো ব্যবসায়ীরা, যারা কেবল বিক্রেতা হিসেবে তার সঙ্গে লেনদেনে যুক্ত ছিলেন।

আদালতের নির্দেশের পরও রয়ে গেছে নিষেধাজ্ঞা

ইসলামাবাদ হাইকোর্ট এ ধরনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বেআইনি ঘোষণা করে আসাদ আলি তুরের অ্যাকাউন্ট সচল করার নির্দেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, তদন্তে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ছিল না।

এই আদেশের পর লাহোরের বিক্রেতা নাদিম নাসির তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফিরে পেলেও করাচির রোজি খানের অ্যাকাউন্ট এখনো চালু হয়নি। ফলে পারিবারিক খরচ চালাতেও তাকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

পোষা পাখি বিক্রি হলেও প্রশ্নের মুখে ব্যক্তি পরিচয়

রোজি খান জানিয়েছেন, তিনি জানতেন না তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে কিংবা কেন তার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে।

ঘটনার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এ ঘটনায় সাংবাদিক আসাদ আলি তুর অভিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তার আশপাশে থাকা সাধারণ মানুষও আইনি জটিলতার মধ্যে পড়ছেন। এমনকি যারা কেবল ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত ছিলেন তারাও বাদ যাচ্ছেন না।

এই ঘটনাটি কেবল একটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার সাধারণ ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এমন ব্যবহারের উদাহরণ, যেখানে সামান্য সংযোগকেও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

—আল জাজিরা অবলম্বনে