২৩ জানুয়ারি, মঙ্গলবার। মিয়ানমারের জনপ্রিয় পার্বত্য শহর পাইন ও লুইন এর প্রধান চত্বর ঘিরে কয়েকশ মানুষের ভিড়। সবাই অপেক্ষা করছেন একজন ভিক্ষুর আগমনের। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের বিষয়ে কথা বলবেন তিনি, তার নাম – পাও কো তাও।

কিছুক্ষণ পর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাও কো তাও জনতার উদ্দেশে কথা বললেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সমারিক শাসক জেনারেল মিন অং হ্লাইং  সরে গিয়ে তার ডেপুটি সো উইনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে।’

যদিও বিষয়টি অপ্রত্যাশিত। কারণ সামরিক সরকারের উত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োজিত হওয়া মিন অং হ্লাইংকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটি অতি জাতীয়তাবাদী অংশ দৃঢ় সমর্থন দিয়েছিল। তবে সম্প্রতি মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সেনাবাহিনী দলের একের পর এক বড় পরাজয় তাদের সমর্থকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

সেদিনের বক্তৃতায় পাই কো তাও বলেন, ‘মিন অং হ্লাইংকে দিয়ে আর শাসন কার্যক্রম চলছে না, ক্ষমতা ধরে রাখার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলছেন তিনি। অন্যদিকে ডেপুটি সো ইউনের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিনি একজন প্রকৃত সৈনিক। মিন অং হ্লাইং এর উচিত শাসনক্ষমতা সো উইনের হাতে তুলে দেয়া।’

ভিক্ষু পাও কো তাও-এর মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীতে কী ধরনের সমর্থন রয়েছে তা স্পষ্ট নয়। তবে অং হ্লাইং  এর বিরুদ্ধে তার বক্তব্য জান্তা সরকারের অন্যান্য সমর্থকদের মুখে প্রতিধ্বনিত হতে পারে। পাও কো তাও-এর বক্তব্য চলমান পরিস্থিতে সামরিক জান্তার বন্ধুহীন হয়ে ওঠার দিকেই ইঙ্গিত করে।

মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ও সন্ন্যাসীদের সম্পর্ক নতুন নয়। ১৯৩০ -এর দশকের উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৮৮ এবং ২০০৭ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সরব উপস্থিতি ছিল তাদের। ভিক্ষুদের অনেকে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেছিল, কেউ কেউ তাদের পোশাক পরিত্যাগ করে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিল। আবার ভিক্ষুদের একটি অংশ তখন সামরিক শাসকদের পক্ষ নিয়েছিল এই আদর্শের প্রেক্ষিতে যে, বৌদ্ধ ধর্ম এবং বার্মিজ সংস্কৃতিকে বাইরের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে স্থানীয় বৌদ্ধ ও মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের পর উগ্রপন্থী ভিক্ষু উইরাথু জাতি ও ধর্ম রক্ষার জন্য একটি  সংগঠন গড়ে তোলেন। তার প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন ‘মা বা থা’ নামে পরিচিত ছিল। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা বয়কটকে উৎসাহিত করা। তারা দাবি করেছিল, বার্মিজ বৌদ্ধধর্ম মুসলমানদের দ্বারা নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্দোলনটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৭ সালে ভেঙে দেওয়া হয়। তবে এর সমর্থকরা পরবর্তীতে জান্তা সরকারকে সানন্দে গ্রহণ করেছিল এবং সমর্থন জানিয়েছিল।

এ ছাড়া জাতিগত সংঘাত উসকে দেওয়ার জন্য উইরাথু ২০২০ সালে কারাগারে বন্দী ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছরেরও কম সময়ে মুক্তি পান তিনি। সে সময় মিন অং হ্লাইং তাকে সম্মান ও নগদ অর্থও দিয়েছিলেন৷

২০২১ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করা অং সান সুচির বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ এনে পুনরায় সামরিক শাসন চালু করেন জেনারেল অং হ্লাইং। মিয়ানমার ছাড়াও পুরো বিশ্বজুড়েই এতে নিন্দার ঝড় ওঠে এবং মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ।  এ সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটা বড় অংশ জেনারেল অং মিন হ্লাইং এর পক্ষে ছিল। মিন অং হ্লাইং-ও নিজেকে ‘বৌদ্ধ ধর্মের স্বার্থ এবং শুদ্ধতা রক্ষার মুখপাত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিপক্ষের কাছে সামরিক জান্তার একের পর এক হার তাদের মিত্র সংখ্যা ক্রমশ কমিয়ে আনছে। তথ্যসূত্র : বিবিসি।