সুদানে সামরিক বাহিনী (এসএএফ) এবং আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি এল-ফাশের শহরে আরএসএফের হাতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের খবর পাওয়া গেছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এ অপরাধকে ‘রুয়ান্ডা পর্যায়ের গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছে।

এই যুদ্ধে আরএসএফ একা নয়, তাদের পেছনে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জোরালো সমর্থন— যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তুলেছে।

সুদান ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সামরিক শাসন ও অভ্যুত্থানের ইতিহাসে জর্জরিত। ২০১৯ সালে এক গণঅভ্যুত্থানে একনায়ক ওমর আল-বশিরের পতনের পর দেশটি গণতন্ত্রের পথে হাঁটছিল। কিন্তু ২০২১ সালে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফ নেতা হেমেদতির যৌথ অভ্যুত্থানে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত আড়াই কোটির বেশি মানুষ চরম খাদ্যসংকটে ভুগছেন।

আরএসএফ গঠিত হয়েছে কুখ্যাত জানজাওয়িদ বাহিনী থেকে— যারা ২০০০ দশকের শুরুতে দারফুরে গণহত্যা চালিয়েছিল। এই বাহিনীর নেতা হেমেদতি বর্তমানে বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ ব্যবসায়ী। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বর্ণের বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

আরএসএফের দীর্ঘস্থায়ী সক্ষমতার পেছনে আমিরাতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক শক্তি বলে মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আমিরাত জটিল সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে আরএসএফকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।

আমিরাত দীর্ঘদিন থেকেই সুদানে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক সংস্থার তদন্তে প্রমাণ মিলেছে যে, তারা আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহ করছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মিডল ইস্ট আই রিপোর্ট করে যে, আমিরাত প্রতিবেশী লিবিয়া, চাদ, উগান্ডা এবং সোমালিয়ার বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলো দিয়ে একটি সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। এছাড়া, ২০২৫ সালের মে মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, আমিরাত দারফুরে উন্নত চীনা-নির্মিত অস্ত্রশস্ত্র পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত নরিনকো গ্রুপের নির্মিত গাইডেড বোমা এবং হাউইৎজার চিহ্নিত করা হয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকের উদ্ধৃত করে জানায় যে, আমিরাত আরএসএফকে চীনা ড্রোন এবং অন্যান্য অস্ত্র সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া, আরএসএফের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে আমিরাত সুদানের ভেতরে ও বাইরে কৌশলগত ঘাঁটি ব্যবহার করছে। সরবরাহ এবং গোয়েন্দা উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য আমিরাতের সুদানের অভ্যন্তরে দুটি ঘাঁটি রয়েছে— দক্ষিণ দারফুরের নিয়াল এবং এল-ফাশের থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল-মালহা।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফাঁস হওয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নথি অনুসারে, আরএসএফের সঙ্গে যুক্ত একটি উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষে আমিরাতের পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছিল। এই ঘটনাকে অস্ত্র সরবরাহে আমিরাতের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সুদানে আমিরাতের এই গভীর সম্পৃক্ততা নিছক রাজনৈতিক বা সামরিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। বশিরের ৩০ বছরের শাসনের শেষের দিকে আমিরাত সুদানে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছিল। ২০১৫ সাল থেকে হাজার হাজার সুদানি সৈন্য ইয়েমেনে সৌদি আরব-আমিরাত কোয়ালিশনের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। তবে অভ্যন্তরীণ সংকটে বশিরের সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে আমিরাত তাদের আর্থিক সহায়তা এবং সামরিক সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর অন্যতম কারণ ছিল কাতারের অবরোধ। এ অবরোধের বিষয়ে বশিরের অবস্থান নিয়ে আমিরাত অসন্তুষ্ট ছিল। এছাড়া, বশির সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ইসলামপন্থী দলগুলোর সংযোগ আমিরাতের পছন্দ ছিল না।

বর্তমানে, সুদান লোহিত সাগর এবং পূর্ব আফ্রিকা জুড়ে আমিরাতের ক্ষমতা বিস্তারের একটি ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া, সুদানে আমিরাতের প্রধান আগ্রহ হলো এর অব্যবহৃত কৃষি ও খনিজ সম্পদ, যার মধ্যে স্বর্ণ অন্যতম।

আমিরাত তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে এবং অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে স্বর্ণের বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আরএসএফের নেটওয়ার্ক এই স্বর্ণ রফতানি সুরক্ষিত ও সহজতর করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, আরএসএফ নেতা হেমেদতি এবং তার পরিবারের একটি স্বর্ণ কোম্পানি রয়েছে। এটি ২০১৭ সালে আরএসএফ কর্তৃক দারফুরে দখল করা জমিতে পরিচালিত হয়।

খাদ্য নিরাপত্তার উদ্বেগ থেকেও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো খাদ্য সরবরাহের জন্য নির্ভরতার জায়গা তৈরি করতে চাইছে। সুদানকে বহু দশক ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমিরাতের বৃহত্তম তালিকাভুক্ত করপোরেশন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানি এবং জেনান ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ বর্তমানে সুদানে ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে চাষাবাদ নিয়ন্ত্রণ করছে।

আমিরাত কৌশলগতভাবে লোহিত সাগরের অবস্থানে থাকা সুদানের মাধ্যমে তাদের সমুদ্রবন্দরের সাম্রাজ্য প্রসারিত করতে চাইছে। সুদান কৌশলগতভাবে লোহিত সাগরের ওপর অবস্থিত। আর এই নৌরুট দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কন্টেইনার জাহাজ চলাচল করে।

আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সমুদ্রবন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড তার প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিমা সংস্থাগুলিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় রয়েছে। আমিরাত সুদানের লোহিত সাগর উপকূলে আবু আমামা সমুদ্রবন্দরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছিল। সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে সেই চুক্তিটি চূড়ান্ত না হলেও র প্রস্তাব প্রমাণ করে, সুদানের অবকাঠামো এবং কৌশলগত অবস্থানে আমিরাতের আগ্রহ কতটা গভীর।